গাজার কষ্টিপাথরে যাচাই হোক বিশ্ব-বিবেক
বিশেষ প্রতিবেদন
গ্রেটা থুনবার্গ ও তার টিমের লোকদের ওপর ইসরাইলি কর্তৃপক্ষের হেনস্থার খবর বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তুলেছে। গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা-র সদস্যদের বর্ণনায় উঠে এসেছে, কীভাবে গ্রেটাকে চুলের মুঠি ধরে টেনে নিয়ে গিয়ে ইসরাইলি পতাকায় চুম্বন দিতে বাধ্য করা হয়েছে, মারধর করা হয়েছে এবং তিনদিন পর্যাপ্ত খাবার-জল পর্যন্ত দেওয়া হয়নি। গ্রেটার মতো একজন আন্তর্জাতিক সেলিব্রিটি যদি এইরকম হেনস্থার শিকার হতে পারেন, তবে প্রতিদিন যে পাশবিকতা ও বর্বরতা গাজাবাসীকে সহ্য করতে হয়, তা কল্পনাতীত।
ইসরাইল কোনও ব্যতিক্রমী রাষ্ট্র নয়, এমন পৈশাচিক আচরণ তার চরিত্রের অন্তর্নিহিত অংশ। বছর দুয়েক আগে নেতানিয়াহুর স্ত্রী সারার ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টা জিপি নাভোন প্রকাশ্যে বলেছিলেন, গাজাবাসীকে হত্যা না করে জীবিত রেখে বাড়ি বাড়ি ঢুকে নির্যাতন করা হোক, যাতে ইসরাইলিরা তাঁদের আর্তনাদ উপভোগ করতে পারে। এই বক্তব্য শুধু একজন ব্যক্তির বিকৃত মনোভাব নয়; বরং গোটা রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতিফলন।
অনেকে বলেন, গাজার সংঘাত শুরু হয়েছে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের আক্রমণের মধ্য দিয়ে। কিন্তু ইতিহাস সম্পূর্ণ অন্য কথা বলে। ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ করে ১৯৪৮ সালে ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকেই শুরু ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা সংগ্রাম। সেই থেকে আজ দীর্ঘ ৭৭ বছর ধরে এই রক্তক্ষয়ী লড়াই চলছে। অকাতরে প্রাণ বিসর্জন দিয়েও দেশের স্বাধীনতার জন্য আজো মরিয়া হয়ে প্রতিরোধ সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে গাজাবাসী তথা ফিলিস্তিনিরা। কখনও ইয়াসের আরাফতের পিএলও, কখনও মাহমুদ আব্বাসের ফাতাহ, কখনও হামাস, কখনও পিএফএলপি কিংবা ডিএফএলপি — কেউ না কেউ এই আন্দোলনের ছায়া হয়ে থেকেছে। একই সঙ্গে গাজার তরুণ প্রজন্ম তাদের ভৌগোলিক স্বাধীনতার জন্য লাঠি, তরোয়াল কিংবা পাথর নিয়েই লড়াই করছে আগ্নেয়াস্ত্রধারী ইসরাইলি পুলিশ ও সেনাদের বিরুদ্ধে। জল্লাদ নেতানিয়াহু সরকার হামাসকে সন্ত্রাসী তকমা দিয়ে এই অছিলায় নিরীহ ও নিরস্ত্র গাজাবাসীকে গণহত্যা করে চলেছে।
ইসরাইল যে পাইকারি হারে নির্বিচারে গণহত্যা চালাচ্ছে, তার আর প্রমাণ দরকার আছে বলে মনে হয় না। ৭ অক্টোবর ২০২৩ থেকে মাত্র গত দু-বছরেই হত্যা করেছে অন্তত ৬৭ লক্ষ গাজাবাসীকে (মতান্তরে নিহতের সংখ্যা আড়াই লক্ষাধিক)। ৪০০ শিশু-সহ প্রায় ১৫ হাজার ফিলিস্তিনিকে বিনা বিচারে বছরের পর বছর কারাগারে আটকে রেখেছে ইসরাইল। প্রতি বছর কত সংখ্যক মানুষকে হত্যা করা হচ্ছে, তার ইয়ত্তা নেই। শুধু জানা গিয়েছে, নিহতদের ৭০ শতাংশই নারী ও শিশু। এর বিপরীতে বিগত সাড়ে সাত দশকে হামাস বড়জোর হাজার পাঁচেক ইসরাইলি বা ইহুদিকে হত্যা করেছে। অর্থাৎ হামাসকে খুনি বলা হলে, ইসরাইল নিশ্চিত গণহত্যাকারী। সুতরাং দিনের আলোর মতো পরিষ্কার যে, হামাস বা গাজাবাসী নয়; বরং ইসরাইলই একতরফা হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে যাচ্ছে। ঠিক যেমন ক্ষুদিরাম বা ভগৎ সিং ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেননি; বরং ব্রিটিশের নিপীড়নের প্রতিক্রিয়ায় প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন, ফিলিস্তিনিরাও সেটাই করছেন।
আজকের এই সংগ্রাম কেবল ফিলিস্তিনের নয়, গোটা বিশ্বের নিপীড়িত মানুষের। ভিয়েতনামে যখন নাপাম বোমা ফেলছিল মার্কিন বাহিনী, তখন যেমন লন্ডন, প্যারিস, নিউ ইয়র্ক কিংবা কলকাতার রাস্তায় আছড়ে পড়েছিল শান্তিকামী জনস্রোত, আজ তেমনই দৃশ্য দেখা যাচ্ছে ইউরোপের দেশগুলোতে। ইতালির শ্রমিকরা ধর্মঘটে গোটা দেশ স্তব্ধ করছেন, গ্রীসের ছাত্র-শ্রমিকরা বন্দর অবরোধ করছেন, যাতে ইসরাইলে অস্ত্র পাঠানো না যায়। বার্লিন, ব্রাসেলস, প্যারিস থেকে শুরু করে লাতিন আমেরিকা পর্যন্ত লক্ষ লক্ষ মানুষ রাস্তায় নেমেছেন ফিলিস্তিনের প্রতি সংহতি ও সহমর্মিতা জানাতে।
এই সংগ্রামে ধর্ম নয়, মতাদর্শ নয়, মানুষই মুখ্য। ফিলিস্তিনি পপুলার ফ্রন্টের প্রতিষ্ঠাতা জর্জ হাবাশ ছিলেন খ্রিস্টান। তাঁর মানবিক আহ্বানে সাড়া দিয়ে ইসরাইলি গণহত্যার প্রতিবাদে ২৫ ডিসেম্বর বড়দিনে ফিলিস্তিনের চার্চগুলো আলো নিভিয়ে রেখেছিল। বিশ্বজুড়ে বহু বিশিষ্ট ইহুদি এই লড়াইয়ের শরিক। লন্ডন কিংবা নিউ ইয়র্কের মিছিলে তাঁদের হাতে দেখা যাচ্ছে ফিলিস্তিনের পতাকা। হিটলারের কনসেনট্রেশন ক্যাম্প থেকে বেঁচে যাওয়া পরিবারগুলির উত্তরসূরীরাও আজ ঘাতক যায়নবাদের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনের পক্ষে দাঁড়াচ্ছেন।
সত্য এটাই, ফিলিস্তিন আজকের পৃথিবীর কষ্টিপাথর। এই কষ্টিপাথরে পরীক্ষা হচ্ছে বিশ্ব-বিবেক ও মানবিকতা। আপনি গণহত্যার বিরুদ্ধে, নাকি পক্ষে? মাঝামাঝি কিছু নেই। কোনও মতাদর্শ, কোনও দল বা রাষ্ট্র — কিছুই এই প্রশ্নের থেকে বড় নয়। ফিলিস্তিনের লড়াই তাই কেবল এক ভূখণ্ডের মুক্তিযুদ্ধ নয়, এটি সমগ্র মানবসভ্যতার মুক্তির লড়াই। পৃথিবীর সমস্ত শান্তিকামী ও মুক্তিকামী মানুষের একসঙ্গে গলা মেলাতে হবে, সবাই একসঙ্গে গলাগলি করতে হবে, আর গালাগালি করতে হবে নেতানিয়াহু ও তার যুদ্ধবাজ সরকারকে। সবাইকে একসুরে বলতে হবে, আমরা ফিলিস্তিনের পাশে, আমরা গণহত্যার বিরুদ্ধে। গলা ছেড়ে বলতে হবে, যুদ্ধ নয়, শান্তি চাই। গর্জে উঠে স্লোগান দিতে হবে, নেতানিয়াহু নিপাত যাক, ফিলিস্তিন জিন্দাবাদ।








