স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ, নাকি চিরস্থায়ী নির্ভরশীলতা? মাসুদ রহমান
একজন আদর্শ পিতা-মাতার প্রধান লক্ষ্য থাকে সন্তানকে সুশিক্ষিত ও স্বাবলম্বী করে তোলা। সুস্থ-সবল সন্তানকে কাজ না শিখিয়ে যদি কেউ অন্যের কাছে হাত পাততে বা ভিক্ষা করতে শেখায়, তবে সেই পিতা-মাতাকে সমাজ ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করে। তাদের ‘অযোগ্য’ও ‘আদর্শহীন’হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই চিরন্তন সত্যটি রাষ্ট্র ও নেতৃত্বের ক্ষেত্রে এক বড় প্রশ্নবোধক চিহ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বর্তমানে আমাদের দেশে রাজনীতি ও জনসেবার সংজ্ঞা যেন কেবল ‘ভাতা’ আর ‘অনুদানের’ মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সরকার মানুষকে স্থায়ী কর্মসংস্থান বা আত্মমর্যাদাশীল জীবনের পথ দেখানোর বদলে নগদ অর্থ বা সাময়িক সাহায্যের মোড়কে বন্দি করে রাখছে। এটি কোনো কল্যাণকর রাষ্ট্রের স্থায়ী সমাধান হতে পারে না।
একটি জাতির মূল শক্তি হল তার জনশক্তি। আদর্শ নেতার দায়িত্ব হল সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা এবং শিল্পায়ন বা কৃষি উন্নয়নের মাধ্যমে অর্থনীতিকে মজবুত করা। কিন্তু বর্তমানে দেখা যাচ্ছে, স্থায়ী কোনো উন্নয়ন পরিকল্পনা বা কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির পরিবর্তে জনগণকে সরকারি অনুদানের ওপর নির্ভরশীল করে রাখা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা একে ‘ক্ষমতা কুক্ষিগত করার হাতিয়ার’হিসেবে দেখছেন। মানুষকে আজীবন অভাবী রেখে হাত পাতার অভ্যাস করিয়ে দেওয়া মূলত তাদের স্বাধীনভাবে চিন্তা করার ক্ষমতা কেড়ে নেওয়ারই নামান্তর।
একজন সুস্থ মানুষকে অনুদানে অভ্যস্ত করার অর্থ হল, তাকে মানসিকভাবে পঙ্গু করে দেওয়া। রাষ্ট্রের অভিভাবক হিসেবে যারা নিজেদের দাবি করেন, তাদের এই ‘খয়রাতির রাজনীতি’আসলে তাদের অযোগ্যতা এবং দূরদর্শী পরিকল্পনার অভাবকেই প্রকাশ করে। এটি কেবল সাময়িকভাবে ভোট নিশ্চিত করে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে জাতিকে অলস এবং মেরুদণ্ডহীন জনগোষ্ঠীতে পরিণত করে।
ভিক্ষা বা অনুদান দিয়ে কোনো জাতি কোনোদিন বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারেনি। সমাজ যেমন অযোগ্য পিতা-মাতাকে ধিক্কার জানায়, ইতিহাসও তেমনি সেইসব নেতাদের ক্ষমা করবে না, যারা জনগণকে স্বাবলম্বী না করে ভিক্ষুক হিসেবে দেখতে চায়। এখন সময় এসেছে দাবি তোলার —‘অনুদান নয়, কর্মসংস্থান চাই; দয়া নয়, মর্যাদা চাই।’








