বঙ্গীয় এলিটদের মানসিক অবক্ষয়ের স্বরূপ
লেখক: পাভেল আখতার
‘এলিট’ শব্দটি যে দ্যোতনা বয়ে আনে, তা কেবল নির্দিষ্ট একটি লেখকগোষ্ঠীকে নয়, কিছু পাঠককেও বলা যায়। বাস্তব জগৎ থেকে মুখ ফিরিয়ে উটপাখির মতো গম্ভীর বিদ্যাচর্চায় দুটি গোষ্ঠীরই বিচরণ দেখা যায়। ”মোর নাম এই বলে খ্যাত হোক, আমি তোমাদেরই লোক!” কবির এই আকুলতাটি কেন উচ্চারিত হ’ল? অলস অন্যমনে একসময় ‘তাঁর’ মনে হয়েছিল, তিনি ‘দূর-গ্রহের কেউ’ হয়ে রয়ে গেছেন! জীবনভর তিনি ‘মানব-ভাবনা’রই কিন্তু সাধনা করেছেন। ওই ‘আকুলতা’টি এমন একটি সজীব বস্তু, যা ফুটে উঠে যতটা লেখায়, তার চেয়েও বেশি জীবনচর্যায়। লেখা আর লেখকের জীবনচর্যার মধ্যে যদি ‘দূরত্ব’ থাকে, তাহলে তুমুল ‘মানবিক লেখা’ও সমাজের সাধারণ মানুষকে প্রভাবিত করতে পারে না। ‘দীনদান’ কবিতায় ঈশ্বর কীভাবে দুঃখী, আর্ত মানুষের সঙ্গে ‘সমানুভূতি’তে একাত্ম হচ্ছেন, তার প্রক্রিয়া বর্ণিত হয়েছে। অতএব, মানুষের জন্য ভাবছি, অথচ মানুষ থেকেই দূরে আছি, এর মধ্যে ছলনা আছে। ”যত বড় হোক ইন্দ্রধনু সে সুদূর আকাশে আঁকা, আমি ভালবাসি মোর ধরণীর প্রজাপতিটির পাখা!” এই সত্যের কাছে সাধারণ মানুষের সমাজ দায়বদ্ধ।
এলিট বুদ্ধিজীবীদের অধিকাংশই কপট ও সুবিধাবাদী! এঁদের নিয়ে অবশ্য বাংলার বিপুল জনতার মাথাব্যথা নেই! শিক্ষিত মধ্যবিত্তের সমস্যা হল, তারা যা জানে, তাকেই চূড়ান্ত সত্য মনে করে! অথচ, তাদের জানার সঙ্গে বিপুল প্রান্তিক মানুষের নিত্যদিনের জীবনযাপনের কোনও সম্পর্কই নেই! শিক্ষিত মধ্যবিত্তের দ্বারা ভীষণ তোলপাড় করা অতীতে অনেক ইস্যু ঠিক এই কারণেই মুখ থুবড়ে পড়েছিল! সমাজে ধর্মবিদ্বেষ-এর বিস্তার নিয়ে এলিটরা দায়ী করেন সাধারণ মানুষের অশিক্ষাকে। কোন্ শিক্ষার কথা তাঁরা বলেন? বহু এলিট বা শিক্ষিত মানুষ ধর্মঘৃণা বা সম্প্রদায়-বিদ্বেষ নিজেদের অন্তরে লালন করেন। নিজেদের অন্তরে সাম্প্রদায়িক ঘৃণা গোপন রেখে সাধারণ মানুষের দিকে আঙুল তোলা হচ্ছে সাংঘাতিক কপটতা বা ছলনা, যা বাস্তবে বহু এলিট বা শিক্ষিত মানুষের মধ্যে বিদ্যমান! সব আগে তাদেরই শিক্ষার প্রয়োজন আছে! কারণ, সমাজে সাধারণ মানুষ নিজে থেকে কখনও ধর্ম বা সম্প্রদায়বিদ্বেষী হয় না! তারা বরং মিলেমিশে থাকাই পছন্দ করে! সাধারণ মানুষের মধ্যে যে সাম্প্রদায়িকতা দেখা যায়, তা তাদের সহজাত বা স্বতঃস্ফূর্ত নয়; বরং আরোপিত! এলিটদের সাম্প্রদায়িকতা এর বিপরীত!
এলিট লেখক-বুদ্ধিজীবীদের তরফে এসআইআর-এর মাধ্যমে ভোটার তালিকা থেকে বিপুল হতভাগ্য বাঙালির নাম বাদ পড়ায়, যাদের মধ্যে অধিকাংশই গরিব, প্রান্তিক মানুষ, সর্বোপরি বৈধ নাগরিক, প্রতিবাদী লেখা কারও চোখে পড়েছে কী? উন্মত্ত তাণ্ডবে সংখ্যালঘু বাঙালির উপর ক্রমাগত আক্রমণ নিয়ে তাঁদের প্রতিবাদী বক্তব্য দেখা গেছে? উল্লেখ্য, বাংলাদেশে সংখ্যালঘু বাঙালির বিপন্নতায় তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে তাঁরা দ্বিধাবোধ করেন না! সেটা নিশ্চয় যথার্থ ও অভিপ্রেত, কিন্তু নিজ ভূখণ্ডের বিপন্ন সংখ্যালঘুর প্রতি সহানুভূতি নেই, অথচ অন্য দেশের সংখ্যালঘুর বিপন্নতায় চিৎকার করে ওঠেন, এরপরও কি তাদের ‘সাম্প্রদায়িক মানসিকতা’ বুঝতে অসুবিধা থাকে? তাঁরা নিজেদের ‘মানবতাবাদী’ ভেবে আত্মশ্লাঘা বোধ করেন, যা নিঃসন্দেহে অতি বিচিত্র!
কথিত এলিট বুদ্ধিজীবীদের বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির অনুরাগী হিসেবে আমরা জানি। সেটাই তো স্বাভাবিক ও প্রত্যাশিত। সব বাঙালির মধ্যেই এই আবেগ থাকা জরুরি। আমরা দেখেছি, নিকট অতীতে বাংলাদেশে লালন ফকির ও রবীন্দ্রনাথকে বিসর্জন দেওয়ার মতো ঘনিয়ে ওঠা ঘৃণ্য প্রবণতার বিরুদ্ধে এলিটরা ধিক্কার দিয়েছেন, প্রতিবাদও করেছেন, যা সেই অনুরাগেরই বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু, মজার বিষয় হল, এখানে বাংলা ভাষা ও বাঙালি সংস্কৃতির উপর যে আক্রমণ দেখা যায়, উপরে উল্লিখিত দৃশ্যের মতো এক্ষেত্রেও তাঁদের নীরবতা দৃশ্যমান থাকে! প্রসঙ্গত, এলিটরা ‘মান্য বাংলা’ বলতে আসলে লিখিত বাংলার রূপকেই বোঝান। এটা সম্পূর্ণ ভুল। ‘মান্য বাংলা’ কথাটাই ভুল। ভাষা জিনিসটা মূলত মুখনিঃসৃত ধ্বনিসমষ্টি মাত্র; তাকে পাঠের জন্য লিখিত রূপ দেওয়া হয়। ভাষার একটা কাঠামোয় ইস্কুল ও কলেজের বই বা অন্যান্য বই লেখা হচ্ছে বলেই সেটা ‘মান্য বাংলা’ — এটা নিছক অপযুক্তি। সাহিত্যে উপভাষার জোয়ার থাকে। এবং, ভাষার সঙ্গে সাহিত্যের যোগসূত্র অতি ঘনিষ্ঠ। তাহলে সেটা উপেক্ষা করে পালিশকৃত এলিট বাংলাকে কেবল মান্য বলা কি একপেশে নয়? ভদ্রবিত্ত এলিট বাঙালির, যাদের মধ্যে ভাষাবিদও আছেন, এটা একটা কপটতা! এদের মধ্যে ‘কেন্দ্র ও প্রান্ত’ চয়নের একটা সচেতন নোংরা প্রবণতা চিরকালই ছিল, যাকে আসলে ইনিয়ে-বিনিয়ে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা চলছে! এলিট ভদ্রবিত্ত লেখকরা বাংলা ভাষার প্রশ্নে বাংলাদেশকে যেভাবে একটা আলাদা বন্ধনীতে রাখতে চাইছেন, সেটা অত্যন্ত নিন্দনীয়। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় কিন্তু কোনদিন বলেননি, বলতেনও না; কারণ, তাঁর মধ্যে ভণ্ডামি ছিল না! অথচ, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় আর হুমায়ূন আহমেদ আলাদা — এঁদের কথার মূল নির্যাস যদি এই হয়, তাহলে বুঝে নিতে হবে গোপন কথাটি!
বস্তুত, এলিট সমাজের মুক্ত মনে সত্য উচ্চারণে দ্বৈত আচরণের নেপথ্যে কেবল স্বার্থ, আত্মপরতাকে নির্বিঘ্ন রাখার চেষ্টা মুখ্য নয়, এর মর্মমূলে আছে আরও ‘গভীর বাণী’! হয়ত সেটাই মুখ্য। তা হ’ল, সমাজ থেকে, মানুষ থেকে দূরত্ব! সেই দূরত্বই মানুষের দুঃখ-ব্যথা অনুভবে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে! এবং, সেখান থেকেই প্রবাহিত হচ্ছে প্রত্যাশিত সত্যকথনে নীরবতা! খণ্ডিতভাবে যখন তাঁরা সরব হচ্ছেন, তখন সেটা সত্যের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে নয়, মূলত সেটা তাঁদের কলুষিত মনের স্ফূরণ মাত্র! কারণ, যে মানবিক সে সর্বক্ষেত্রেই মানবিক হবে, এটাই অতি স্বাভাবিক! মানবিকতার প্রদর্শন কখনও হিসেবী হয় না!








