এসআইআর-এ নাম বাদ গেলে কী হতে পারে?
নিজেদের পাতা ফাঁদেই নিজেরাই জড়িয়েছে বিজেপি?
বিশেষ প্রতিবেদন:
ইতিমধ্যেই এসআইআর-কে ঘুরপথে এনআরসি-র ছক বলে অভিযোগ তুলেছে বিরোধী দলগুলো। তাই সাধারণ মানুষেলর মনেও এ নিয়ে নানা রকম উদ্বেগ, আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। অনেকেই ভাবছেন, এসআইআর প্রক্রিয়ায় ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ গেলে তিনি কি আর দেশের নাগরিক থাকবেন? পরবর্তী সেন্সাসে কি তাঁর নাম থাকবে? নাকি অন্য কোনও পরিচয়ে অভিহিত করা হবে? তারা কি ডি-ভোটার হয়ে যাবেন? এমন নানা ধরনের প্রশ্নবাণের পাশাপাশি জানা গিয়েছে, আগামী ১০ নভেম্বর থেকে দেশজুড়ে প্রাক-সেন্সাস সমীক্ষা শুরু হবে। ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত চলবে এই পর্ব।
এনআরসি অথবা এসআইআর তালিকাকে জনগণনা প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত করা হবে কি না — এ প্রশ্নেও চলছে ব্যাপক জল্পনা। আইন অনুযায়ী ডি-ভোটার বা ডাউটফুল ভোটার তকমা দিয়ে অসমে এনআরসি তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে বহু মানুষকে। নিজেদেরকে দেশের বৈধ নাগরিক প্রমাণ করার জন্য নানারকম নথিপত্র দেখিয়ে তাদের ট্রাইব্যুনালে আবেদন করতে হয়েছে। ২০১৯ সালে অসমে এনআরসি তালিকা থেকে বাদ পড়েছিল সাড়ে ১৯ লক্ষ মানুষের নাম, যার বড় অংশই হিন্দু এবং বাঙালি। মুসলিম ছিল মাত্র ৫ লক্ষের মতো। তারপর বিপাকে পড়ে গত ৬ বছরেও চুড়ান্ত এনআরসি তালিকা প্রকাশ করতে পারেনি অসম সরকার। দায় এড়াতে সরিয়ে দেওয়া হয় এনআরসি-র সর্বোচ্চ অধিকর্তাকে।
উল্লেখ্য, পশ্চিমবঙ্গের পাশাপাশি অসমেও আগামী বছর বিধানসভা ভোট হওয়ার কথা। অথচ সেই রাজ্যে এসআইআর করা হচ্ছে না। কারণ, হিসেবে নির্বাচন কমিশন সাফাই দিয়ে বলেছে, এনআরসি-র চূড়ান্ত তালিকা এখনও প্রকাশ হয়নি। নানা জটিলতায় আটকে রয়েছে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের অধীনস্ত রেজিস্ট্রার জেনারেল অব ইন্ডিয়ার দফতরে। তাই যতক্ষণ না চূড়ান্ত এনআরসি তালিকা প্রকাশ হচ্ছে, ততদিন অসমে এসআইআর করা সম্ভব নয়। তবে এই ঘোষণার পরই অসমের বিজেপি সরকার নির্বাচন কমিশনের কাছে আবেদন করে বলেছে, এনআরসি তালিকাকেই এসআইআরের সঙ্গে যুক্ত করা হোক। কমিশন এখনও এ ব্যাপারে ফাইনাল সিদ্ধান্ত জানায়নি। তাই প্রশ্ন উঠছে, অসমে এনআরসিতে যাদের নাম বাদ পড়েছে এবং ফরেনার্স ট্রাইবিউনালে আবেদনের পর চূড়ান্ত তালিকাতেও যাদের নাম বাদ যাবে, তাদের নাগরিকত্বের বিষয়টা কী হবে?
উল্লেখ্য, দেশে সর্বসেষ সেন্সাস বা জনগণনা হয়েছিল ২০১১ সালে। তারপর হওয়ার কথা ছিল ২০২১ সালে। কিন্তু করোনা অতিমারীর কারণে হয়নি। তারপর লকডাউন এবং করোনা বিদায় নিলেও গত ৪ বছরে জনগণনা করেনি কেন্দ্র সরকার। শোনা যাচ্ছে, শীঘ্রই শুরু হবে সেন্সাস। আগামী বছর এপ্রিল থেকে প্রথম দফার কাজ অর্থাৎ বাড়ি ও পরিবার গণনা শুরু হবে। তার ৬ মাস আগে শুরু হয়ে গেল এসআইআর। ৯ ডিসেম্বর প্রকাশিত হবে খসড়া ভোটার তালিকা। সেখানে যাদের নাম থাকবে না, তাদের আবেদন ও কাগজপত্র জমা দেওয়ার পর্ব চলবে পরবর্তী দুই মাস ধরে। তারপর চূড়ান্ত এসআইআর তালিকা প্রকাশ হবে।
তারপরেও যাদের নাম বাদ থাকবে, তাঁরা কি নাগরিক হিসেবে গণ্য হবেন? তাদের নাম কি সেন্সাসে থাকবে? নাহলে তারা কী করবেন? এসব প্রশ্ন অমীমাংসিত থেকেই যাচ্ছে। অনেকে বলছেন, এনআরসির সঙ্গে এসআইআর বা ভোটার তালিকার সম্পর্ক নেই। অথচ এনআরসি পর্বে অনেককে ডি-ভোটার বা সন্দেহভাজন ভোটার হিসেবে দেখানো হয়েছে। অসমে এখনও সেই সমস্যার সমাধান হয়নি। চটজলদি সমাধান করতে গেলে অসংখ্য হিন্দুর ভোটাধিকার বা নাগরিকত্ব চলে যাবে। তাহলে তো বিজেপি ধূলিসাৎ হয়ে যাবে। তাই বিজেপি বা কেন্দ্র সরকার এখন জল মাপছে কিংবা মুখ বাঁচানোর পথ খুঁজছে। বিজেপি রাজনৈতিকভাবে দাবি করছে, বাদ যাওয়া হিন্দুরা সিএএ আইনে আবেদন করতে পারবে। যদিও একথা সরকারিভাবে ঘোষণা করা হয়নি। কারণ, বাদ পড়া মুসলিম বা অন্য ধর্মের লোকদের কী হবে — সেটা বিজেপির তরফে বলা হয়নি। বিরোধীদের অভিযোগ, সব মিলিয়ে বিজেপি মহাফাঁপরে পড়েছে। এনআরসি, সিএএ, এসআইআর ইত্যাদি করতে গিয়ে বিজেপি নিজেদের পাতা ফাঁদেই পড়ে গিয়েছে।








