ডিজিটাল আসক্তি বনাম বইমুখী সংস্কৃতি: লাইব্রেরি কি হারিয়ে যাচ্ছে?
নতুন পয়গাম, হাসান লস্কর, দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা: একসময় গ্রাম থেকে শহর; পাড়ায় পাড়ায় লাইব্রেরি ছিল জ্ঞানচর্চা ও সামাজিক মেলবন্ধনের কেন্দ্রবিন্দু। কালের বিবর্তনে আজ সেই চিত্র বদলে যাচ্ছে। ই-বুক, অডিও বুক ও অনলাইন তথ্যভাণ্ডারের সহজলভ্যতা পাঠাভ্যাসের রূপরেখাই পাল্টে দিয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, প্রযুক্তি কি সত্যিই গ্রন্থাগারের স্থান নিতে পারে?
পাঠক কোথায় হারালেন?
তথ্যপ্রযুক্তির অভূতপূর্ব অগ্রগতি মানুষের অভ্যাস বদলে দিয়েছে। এক সময় যেখানে পাঠক লাইব্রেরিতে গিয়ে বই খুঁজতেন, ঘণ্টার পর ঘণ্টা পড়ে মগ্ন থাকতেন, সেখানে এখন স্মার্টফোনের এক ক্লিকেই হাজারো বইয়ের সম্ভার। ই-বুক ও পিডিএফ সংস্করণ কিন্ডল বা মোবাইলের পাতলা স্ক্রিনে বন্দি। আবার অডিও বুকের সুবাদে ‘পড়া’ নয়, ‘শোনা’র সংস্কৃতি জায়গা করে নিচ্ছে ব্যস্ত মানুষের জীবনে। গবেষণা ও রেফারেন্সের ক্ষেত্রেও বদল এসেছে। এক সময় লাইব্রেরির ওপর নির্ভরশীল শিক্ষার্থী ও গবেষকেরা এখন গুগল বা উইকিপিডিয়ায় মুহূর্তেই তথ্য পেয়ে যান। পাশাপাশি মানুষের মনোযোগের পরিধিও সংকুচিত হয়েছে। দীর্ঘক্ষণ ধরে বই পড়ার পরিবর্তে টিকটক, রিলস বা ছোট ভিডিও স্ক্রল করায় বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছেন তরুণ প্রজন্ম।
গ্রন্থাগারের প্রাসঙ্গিকতা আজও অম্লান
তথ্যের ঝরনাধারা প্রযুক্তি দিলেও, লাইব্রেরির পরিবেশ ও নিস্তব্ধতা গভীর পাঠের জন্য অপরিহার্য বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। লাইব্রেরির বইয়ের পাতা ওল্টানোর অনুভূতি, পুরনো বইয়ের ঘ্রাণ— এমন কিছু অভিজ্ঞতা, যা কোনো স্ক্রিন দিতে পারে না। নোটিফিকেশনের বাধা ছাড়া, মনসংযোগের অনন্য পরিবেশ তৈরি করে গ্রন্থাগার। লাইব্রেরি শুধু বই রাখার স্থান নয়, এটি এক সভ্যতার স্মৃতিশক্তি— মত দেন সমাজকর্মীরা। সেই স্মৃতিশক্তি ধরে রাখতেই এগিয়ে এসেছে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘দ্য স্ট্রেইট টক’।
বইমুখী সমাজ গড়তে উদ্যোগী দ্য স্ট্রেইট টক
কলকাতাভিত্তিক এই সংস্থা প্রায় এক দশক ধরে রাজ্যের জেলায় জেলায় শিশুপাঠ ও শিক্ষা সংক্রান্ত নানা সামাজিক উদ্যোগ চালিয়ে আসছে। তাদের কাজের স্বচ্ছতা ও নিষ্ঠা এনে দিয়েছে নানা পুরস্কারও। সম্প্রতি কুমার প্রমথনাথ রায় পাবলিক চ্যারিটেবল ট্রাস্টের আর্থিক সহায়তায় চার মাস ধরে জেলায় জেলায় শিক্ষা ও পুষ্টি কর্মসূচি নিয়েছে সংস্থাটি। এ কর্মযজ্ঞের মধ্যে ছিল বেসরকারি স্কুলের ৫০০ শিক্ষার্থীকে ১০০ দিনের জলখাবার প্রদান, বনহুগলীর রামকৃষ্ণ আনন্দ আশ্রমের ছাত্রী আবাসে ৬টি বাথরুম সংস্কার, ক্যানিং-এর রামকৃষ্ণ আশ্রম বিদ্যামন্দিরে ১৩৮ জন ছাত্রছাত্রীর হাতে স্কুলব্যাগ ও শিক্ষাসামগ্রী তুলে দেওয়া।
নারী দিবসে উদ্বোধন ‘সুকুমার চক্রবর্তী স্মৃতি পাঠাগার’
আন্তর্জাতিক নারী দিবসের প্রাক্কালে, গত ৮ মার্চ ক্যানিং-এ উদ্বোধন করা হয় ‘সুকুমার চক্রবর্তী স্মৃতি পাঠাগার’। অনুষ্ঠানে উপস্থিত চ্যারিটেবল ট্রাস্টের প্রধান শ্রীবেণীমাধব এবং অন্যান্য বক্তারা ছাত্রছাত্রীদের মোবাইল আসক্তি ছেড়ে বই পড়ায় মনোনিবেশ করার আহ্বান জানান। আগামী মাসে জয়নগরের নালুয়া সাউথ মেরিট একাডেমিতে আরও একটি লাইব্রেরি উদ্বোধনের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি এ মাসেই পুরুলিয়ার বাঘমুন্ডির সিঁধু কানহু শিক্ষা নিকেতনের ১২১ জন ছাত্রছাত্রীর জন্য এক মাসের রেশন দেওয়ার কর্মসূচি হাতে নিয়েছে সংস্থাটি।
প্রান্তিক মানুষের পাশে ‘দ্য স্ট্রেইট টক’
প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর শিক্ষার প্রসারে ক্যানিং-এর চ্যাংদোনা গ্রামে উদ্বোধন করা হয়েছে একটি ‘বয়স্ক শিক্ষাকেন্দ্র’। সপ্তাহে একদিন বয়স্ক নারী-পুরুষদের পড়াশোনায় উৎসাহ দিতে দেওয়া হয় টিফিনের ব্যবস্থা। পাশাপাশি সংস্থার নিজস্ব উদ্যোগে প্রায় দুই লক্ষাধিক টাকা ব্যয়ে তৈরি হচ্ছে চারটি বাথরুম, যা প্রায় শেষের পথে।
করপোরেট সহায়তায় বদলে যাচ্ছে স্কুল
গত মার্চ ২০২৫-এ দ্য স্ট্রেইট টক-এর প্রচেষ্টায় কানাড়া ব্যাংকের করপোরেট সোশ্যাল রেসপন্সিবিলিটি (সিএসআর) ফান্ড থেকে অফেরতযোগ্য ২৫ লক্ষ টাকা অনুদান পায় সংস্থাটি। এই অর্থে জয়নগরের নালুয়া সাউথ মেরিট একাডেমির টিন shed-এর স্কুল ভেঙে পাকা দালান তৈরি করা হয়েছে। সেখানে এখন ৩০০ জন দুঃস্থ প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার্থী পড়াশোনার সুযোগ পাবে।
শুধু বই, শিক্ষা কিংবা পুষ্টি নয়— প্রান্তিক মানুষের আত্মসম্মান ও অধিকার প্রতিষ্ঠায় নীরব বিপ্লব ঘটাচ্ছে ‘দ্য স্ট্রেইট টক’। ডিজিটাল যুগেও বই ও লাইব্রেরির প্রাসঙ্গিকতা বাঁচিয়ে রাখার লড়াইয়ে এমন উদ্যোগ হয়ে উঠতে পারে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।








