এসআইআর-এর মধ্যেই রেলের উচ্ছেদ নোটিশ, দিশেহারা দেশবন্ধু পল্লীর বাসিন্দারা
আব্দুল গফফার, নতুন পয়গাম, হুগলি:
হুগলি স্টেশন সীমান্তে বয়ে চলা রেললাইনের পশ্চিম তীরে গড়ে ওঠা দেশবন্ধু পল্লীর বাসিন্দারা বর্তমানে এককালে নয়—দুই মাপে ভেঙে পড়েছেন। একদিকে চলমান ভোটার তালিকা সংশোধন (SIR) প্রক্রিয়া নিয়ে উদ্বেগ, অন্যদিকে রেল কর্তৃপক্ষ থেকে চলে আসা উচ্ছেদ নোটিশ। কোন দিকে কতটুকু নিরাপত্তা আছে—ভোটাধিকার থাকবে কি না এবং বাড়িঘরগুলি কবে থেকে উচ্ছেদ হবে—এই দু’টি প্রশ্নই এখন তাদের নিত্যচিন্তার বিষয়।
স্থানীয়রা জানান, প্রায় ত্রিশ বছর পূর্বে হাওড়া–ব্যান্ডেল শাখার রেললাইন বরাবর এই বসতি গড়ে ওঠে। রেললাইনের পাশেই একটি নিকাশি খাল—খালের এক পাড়ে রেললাইন, অপর পাড়ে চুঁচুড়া ধান্য গবেষণা কেন্দ্রীয় পাঁচিল। সেই পাঁচিলের কোলেই বাঁশ-দরমা দিয়ে অস্থায়ী কুঠির থেকে আস্তে আস্তে অনেক বাড়িই পাকা হয়েছে। সাধারণত দিনমজুরী করে জীবিকা নির্বাহ করে এখানে শতশত পরিবার; তাদের মধ্যে অধিকাংশই মতুয়া সম্প্রদায়ভুক্ত। কিন্তু অনেকেরই ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় নাম নেই—এছাড়া SIR-এ তাঁদের ভবিষ্যৎ কী হবে, এটি নিয়ে উদ্বেগ বেড়েই চলেছে। সামনে আচমকা রেলের উচ্ছেদ নোটিশ এসে পড়ায় তিশি হারাচ্ছেন পল্লীবাসীরা।
বাসিন্দারা বলছেন, “যারা তীরভূমি ছেড়ে এখানে আসেন, তাদের মধ্যে অনেকেরই কাগজপত্র সম্পূর্ণ নয়। ভোটার তালিকায় নাম না থাকলে নাম কিভাবে ধরে রাখব, আর ঘরবাড়ি বিলকুল না থাকলে বসবাস কই থেকে করব — এ ভাবেই এখন আমরা দিশেহারা।” তারা পুনর্বাসনের দাবি তুলছেন এবং বলছেন, উচ্ছেদের আগেই স্থায়ী ও যুক্তিসঙ্গত পুনর্বাসন না দিলে উচ্ছেদ করা ঠিক হবে না।
এই পরিস্থিতিতে স্থানীয় পঞ্চায়েত ও সমাজকর্মীরা বাসিন্দাদের সঙ্গে অবস্থান নিয়েছেন। কোদালিয়া দুই গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রাক্তন প্রধান বিদ্যুৎ বিশ্বাস বলেন, “কেন্দ্র ও নির্বাচন কমিশন বাংলার ও বাঙালির বিরোধী—এমন অভিযোগ নয়; কিন্তু এসআইআর চলাকালীন সময় মানুষ বিভ্রান্ত। কোথা থেকে কাগজ আনা হবে, কী করা হবে—এসব ভেবে মানুষ একেবারে কষ্টে। এ মুহূর্তে পুনর্বাসন ছাড়া উচ্ছেদ ন্যায়সঙ্গত হতে পারে না; প্রয়োজনে বৃহত্তর আন্দোলনও করব।” তাঁর ভাষ্য, স্থানীয় নেতৃত্ব বাসিন্দাদের পাশে থাকবে এবং পুনর্বাসন না হলে জনগণ আন্দোলনে নামবে।
এ ব্যাপারে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়িতেও উত্তাপ দেখা গেছে। বিজেপি রাজ্য কমিটির সদস্য স্বপন পাল বলেন, ব্যান্ডেল স্টেশনকে অমৃত ভারত স্টেশন হিসেবে উন্নীত করার বড় প্রকল্প চলছে; সেখানে অন্তত ৩০০ কোটি টাকার বেশি খরচ ধরা হয়েছে এবং এশিয়ার বৃহত্তম ইন্টারলকিং সিস্টেম চালু হওয়ায় রেলের লাইন সম্প্রসারণ প্রয়োজন। তিনি দাবি করেন, “তৃণমূল কংগ্রেস মানুষকে বিভ্রান্ত করছে; এসআইআর-সম্পর্কিত মিথ্যে প্রচারণা চলছে” এবং আশ্বাস দিয়েছেন যে কোনো বৈধ ভোটারের নাম SIR থেকে কাটা হবে না।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকে বলছেন, তারা প্রশাসনের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে পুনর্বাসনের অনুরোধ জানাবেন এবং একই সঙ্গে নির্বাচন পদক্ষেপ সম্পন্ন হওয়া পর্যন্ত উচ্ছেদ কার্যক্রম স্থগিত রাখতে দাবি তোলা হবে। অপরদিকে, রেল কর্তৃপক্ষ ও নির্বাচন অফিস থেকে এই মুহূর্তে কোন অফিসিয়াল প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি—নথিভুক্ত উচ্ছেদ নোটিশ ও SIR-সংক্রান্ত বিধান সম্পর্কে স্পষ্ট ব্যাখ্যার অভাব জনজীবনে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
দেশবন্ধু পল্লীর এই দ্বন্দ্ব—বেসরকারি জীবনাবস্থান এবং সরকারি ও অবকাঠামোগত উন্নয়নকার্যের সঙ্ঘর্ষ—একদিকে সামাজিক নিরাপত্তা ও নাগরিক অধিকারের প্রশ্ন এনেছে, অন্যদিকে উন্নয়ন প্রকল্প ও আইনি সিদ্ধান্তগুলোর বাস্তবায়নে ন্যায্যতা ও মানবিক দিক নিয়ে নতুন করে তৎপরতা প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট করেছে। বাসিন্দারা প্রশাসনের কাছে অনুরোধ জানাচ্ছেন—সবার ভোটার অধিকার নিশ্চিত করে, পুনর্বাসন পরিকল্পনা নিয়ে বসুন; নাহলে এই ‘উভয় সংকট’ তাদের জীবন-জীবিকার ওপর দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।








