গ্রামের কৃষকের ছেলের উচ্চমাধ্যমিক বোর্ডে স্থানাধিকার
নতুন পয়গাম, এম নাজমুস সাহাদাত, কালিয়াচক: মালদহের কালিয়াচক ফের রাজ্যজুড়ে নজর কাড়ল এক কৃতি ছাত্রের অসাধারণ সাফল্যে। এবারের উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় রাজ্যে নবম স্থান অধিকার করে জেলার মুখ উজ্জ্বল করল কালিয়াচকের সুজাপুর হাইস্কুলের ছাত্র মহম্মদ সাহাবুদ্দিন আলি। শুধু তাই নয়, মালদা জেলাতেও সে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেছে। উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা সংসদের প্রকাশিত মেধা তালিকায় প্রথম দশে মোট ৬৪ জনের নাম রয়েছে। সেই তালিকায় নিজের জায়গা করে নিয়ে নতুন ইতিহাস গড়েছে শাহাবুদ্দিন। তার প্রাপ্ত নম্বর ৪৮৮, অর্থাৎ ৯৭.৬০ শতাংশ। তবে সাহাবুদ্দিনের এই সাফল্যের পিছনে রয়েছে দীর্ঘ সংগ্রাম, কঠোর অধ্যবসায় এবং এক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিশেষ ভূমিকা। যদিও সে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়েছে সুজাপুর হাইস্কুল থেকে, কিন্তু ষষ্ঠ শ্রেণী থেকে দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত তার পড়াশোনা হয়েছে কালিয়াচকের সাহাবাজপুর এলাকার বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান টার্গেট পয়েন্ট স্কুলে। স্কুল কর্তৃপক্ষ তার মেধাকে গুরুত্ব দিয়ে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে পড়াশোনার সুযোগ করে দেয়। অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার মধ্যেও যাতে মেধা হারিয়ে না যায়, সেই লক্ষ্যেই তাকে দীর্ঘদিন ধরে সহযোগিতা করেছে স্কুল।
সাহাবুদ্দিনের বাড়ি বৈষ্ণবনগরের ভগবানপুর এলাহী টোলা এলাকায়। তার বাবা সাইফুদ্দিন আলি পেশায় একজন কৃষক। মা শিউলি বিবি গৃহবধূ। সংসারের আর্থিক অবস্থা খুব একটা স্বচ্ছল না হলেও ছেলের পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ ও একাগ্রতা কখনও কমতে দেননি তারা। গ্রামের সাধারণ পরিবারের এই ছেলের সাফল্যে এখন আনন্দে ভাসছে গোটা এলাকা। এটাই প্রথম নয়। এর আগেও মাধ্যমিক পরীক্ষায় রাজ্যে ষষ্ঠ স্থান অধিকার করে সকলকে চমকে দিয়েছিল সাহাবুদ্দিন। সেই সাফল্যের ধারা বজায় রেখেই এবার উচ্চমাধ্যমিকেও রাজ্যের মেধা তালিকায় জায়গা করে নিল সে। ফলে মাধ্যমিকের পর আবার উচ্চমাধ্যমিকেও বোর্ডে স্থান অর্জন করে বিরল নজির গড়ল কালিয়াচকের এই কৃতি ছাত্র। স্থানীয় শিক্ষামহলের মতে, কালিয়াচকের ইতিহাসে এই প্রথম কোনও ছাত্র উচ্চমাধ্যমিকে রাজ্যের বোর্ড তালিকায় স্থান লাভ করল। সাহাবুদ্দিন জানিয়েছে, ভবিষ্যতে সে ডাক্তারি নিয়ে পড়াশোনা করতে চায়। তার স্বপ্ন, বড় হয়ে গ্রামের সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং চিকিৎসার মাধ্যমে সমাজের সেবা করা। নিয়মিত পড়াশোনা, সময় মেনে প্রস্তুতি এবং শিক্ষকদের পরামর্শই তাকে এই সাফল্যের জায়গায় পৌঁছে দিয়েছে বলে জানায় সে।
এদিকে সাহাবুদ্দিনের সাফল্যে উচ্ছ্বসিত টার্গেট পয়েন্ট স্কুল কর্তৃপক্ষও। এবছর স্কুল থেকে মোট ১৭১ জন ছাত্র-ছাত্রী উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেছে। এর মধ্যে ছাত্র ১০৬ জন এবং ছাত্রী ৬৫ জন। বিগত কয়েক বছর ধরেই মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক এবং বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় ধারাবাহিকভাবে উল্লেখযোগ্য ফলাফল করে আসছে এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। বিশেষ করে নিটসহ বিভিন্ন প্রবেশিকা পরীক্ষায় স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীদের সাফল্য জেলার শিক্ষামহলে আলাদা পরিচিতি তৈরি করেছে। স্কুলের প্রধান শিক্ষক উজির হোসেনের বক্তব্য, সাহাবুদ্দিন অত্যন্ত শান্ত, ভদ্র ও অধ্যবসায়ী ছাত্র। পড়াশোনার প্রতি তার একাগ্রতা এবং নিয়মিত পরিশ্রমই তাকে আজ এই জায়গায় পৌঁছে দিয়েছে। তার এই সাফল্য আগামী দিনে আরও বহু ছাত্র-ছাত্রীকে অনুপ্রাণিত করবে বলেও মনে করছেন শিক্ষকরা। ফল প্রকাশের পর থেকেই সাহাবুদ্দিনের বাড়িতে শুভেচ্ছা জানাতে ভিড় জমিয়েছেন আত্মীয়-পরিজন, প্রতিবেশী এবং এলাকার মানুষ। গ্রামের এক কৃষকের ছেলে যে রাজ্যের মেধা তালিকায় স্থান পেতে পারে, সেই ঘটনাই আজ নতুন আশার আলো দেখাচ্ছে বহু সাধারণ পরিবারকে।








