নারীকেও কিছুটা সময় নিজের জন্য রাখা উচিত
নাজমুন নাহার
নারী, উদয়-অস্ত যার কোনো অবসর জোটে না, জীবনভর চলে শুধু সংসারের ঘানি টানা। নারীরা চাপে পড়ে বা অনেক সময় স্বেচ্ছায় সংসারের কাজে নিজেকে উজাড় করে দেয়। এতে পরিবারের লোকরাও টেকেন ফর গ্রান্টেড করে নেয়। দিনশেষে নারী তার নিজের যত্ন নেয় না। থাকে না কোন শখ, যত্নহীনতায় অল্পেই বুড়িয়ে যায় ও নিজের শরীরে রোগ-জরার বাসা বানায়। নারীরা প্রতিদিন নানা চাপ ও দায়িত্বের ভার বইছেন — পরিবার, কর্মক্ষেত্র, সমাজের প্রত্যাশা — সব মিলিয়ে নিজের জন্য সময় বের করাই যেন কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। ফলে মানসিক ক্লান্তি, উদ্বেগ, অবসাদ অনেকের জীবনকে ধীরে ধীরে গ্রাস করে নেয়। মমতাময়ী মা, স্নেহশীলা বোন, যত্নবান স্ত্রী কিংবা কর্তব্যপরায়ণ গৃহিণীর দায়িত্বের নিচে বরাবরই চাপা পড়ে যায় নারীসত্তা। মধ্যবিত্ত আটপৌরে নারীরা যেন ভুলতে বসেছে নিজেকে। কোনোমতে শরীরটা তো চলছে; কিন্তু মনের যত্ন নেওয়ার সময়-সুযোগ হয়ে ওঠে না। যেন নিজস্বতা বলতে কিছুই নেই নারীর।
সময়ের সঙ্গে নারীর শারীরিক ও মানসিক হাজার পরিবর্তন ঘটে। কন্যাশিশুর ১০-১২ বছর বয়সেই শুরু হয় বয়ঃসন্ধি। ১২ থেকে ১৩ বছর পর্যন্ত একজন কিশোরী বা টিনএজ মেয়ে শরীরে-মনে নানাভাবে বাড়তে থাকে। নানা রকমের হরমোনজনিত পরিবর্তন ঘটে তার শরীরে। এ সময় চাই সুষম বা সঠিক পুষ্টি। সঠিক ধারণার অভাবে এ সময় কারও বৃদ্ধি ব্যাহত হয়, কেউ হঠাৎ মোটা হয়ে যায়, কারও দেখা দেয় রক্তশূন্যতা, ভিটামিনের অভাব ইত্যাদি। তাই কিশোরীর পুষ্টি সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান থাকা চাই।
সদ্যবিবাহিত তরুণী নারীর নতুন সংসার নতুন পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে গিয়ে, সংসারের শতকর্মে নিজের যত্ন নিতে ভুলে যায়। সদ্য মা হওয়া তরুণী নারী তার সন্তানের যত্ন নিতে গিয়ে নিজের অপুষ্টির কথা ভুলে যায়। অপুষ্টিতে ভুগে খিটখিটে মেজাজের হয়ে যায়। নারী তার সন্তানকে স্কুলে পৌঁছানো, কোচিং এবং নিজের কর্মযজ্ঞে এতটাই ব্যস্ত হয়ে পড়ে যে, নিজের দিকে তাকানোর সময় পায় না। এই শত ব্যস্ততার ভিড়ে কোথায় যেন কোমলমতি নারীটি হারিয়ে যায়।
আবার মেনোপজ বা রজঃনিবৃত্তির সময় নারীর শরীরে হরমোনের নানা পরিবর্তন আসে। ইস্ট্রোজেনের মাত্রা ও প্রজেস্টেরনের মাত্রায় অসামঞ্জস্য দেখা দেয়। ফলে বিভিন্ন শারীরিক সমস্যা দেখা দেয়। যেমন বিপাকক্রিয়ার হার কমে যাওয়া, হজম না হওয়া, অ্যাসিডিটি বেড়ে যাওয়া, দুর্বল লাগা। এ সময় ক্যালসিয়ামের ঘাটতি দেখা দেয়, এতে হাড়ের ঘনত্ব কমে যায়। ওজন বাড়তে থাকে, রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রাও বেড়ে যায়। অনেকেরই এ সময় হট ফ্ল্যাশ (গরম হল্কা অনুভব) হয়, খুব মুড সুইং (মেজাজের দ্রুত পরিবর্তন) হয়, রাতে ভালো ঘুম হয় না।
জীবনের পাঁচটি দশক পেরিয়ে আসা একজন নারীর সামনে জীবনটা দেখা দেয় ভিন্নরূপে। শারীরিক পরিবর্তন তো ঘটেই, মনের জগতেও ঘটে অদলবদল। অনেকের ধারণা, এই বয়সে এসে খাবারের প্রতি তেমন গুরুত্ব না দিলেও চলে। বাস্তবতা হল, এই বয়সে দেহের চাই আরও বেশি যত্ন, আরও বেশি মনোযোগ। সুস্থ থাকতে বিশেষ কিছু পুষ্টি উপাদান যেমন প্রয়োজন, তেমনি নির্দিষ্ট ধরনের খাবার বাদ দেওয়াও জরুরি। পরিবারের ৫০ পেরোনো নারীর সুস্থতা নিশ্চিত করতে সেসব দেখভালের দায়িত্ব নিতে হবে বাকিদেরও।
তাই নারীর প্রতিদিনের ব্যস্ততার মাঝে পুষ্টিকর খাবার, নিয়মিত ব্যায়াম, পর্যাপ্ত ঘুম, ত্বক ও চুলের যত্ন এবং মানসিক প্রশান্তির জন্য শখের কাজে কিছুটা সময় দেওয়া প্রয়োজন। এ ছাড়া মানসিক প্রশান্তির জন্য প্রতিদিন অন্তত ৫-১০ মিনিট নীরবতা, ধ্যান, প্রার্থনা বা নিজের পছন্দের কাজ (বই পড়া, গান শোনা) এসবে সময় দিতে হবে। শারীরিক সুস্থতা ও পুষ্টির জন্য প্রচুর পানি পান করা, ডায়েটে শাক-সবজি ও ফল-মূল রাখুন এবং জাঙ্ক ফুড এড়িয়ে চলতে হবে। বয়স অনুযায়ী ক্যালসিয়াম ও আয়রনযুক্ত খাবার খেতে হবে।
শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকার জন্য যোগব্যায়াম ও নিয়মিত হাঁটা বা হালকা স্ট্রেচিং করতে হবে। যোগব্যায়াম শরীরের জড়তা কমায় এবং মন ভালো রাখে। নিয়মিত বিরতিতে (বিশেষ করে ৪০-এর পরে) শারীরিক চেকআপ করান এবং প্রজনন স্বাস্থ্যের প্রতি সচেতন থাকুন। প্রতিদিন রাতে ৭-৮ ঘণ্টা মানসম্মত ঘুম নিশ্চিত করুন, যা ক্লান্তি দূর করে নতুন উদ্যম দেয়। নিজে ভালো থাকলে পরিবারকে ভালো রাখা সহজ হয়, তাই ‘না’ বলতে শেখাটা জরুরি এবং নিজের প্রয়োজনীয়তাকে অগ্রাধিকার দিন।
নারীর মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন নিন, উপেক্ষা নয়, মানসিক স্বাস্থ্য অবহেলার বিষয় নয়, বরং সচেতনতার প্রয়োজন। যদি কখনও মনে হয় ভেতরে চাপ জমে আছে, মন খারাপ লাগছে, সবকিছু অসহ্য লাগছে — তাহলে চুপ করে থাকার দরকার নেই। কাছের মানুষদের সঙ্গে শেয়ার করুন, প্রয়োজন হলে বিশেষজ্ঞের সাহায্য নিন, কাউন্সেলিং করান।
নিজের যত্ন নেওয়া কোনো বিলাসিতা নয়; বরং সুস্থ থাকার জন্য জরুরি। মনে রাখবেন, সুস্থ মনই সুন্দর জীবন গড়ে তোলে। তাই নিজের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যকে গুরুত্ব দিন, ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন!








