বাহাদুর শাহ জাফর ও রেঙ্গুনের বাসভবন
মুহাম্মদ নাসেরউদ্দিন আব্বাসী
বাহাদুর শাহ জাফর (২৪ অক্টোবর ১৭৭৫ – ৭ নভেম্বর ১৮৬২) ছিলেন মুঘল সাম্রাজ্যের ১৯তম এবং শেষ সম্রাট। তিনি পূর্বসূরি ও তার বাবা মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় আকবরের দ্বিতীয় সন্তান। সিপাহী বিদ্রোহের শেষে ১৮৫৮ খ্রিষ্টাব্দে ব্রিটিশ শাসকেরা তাঁকে ক্ষমতাচ্যুত করে মায়ানমার বা রেঙ্গুনে নির্বাসনে পাঠায় এবং সেখানেই তার মৃত্যু হয়। জীবদ্দশায় প্রধানত দিল্লির লালকেল্লায় থাকতেন। কিন্তু ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের পর তাঁর ক্ষমতা হ্রাস হয় এবং ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পেনশনের উপর নির্ভরশীল ছিলেন।
রেঙ্গুনে নির্বাসিত হয়ে চরম অসহায় অবস্থায় সেখানে তিনি একটি জরাজীর্ণ কাঠের ঘরে দিনপাত করতেন, যা শ্বেত প্যাগোডার নিকটে ছিল। দিল্লির রাজ দরবারে ১৭৭৫ সালের ২৪ অক্টোবর তাঁর জন্ম হয়েছিল। পিতা দ্বিতীয় আকবর শাহ, মাতা লাইবাই। পিতৃদত্ত নাম মির্জা আবু জাফর সিরাজউদ্দিন মুহাম্মদ বাহাদুর শাহ জাফর। শৈশবে আরবি, ফারসি ভাষায় পাণ্ডিত্য অর্জন করেন। ১৮৩৭ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর বাহাদুর শাহ জাফর দিল্লির সিংহাসনে বসেন।
লালকেল্লায় ১৭তম এবং সর্বশেষ মুঘল সম্রাট হিসেবে ২৯ সেপ্টেম্বর ১৮৩৭ সালে রাজ্যাভিষেক হয় বাহাদুর শাহ জাফরের । সম্রাট আওরঙ্গজেব তার প্রেরণা ছিলেন। ব্যারাকপুরে ফৌজি ক্যান্টনমেন্ট থেকে সিপাহী মঙ্গল পাণ্ডে বৃটিশদের বিরুদ্ধে ঝড় তোলে। ১৮৫৬ সালে সারা ভারতে বৃটিশ বিরোধী সংগ্রামের প্রস্তুতি চললো। ১৮৫৭ সালের মার্চে বাদশাহ হিন্দুস্তানি সেনার সর্বাধিনায়কের পদ গ্রহণ করেন। দিল্লির ছয় শত শিখ সেনা যুদ্ধের সময় বাদশাহের দিকে এগিয়ে এলেন। খাঁটি দেশপ্রেমিক বাদশাহ-পত্নী বেগম জিন্নত, ১৩ সন্তান, পৌত্র যুদ্ধে যোগ দেন। দিল্লি দখলের পর বৃটিশরা দিল্লিতে হত্যালীলা চালিয়েছিল।
১৩ মে ১৮৫৭ সালে ৬০ জন বৃটিশ শিশু ও নারীকে হত্যার ব্যাপারে তাঁর অনুমতি চাওয়া হলে তিনি অনুমতি দিলেন না, উপরন্তু তাদের রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা করেন। ১৮৫৭ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর ২০ বছর ৪২ দিন সুনামের সঙ্গে রাজত্বের পর বৃটিশ সেনাপতি হডসন দুর্গে বৃদ্ধ বাদশাহকে বন্দি করে। বাদশাহের দুই পুত্র-সহ রাজবাটির ২৯ জন শিশু ও বালক-বালিকাকে মি. হডসন দিল্লির প্রকাশ্য রাজপথে গুলি করে হত্যা করেন।

বাদশাহকে বৃটিশরা অবশিষ্ট পরিবারবর্গ-সহ রেঙ্গুনে নির্বাসিত করে। পত্নী বেগম আশরাফ মহল, বেগম আখতার মহল, বেগম তাজমহল, বেগম জিন্নাত মহল। পুত্র-মির্জা দারা বখত মিরান শাহ, মির্জা শাহরুখ, মির্জা ফতেহ-উল-মুলুক বাহাদুর, মির্জা মুঘল, মির্জা কার্জার সুলতান, মির্জা জওয়ান বখত, মির্জা কাইস, মির্জা শাহ আব্বাস। কন্যা-রাবেয়া বেগম, বেগম ফাতেমা সুলতান, কুলসুম জামানি বেগম।
বাদশাহের জন্য প্রতিদিনের ব্যয় বরাদ্দ হয় ১১ টাকা। ১৮৬২ সালের ৭ নভেম্বর রেঙ্গুনে শুক্রবার ভোর ৫ টায় ভারতের প্রথম জাতীয় অভ্যুত্থানের সর্বাধিনায়ক বাদশাহের মৃত্যু হয়। তাঁর কণ্ঠনালীতে প্যারালাইসিস হয়েছিল। তার অন্তিম ইচ্ছা অনুযায়ী বিকেল চারটায় তাঁকে রেঙ্গুনে সমাধিস্থ করা হয়।

ভারতের প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী মায়ানমার সফরে গিয়ে তার সমাধি সৌধ পরিদর্শন করেন। সে সময় তিনি সেখানকার রেজিস্ট্রার খানা বা পরিদর্শক বইতে লিখেছিলেন, “দু-গজ জমিন তো না মিলি হিন্দুস্তান মে, পার তেরী কুরবানী সে উঠি আজাদী কি আওয়াজ, বদনসীব তো নাহি জাফর, জুড়া হ্যায় তেরা নাম ভারত শান আউর শওকত মে, আজাদী কি পয়গাম সে”।
যার বাংলায় অর্থ হল: “হিন্দুস্তানে তুমি দু-গজ মাটি পাওনি সত্য। তবে তোমার আত্মত্যাগ থেকেই আমাদের স্বাধীনতার আওয়াজ উঠেছিল। দুর্ভাগ্য তোমার নয় জাফর, স্বাধীনতার বার্তার মধ্য দিয়ে ভারতবর্ষের সুনাম ও গৌরবের সঙ্গে তোমার নাম চিরস্মরণীয় হয়ে রয়েছে”।








