সব বাড়িতে বিদ্যুৎ পৌঁছাতে কেন্দ্রীয় প্রকল্প ক্যাগ রিপোর্টে বিপুল গরমিল ও দুর্নীতির পর্দা ফাঁস
(১ পাতা)
নতুন পয়গাম, নয়াদিল্লি, ২৯ ডিসেম্বর: দেশের সব বাড়িতে অর্থাৎ ১০০ শতাংশ এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে কেন্দ্র সরকার একাধিক প্রকল্প ঘোষণা করেছিল। বিশেষত গ্রামীণ এলাকার প্রতিটি বাড়িতে বিদ্যুৎ পরিষেবা পৌঁছে দিতে ‘সহজ বিজলি হর ঘর যোজনা’ বা ‘সৌভাগ্য’ স্কিম, ‘দীনদয়াল উপাধ্যায় গ্রাম জ্যোতি যোজনা’ এনেছিল নরেন্দ্র মোদি সরকার। গত ১১ বছরে নরেন্দ্র মোদি সরকার এসব প্রকল্প ঘোষণা করেছে। কিন্তু প্রকল্প ঘোষণাই সার। কাজের কাজের সেভাবে হয়নি।
সম্প্রতি এই দুটি প্রকল্প নিয়ে সংসদে রিপোর্ট পেশ করেছে কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল অব ইন্ডিয়া বা ‘ক্যাগ’। সেখানে তারা জানিয়েছে, প্রকল্প দু’টিতে ছত্রে ছত্রে আর্থিক অনিয়ম। ১০০ শতাংশ গ্রামীণ বিদ্যুতায়ন দূরঅস্ত, সংযোগের হার সরকারি দাবির ধারেকাছেও নেই। পূর্বতন মনমোহন সিং সরকারের দেশব্যাপী বিদ্যুতায়নের অন্যতম প্রকল্প ছিল ‘রাজীব গান্ধী গ্রামীণ বৈদ্যুতিকীকরণ যোজনা’। অন্য সব প্রকল্পের মতো এই প্রকল্পেরও নাম পালটে দেয় মোদি সরকার। সংঘ পরিবারের অন্যতম নেতা দীনদয়াল উপাধ্যায়ের নামাঙ্কিত প্রকল্পের আওতায় ৬০৫টি প্রকল্পকে রাখা হয়।
ক্যাগ রিপোর্ট বলছে, এগুলির মধ্যে ৪৯৪টি প্রকল্পই নিয়ম মেনে হয়নি। কোথায় অনিয়ম? উত্তরে বলা হয়েছে, কোন কোন গ্রামে প্রকল্প বাস্তবায়িত হবে, সে ব্যাপারে নির্দিষ্ট সময়ে যথাযথ সমীক্ষাই করা হয়নি। প্রতিটি রাজ্যে তৈরি হয়েছিল একটি করে কমিটি। প্রকল্প শুরুর আগে তার গুণমান যাচাইয়ের পাশাপাশি কোন সংস্থাকে দিয়ে বিস্তারিত প্রকল্প রিপোর্ট তৈরি হবে, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা ছিল ওই কমিটিগুলির। কিন্তু দেখা গিয়েছে, রাজ্যগুলিকে এড়িয়ে ডিপিআর জমা পড়েছে কেন্দ্রের কাছে। ক্যাগ বলছে, একাধিক রাজ্যে এই প্রকল্পের আওতায় প্রায় ৫৪২ কোটি টাকা আগেই দিয়ে বসে আছে কেন্দ্র। অথচ বিভিন্ন ক্ষেত্রে টাকা পাওয়ার ৩৬০ দিন পর প্রোজেক্ট ম্যানেজমেন্ট এজেন্সি নিয়োগ হয়েছে। মোট কথা, সব প্রাথমিক কাজ শেষে অর্থ বরাদ্দ নয়, বরং তার বহু আগেই ১ হাজার ৬০৪ কোটি টাকা দিয়ে বসে আছে কেন্দ্র। অন্যদিকে ‘সৌভাগ্য’ প্রকল্প সম্পর্কে ক্যাগ জানাচ্ছে, ৩ কোটি বাড়িতে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়ার কথা ছিল। পরে তারা জানায়, তিন কোটি নয়, ২ কোটি ৬৩ লক্ষ বাড়িতে সংযোগ দেওয়া হবে। ২০১৯ সালের মার্চ মাসের মধ্যে সেই লক্ষমাত্রার ১০০ শতাংশ পূরণ হয়ে গিয়েছে বলে কেন্দ্র সরকার দাবি করেছিল। কিন্তু বাস্তবে ১ কোটি ৫২ লক্ষ বাড়িতে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হয় বলে জানিয়েছে ক্যাগ। অর্থাৎ সরকারের দাবি ও বাস্তবের মধ্যে ফারাক বিস্তর। ক্যাগের হিসেব, ৭টি রাজ্যেই বিদ্যুৎবিহীন বাড়ি ১৯ লক্ষের বেশি।
দীনদয়াল নামাঙ্কিত প্রকল্প ও সৌভাগ্য প্রকল্পের মধ্যে যে কোনও একটির মাধ্যমে বিদ্যুৎ সংযোগ পাওয়ার কথা গ্রাহকদের। সমীক্ষায় প্রায় ১৭ হাজার বাড়ির ক্ষেত্রে দেখা গিয়েছে, একইসঙ্গে দু’টি প্রকল্পের হাত ধরেই তারা বিদ্যুৎ পেয়েছে। অর্থাৎ, বাস্তবে একবার সংযোগ দিয়ে দু’টি প্রকল্পের টাকা নিয়েছে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার সংস্থা। শুধু সাধারণ গ্রাহকই নন, বিদ্যুৎ বণ্টন সংস্থাগুলির একাংশকেও একই কাজের জন্য দু’টি প্রকল্পের আওতায় দু’বার পেমেন্ট করা হয়েছে। সৌভাগ্য প্রকল্পের খরচের জন্য যেখানে কেন্দ্রীয় সংস্থার হাতে ৩৫০ কোটি টাকারও বেশি পড়েছিল, তখন তারা বাজেট অনুমোদনের বাইরে গিয়ে চড়া সুদে বাজার থেকে ৫০০ কোটি টাকা ধার করে। দেখা যায়, প্রকল্প শেষে তার মাত্র ৯৫ কোটি টাকা খরচ হয়েছে। ক্যাগ জানিয়েছে, বাদবাকি টাকা পড়েই আছে। অথচ তার জন্য দিতে হয়েছে চড়া হারে সুদ। স্বভাবতই ক্যাগের এই রিপোর্টে বিপাকে পড়েছে কেন্দ্র সরকার।








