এসআইআর: সংশোধনের নামে সন্দেহের ছায়া
মহম্মদ মফিজুল ইসলাম
ভোটার তালিকা সংশোধনের অজুহাতে নাগরিকত্ব নিয়ে নতুন করে ছড়াচ্ছে রাজনৈতিক আতঙ্ক। প্রতি বছরই নির্বাচন কমিশন ভোটার তালিকা সংশোধনের কাজ করে। এটি প্রশাসনিকভাবে স্বাভাবিক প্রক্রিয়া, যেখানে নাগরিকেরা নিজের নাম যাচাই, সংশোধন বা সংযোজনের সুযোগ পান। কিন্তু এবারের এসআইআর বা বিশেষ নিবিড় পরিমার্জন (Special Intensive Revision) যেন সেই রুটিন প্রক্রিয়ার বাইরে এক বিশেষ অভিযান। উদ্দেশ্য যা-ই বলা হোক না কেন, বাস্তবে এটি অনেকের কাছে নাগরিকত্ব নিয়ে নতুন করে সন্দেহ, সংশয় ও আতঙ্ক ছড়িয়ে দেওয়ার এক রাজনৈতিক মহড়া হয়ে উঠছে।
বিহারের উদাহরণই তা স্পষ্ট প্রমাণ করে। কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে গোটা রাজ্যে এসআইআর চালানো হয়েছে, অথচ ধরা পড়েছে মাত্র ৩ জন রোহিঙ্গা ও ৭৬ জন অনুপ্রবেশকারী অর্থাৎ মোটে ৮০ জন। এত বিপুল অর্থব্যয়, এত প্রশাসনিক শক্তি কি শুধুই এই অল্প সংখ্যক সন্দেহভাজনের জন্য? নাকি এটি ১২টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের ভোটমুখী নির্বাচনের আগে নাগরিকত্বের প্রশ্নে এক রাজনৈতিক জুজু দেখিয়ে ভোটব্যাঙ্কের সমীকরণ পাল্টানোর কৌশল? প্রশ্ন উঠছে। ওঠাই স্বাভাবিক ও সংগত। অযৌক্তিক মোটেই নয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, এসআইআর আসলে এক মনস্তাত্ত্বিক প্রচারযুদ্ধ। এতে বিশেষত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে নাগরিকত্ব ও ভোটাধিকার নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে। সাধারণ মানুষ যখন নিজের নাগরিকত্ব নিয়েই সন্দেহে পড়ে যায়, তখন গণতন্ত্রের ভিত নড়ে যায়। সুপ্রিম কোর্ট ইতিমধ্যেই নির্বাচন কমিশনকে একাধিকবার ভর্ৎসনা করেছে। প্রশ্ন তুলেছে এর সাংবিধানিক যৌক্তিকতা ও প্রয়োজনীয়তা নিয়ে। বিরোধীরা প্রকাশ্যেই কমিশনকে বিজেপির ‘বি-টিম’আখ্যা দিয়েছে, অথচ শাসকদল বিজেপি নির্বাক। এই নীরবতাই অনেক কিছু বলে দেয়।
রাহুল গান্ধী ও ‘ইন্ডিয়া’ জোটের শরিকরা অভিযোগ তুলেছেন, বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে বিরোধী ঘাঁটির নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হচ্ছে এবং নতুন নাম যুক্ত হচ্ছে শাসক ঘনিষ্ঠ এলাকায়। এসব অভিযোগের তদন্ত না করে কমিশন উল্টে অভিযোগকারী দেশের বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধীকেই ক্ষমা চাইতে বলছে, হলফনামা দিতে বলছে! এ কেমন নিরপেক্ষতা? সংবিধানের ৩২৪ ধারা অনুযায়ী নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব হল গণতন্ত্রের প্রহরী থাকা, কোনও রাজনৈতিক দলের সহায়ক নয়। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ দেখে মনে হচ্ছে, কমিশন যেন প্রহরীর ভূমিকা ছেড়ে কেন্দ্র সরকারের ইচ্ছাপূরণে ব্যস্ত।
এসআইআর যদি সত্যিই মৃত বা ভুয়ো ভোটার বাদ দেওয়ার উদ্যোগ হয়, তবে তা হোক স্বচ্ছ, যুক্তিযুক্ত ও মানবিক প্রক্রিয়ায়। গণতন্ত্র টিকে থাকে বিশ্বাসে, ভয়ে নয়। রাষ্ট্র যদি নাগরিককে সন্দেহের চোখে দেখে, তবে সেটাই গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা। তাই রাজ্যবাসীর প্রতি আমার আন্তরিক আবেদন — ভয় নয়, সচেতনতা হোক আমাদের প্রতিরোধের হাতিয়ার। নিজের ভোটাধিকার ও পরিচয় নথি সঠিক রাখুন, গুজবে কান দেবেন না। কারণ, নাগরিকত্ব প্রমাণের দায় আপনার নয়, রাষ্ট্রের। আর ভোটাধিকার শুধু একখানা কার্ড নয়, সেটাই আপনার অস্তিত্বের প্রমাণ।








