অনুপ্রবেশ নিয়ে বঙ্গ বিজেপির দাবি মিলছে না জনগণনা ও নীতি আয়োগের তথ্য বলছে অন্য কথা
নতুন পয়গাম, কলকাতা ও নয়াদিল্লি:
সদ্য সমাপ্ত বিহারে বিধানসভা ভোটের আগে ঘুসপেটিয়া বা অনুপ্রবেশ নিয়ে নতুন করে সরব হয়েছিলেন বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতারা। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ, বিজেপি সভাপতি জেপি নাড্ডা প্রমুখ সোচ্চার হয়েছিলেন। বিহারে এসআইআর প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হবে প্রচার তুঙ্গে তুলেছিলেন তাঁরা। কিন্তু এসআইআর হওয়ার পরও একজন বাংলাদেশিকে চিহ্নিত করতে পারেনি কমিশন। কিন্তু ক্রমাগত বিদ্বেষ প্রচার করে ভোটে ফায়দা তুলেছে বিজেপি।
পশ্চিমবঙ্গে কোটি কোটি বাংলাদেশি মুসলিম অনুপ্রবেশকারীর অস্তিত্ব সম্পর্কে বিজেপি যে তথ্য নিয়ে হইচই করছে, সে সম্পর্কে কেন্দ্র সরকারের তথ্য বলছে সম্পূর্ণ অন্য কথা। রাজ্য বিধানসভার বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী থেকে শুরু করে সুকান্ত মজুমদার, শমীক ভট্টাচার্য প্রমুখ লাগাতার বলে চলেছেন, পশ্চিমবঙ্গের জনবিন্যাসই নাকি বদলে দিয়েছে বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীরা। ফলে তাদের যুক্তি, পশ্চিমবঙ্গের জনসংখ্যাও অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। কিন্তু ২০১১ সালের সর্বশেষ জনগণনার তথ্য বা সাম্প্রতিক নীতি আয়োগের পরিসংখ্যান শুভেন্দু তথা বঙ্গ বিজেপি নেতাদের সঙ্গে মিলছে না।
সেন্সাস রিপোর্ট বলছে, ২০০১ থেকে ২০১১ পর্যন্ত ভারতে মুসলিম জনসংখ্যা বৃদ্ধির গড় ২৪.৬ শতাংশ, পশ্চিমবঙ্গে তা ২১.৮ শতাংশ, যা জাতীয় গড়ের থেকে ২.৮ শতাংশ কম। সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলির মুসলিম জনসংখ্যা বৃদ্ধির জাতীয় গড় ১৭.৭ শতাংশ। পশ্চিমবঙ্গে তা ১৩.৮ শতাংশ, অর্থাৎ ৩.৯ শতাংশ কম। আবার সদ্য প্রকাশিত নীতি আয়োগের ‘সামারি রিপোর্ট ফর দ্য স্টেট অফ ওয়েস্ট বেঙ্গল’-এ বলা হয়েছে, ‘২০২৩ সালের সেন্সাস পপুলেশন প্রজেকশন অনুসারে জনসংখ্যা বৃদ্ধির জাতীয় গড় ০.৯ শতাংশ। পশ্চিমবঙ্গে তা ০.৫ শতাংশ।’ অর্থাৎ কেন্দ্র সরকারের তথ্য প্রমাণ করছে, পশ্চিমবঙ্গে বাংলাদেশী অনুপ্রবেশ নিয়ে সর্বৈব মিথ্যাচার করছে বিজেপি নেতারা। শুধুমাত্র রাজনৈতিক ফায়দা তোলার জন্য চলছে এহেন বিদ্বেষ প্রচার।
এরাজ্যে বাংলাদেশি অনুপ্রবেশ যেটুকু ঘটেছে, তা সীমান্ত বাহিনীর ব্যর্থতার জন্য। কারণ, সীমান্ত পাহারার দায়িত্ব বিএসএফ-এর হাতে। অনুপ্রবেশ কারীদের একটা বড় অংশ অবশ্যই আসে অর্থনৈতিক কারণে বা উপার্জনের তাগিদে। যদি পশ্চিমবঙ্গে কয়েক কোটি রোহিঙ্গা কিংবা বাংলাদেশী অনুপ্রবেশ করে থাকে, তাহলে এর সরাসরি প্রভাব পড়বে সমাজে। খাদ্য সংকট দেখা যাবে। বাসস্থানের সমস্যাও হবে। কিন্তু বাস্তবে তা দেখা যায়নি পশ্চিমবঙ্গে।
সম্প্রতি রাজ্যের বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী দাবি করেন, ১ কোটি ২০ লক্ষ নাকি রোহিঙ্গা পশ্চিমবঙ্গ রয়েছে। কিন্তু রাষ্ট্রসংঘের তথ্য অনুযায়ী, গোটা পৃথিবীতে এত সংখ্যক রোহিঙ্গা নেই। আবার ২০২৩ সালের ১২ ডিসেম্বর সুপ্রিম কোর্টে হলফনামা দিয়ে কেন্দ্র সরকার জানিয়েছিল, “ভারতে অনুপ্রবেশকারীদের সংখ্যা সম্পর্কে সঠিক তথ্য সরকারের কাছে নেই।” এদেশে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ সম্পর্কে ভারত সরকারের তথ্য অনুযায়ী, দেশে শরণার্থী শিবিরে ৪০ হাজার রোহিঙ্গা আছেন। পশ্চিমবঙ্গে ৩৬১টি রোহিঙ্গা পরিবার রয়েছে। তাহলে কোন তথ্যের উপর ভিত্তি করে কোটি কোটি মুসলিম অনুপ্রবেশের গল্প বলছেন বিজেপি নেতারা, তা স্পষ্ট নয়। তবে একটা বিষয় স্পষ্ট, তা হল জাতি বা ধর্মের নামে মানুষকে উসকানি দিয়ে, বিদ্বেষ ছড়িয়ে বিজেপি কেবল ভোটে ফায়দা তুলতে চায়। এটাই তাদের বরাবরের কৌশল, এমনই অভিযোগ রাজ্যের বিরোধী দলগুলোর।








