আর কত জুয়েল শেখের মৃত্যু দেখবে মুর্শিদাবাদ? প্রশ্নের মুখে জনপ্রতিনিধিরা
নতুন পয়গাম, মুর্শিদাবাদ: ওড়িশার সম্বলপুরে মুর্শিদাবাদের পরিযায়ী শ্রমিক জুয়েল শেখের মর্মান্তিক মৃত্যু শুধু একটি বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়। এই মৃত্যু পশ্চিমবঙ্গ তথা দেশের অন্যতম পিছিয়েপড়া সংখ্যালঘু অধ্যুষিত জেলা মুর্শিদাবাদের দীর্ঘদিনের আর্থ-সামাজিক ব্যর্থতা এবং ভিন রাজ্যে কাজ করতে গিয়ে বাংলাভাষী পরিযায়ী শ্রমিকদের অনিরাপত্তার নির্মম বাস্তবতাকেই সামনে তুলে ধরেছে। নিজের ভাষা ও পরিচয়ের কারণেই একজন শ্রমিককে পিটিয়ে হত্যা করা দেশজুড়ে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।
মুর্শিদাবাদ ঐতিহাসিকভাবে ছিল উর্বর ও সমৃদ্ধ জনপদ। কিন্তু দেশভাগের পর গঙ্গা-পদ্মার ভাঙন, শিল্পায়নের অভাব এবং ধারাবাহিক রাজনৈতিক অবহেলায় এই জেলা ধীরে ধীরে পরিযায়ী শ্রমিক সরবরাহের এলাকায় পরিণত হয়েছে। কৃষিকাজ, পাট বা ধান চাষে আর পর্যাপ্ত আয় না হওয়ায় বহু মানুষ বাধ্য হচ্ছেন কেরল, দিল্লি, মুম্বই বা ওড়িশায় রাজমিস্ত্রি ও দিনমজুরের কাজে যেতে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠছে জেলার রাজনৈতিক নেতৃত্বকে ঘিরে। মুর্শিদাবাদে তিনজন সাংসদ এবং এক ডজনেরও বেশি বিধায়ক থাকা সত্ত্বেও কেন কর্মসংস্থানের বিকল্প তৈরি হয়নি? কেন শিল্প, কুটিরশিল্প বা কারিগরি শিক্ষার প্রসার ঘটেনি? ভিন রাজ্যে শ্রমিক মৃত্যুর পর ক্ষতিপূরণের চেক নিয়ে পাশে দাঁড়ানোই কি জনপ্রতিনিধিদের একমাত্র দায়িত্ব? বিশেষজ্ঞদের মতে, জেলার অর্থনীতি ভেঙে পড়ার মূল কারণ দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাব।
নামমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থাকলেও তা কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে কার্যকর ভূমিকা নিতে পারেনি। এর ফলেই যুবসমাজ কাজের খোঁজে ভিন রাজ্যে যেতে বাধ্য হচ্ছে এবং সেখানে পড়ছে সামাজিক বিদ্বেষ ও হিংসার শিকার।
জুয়েল শেখের মৃত্যু আরও একবার দেখিয়ে দিল, শুধু ভিন রাজ্যের অসহিষ্ণুতার সমালোচনা করলেই দায় শেষ হয় না। নিজের জেলার মানুষের জীবিকা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারাও সমানভাবে দায়িত্বজ্ঞানহীনতা। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা যদি স্থানীয় মেধা ও মানব সম্পদ এবং জনশক্তিকে কাজে লাগিয়ে টেকসই উন্নয়নের পথ তৈরি না করেন, তাহলে ভবিষ্যতে আরও বহু পরিবারের চোখের জল পড়বে। আজ মুর্শিদাবাদ জেলার মানুষের সামনে প্রশ্ন — আর কতদিন এই জেলা পরিযায়ী শ্রমিকের মৃত্যুসংবাদের শিরোনাম হবে? আর কত জুয়েল শেখ প্রাণ হারালে তবে জেগে উঠবেন জনপ্রতিনিধি ও দায়িত্বশীলরা?








