কেন প্রাক্তন রাষ্ট্রপতিদেরকে ব্যবহার করছে সংঘ পরিবার
গৌতম রায়
চলতি কথায় বলে, ‘মহাপুরুষ যে পথে যায়, সেটাই পথ’। রাষ্ট্রপতি পদ থেকে অবসর নেওয়ার পর এখন পর্যন্ত একমাত্র বাঙালি রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়, আরএসএস-এর সদর দপ্তর, নাগপুরের রেশমবাগের কেশবভবনে উপস্থিত হয়েছিলেন। আরএসএস প্রতিষ্ঠাতা কেশব বলিরাম হেডগেওয়ারের মূর্তিতে নতজানু হয়ে ফুল দিয়েছিলেন। সংঘের জমায়েতে বক্তৃতাও করেছিলেন। পুরস্কার হিসেবে তিনি ‘ভারতরত্ন’ দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক খেতাব পেয়েছিলেন – এমন অভিযোগ অবশ্য কেউ করেন না। তবে প্রণববাবুর উত্তরসূরী রামনাথ কোবিন্দ, আরএসএস-এর শতবর্ষ পূর্তির সময় ঠিক একইভাবে তাঁর পূর্বসূরী প্রণববাবুর পথ অনুসরণ করলেন। সংঘের সদর দপ্তরে গেলেন। সরসংঘচালক মোহন ভাগবতকে পাশে নিয়ে পুষ্পাঞ্জলি দিলেন হেডগেওয়ারের মূর্তিতে। সংঘ কর্মীদের উদ্দেশ্যে বক্তৃতা করলেন।
এরপর যদি ভারতের সর্বোচ্চ বেসামরিক খেতাব ‘ভারতরত্ন’ আগামী বছর রামনাথ কোবিন্দ পেয়ে যান। তাহলেও হয়ত কেউ ঘটনার পারস্পরিক সংযোগ ঘিরে এরকম মন্তব্য করবেন না। বরং বলতে পারেন মহাপুরুষ প্রণববাবু যে পথে গমন করেছিলেন, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে প্রণববাবুর থেকে বহুগুণ পিছিয়ে থাকা, জাঁকজমকহীন রামনাথ কোবিন্দ সে পথেরই শরিক হলেন।
তবে গোটা ঘটনার মধ্যে একটা মৌলিক ফারাক কিন্তু শেষ পর্যন্ত থেকে গেল। সংঘের শতবর্ষপূর্তির যে আড়ম্বর এবং তাকে ঘিরে যে হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক কৌশলের প্রেক্ষাপট, যার সঙ্গে রামনাথ কোবিন্দের নাম জড়িয়ে গেছে, প্রণববাবুর সঙ্গে কিন্তু তাঁর ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও এটা জড়ানো সম্ভব হল না। পাঠক কিন্তু একবারে ধরে নেবেন না, প্রণব মুখোপাধ্যায়ের আরএসএস সদরে দপ্তরে যাওয়ার ঘটনা, আর সংঘ ঘনিষ্ঠ রামনাথ কোবিন্দের আরএসএসের সদর দপ্তরে যাওয়ার ঘটনা – এই দুটিকে পাশাপাশি রেখে আলোচনা করতে গিয়ে আমি একটি বারের জন্য রামনাথের মতো প্রণববাবুর সঙ্গেও সংঘের সাথে সংযোগ ঘিরে কোনও কানাঘুষো করছি।
প্রণববাবু বা রামনাথ কোবিন্দ, তাঁরা তাঁদের কী নিজস্ব সমীকরণের ভিত্তিতে আরএসএসের সদর দপ্তরে গিয়ে তাদের প্রতিষ্ঠাতা হেডগেওয়ারকে শ্রদ্ধা জানালেন – সেটা তাঁদের বিষয়। আমাদের সাধারণ মানুষের কাছে যেটা ভাববার, সেটা হল, কেন আরএসএস, অবসরপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতিদের এভাবে তাদের সংগঠনের প্রচারের কাজে ব্যবহার করছে? আরএসএস তো নিজেদের সম্পর্কে প্রকাশ্যে অত্যন্ত উচ্চ ধারণা পোষণ করে। অত্যন্ত আত্মম্ভরিতার সঙ্গে তারা নিজেদের সম্পর্কে নানা ধরনের প্রশংসাসূচক কথাবার্তা বলে থাকে। সেসব প্রশংসাসূচক কথাবার্তার প্রথম এবং প্রধান বিষয় হল, আরএসএস কারো পরোয়া করে না বলে দাবি করে। কারো নিন্দা ঘিরে আরএসএসের কিছু বক্তব্য নেই এবং আরএসএস কারও প্রশংসার প্রত্যাশী নয় – এমন বেপরোয়াই তাদের দাবি।
এইরকম কথা যারা প্রকাশ্যে বলে থাকে, তাদের হঠাৎ কি প্রয়োজন পড়ল, রাষ্ট্রপতির পদ থেকে অবসর নেওয়া দু-দু’জন ব্যক্তিকে সংগঠনের ক্যারিশ্মা প্রচারের ক্ষেত্রে ব্যবহার করবার? প্রণব বাবুর সঙ্গে কতখানি আরএসএসের গভীর গোপন সম্পর্ক ছিল, তাঁর প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক জীবনে – এই আলোচনা থেকেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে এইখানে যে, রাষ্ট্রপতি পদে অবসর নেওয়া প্রথম এক ব্যক্তিকে আরএসএস যখন তার সাংগঠনিক প্রচারের উদ্দেশ্যে তাদের সদর দপ্তরে নিয়ে আসে, ব্যবহার করে, তখন তার সামাজিক প্রতিক্রিয়া কেমন হয়?
একজন ব্যক্তি, তিনি প্রত্যক্ষ রাজনীতির সঙ্গে সংযুক্ত থাকলেও দেশের চলতি রাজনৈতিক দস্তুরে তিনি যখন দেশের রাষ্ট্রপতি হয়ে যান, তখন তিনি সবরকম দলীয় রাজনীতির সংকীর্ণ ঘেরাটোপের বাইরে একজন পরিপূর্ণ দেশব্রতী হিসেবে সাধারণ মানুষের কাছে পরিগণিত হন। চরম হিন্দু সাম্প্রদায়িক ব্যক্তিত্ব, দেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি রাজেন্দ্র প্রসাদের ক্ষেত্রেও তাই-ই ঘটেছিল। যে রাজেন্দ্র প্রসাদের আত্মঘাতী রাজনৈতিক হিন্দু সাম্প্রদায়িক, মৌলবাদী অবস্থানের ঘোরতর সমালোচক ছিলেন দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু, সেই রাজেন্দ্র প্রসাদ সম্পর্কে কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে একটা ধোয়া তুলসী পাতা গোছের মন মানসিকতা হয়ে আছে।
কিন্তু ভারতের অন্যতম সর্বাত্মক ধর্মনিরপেক্ষ, সংখ্যালঘু মুসলমানদের স্বাধিকারের পক্ষে সরব ব্যক্তিত্ব পন্ডিত জওহরলাল নেহরুর রাজনৈতিক তথা সামাজিক অবস্থান ঘিরে নানা ধরনের পরস্পর বিরোধী অভিমান নিয়ে চিরকাল সাধারণ মানুষের মধ্যে অনেক ধরনের ইতিবাচক নেতিবাচক উভয় রকমেরই মন মানসিকতা কাজ করছে। বাঙালির বেশিরভাগের কাছেই নেতাজী অস্মিতা গান্ধীজী, নেহরুজীকে খলনায়ক বানিয়ে রেখে অনৈতিহাসিক ভাবে।
স্বাধীন ভারতের সংসদীয় রাজনীতির প্রচলিত ধারায় রাষ্ট্রপতির পদকে সাধারণত সংকীর্ণ দলীয় রাজনীতির ঘেরাটোপে দেখবার প্রচলন এখনো হয়নি। প্রত্যক্ষভাবে দলীয় রাজনীতির মধ্যে থেকেই এখনও পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি পদে আসীন হয়েছেন সকলে। একমাত্র ব্যতিক্রম ড. এপিজে আবদুল কালাম। তা সত্ত্বেও একজন ব্যক্তি যখন রাষ্ট্রপতি হয়ে যান, তখন তাঁর দলীয় রাজনীতিতে অবস্থান ঘিরে সাধারণ মানুষের মধ্যে খুব একটা সংশয় থাকে না। কিন্তু মন মানসিকতা থাকে না – এটাই বলতে হয়। যদিও অতীতে ইন্দিরা গান্ধীর শাসনকালে রাষ্ট্রপতি পদকে শাসক দলের রাবার স্ট্যাম্প হিসেবে ব্যবহার করার বহু নিদর্শন আছে।
বিশেষ করে জরুরি অবস্থা জারির সময়কাল ঘিরে তদানীন্তন রাষ্ট্রপতি ভি.ভি গিরির অবস্থান সব সমালোচনার ঊর্ধ্বে – একথা কখনোই বলতে পারা যায় না। যেভাবে ইন্দিরা গান্ধী তাঁর মন্ত্রিসভাকে পর্যন্ত পাশ কাটিয়ে জরুরি অবস্থা জারির অধ্যাদেশ, মধ্যরাতে ঘুম ভাঙিয়ে তদানীন্তন রাষ্ট্রপতি ভি.ভি গিরিকে দিয়ে স্বাক্ষর করিয়েছিলেন, তা চিরদিন একটা বড় রকমের সমালোচনার বিষয় হয়ে থাকবে।
তবুও রাষ্ট্রপতি হয়ে গেলে একজন ব্যক্তির অতীতের রাজনৈতিক অবস্থান ঘিরে, দলীয় রাজনীতিতে নানা ধরনের অবস্থান নেওয়া ঘিরে বিষয়গুলি আর সাধারণ জনমানসে খুব একটা আলোচনা সাপেক্ষ হয় না। তাই অবসরপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়কে আরএসএস তাদের সংগঠনের সামাজিক ভিত্তি তৈরির কাজে ব্যবহার করতে দ্বিধা করেনি।
তবে প্রণববাবু যে রাজনৈতিক দলের হয়ে ভারতের সংসদীয় গণতন্ত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা দীর্ঘদিন ধরে পালন করেছিলেন, সেই কংগ্রেস দল নীতিগতভাবে আরএসএস বিরোধী। যে ইন্দিরা গান্ধীর ঘনিষ্ঠ হিসেবে জাতীয় রাজনীতিতে প্রণববাবুর প্রতিষ্ঠা এবং নানা ধরনের কার্যকলাপ, সেই ইন্দিরা গান্ধী কিন্তু তাঁর নিজের অবস্থানকে মসৃণ করার লক্ষ্যে পর্দার আড়াল থেকে আরএসএসকে ব্যবহার করলেও প্রকাশ্যে কখনো আরএসএস সম্পর্কে নরম মানসিকতার পরিচয় রাখেননি।
তাই আশ্চর্য হয়ে যেতে হয় রাষ্ট্রপতি পদ থেকে অবসর গ্রহণের পর প্রণববাবুর আরএসএস ঘনিষ্ঠতা ঘিরে। সন্দেহ তীব্র হয়ে ওঠে দুটি কারণে। প্রথমত: এই যে চিরদিন কংগ্রেসের রাজনীতির মধ্যে একটা দক্ষিণপন্থী উগ্র হিন্দু সম্প্রদায়িক ঝোঁক ছিল, এর সঙ্গে কি প্রণব মুখোপাধ্যায়ের একটা সংযোগ ছিল খুব নিবিড়ভাবে? সেই সংযোগের জেরেই কি তিনি রাষ্ট্রপতি পদে অবসর গ্রহণের পর আরএসএসের প্রত্যক্ষ কার্যকলাপে অংশ নিয়েছিলেন?
এটি যদি সত্যি হয়, তাহলে ইন্দিরা গান্ধীর মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের পর কলকাতার যাদবপুর লোকসভা কেন্দ্র থেকে কংগ্রেস প্রার্থী হিসেবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে সুযোগ করে দিয়েছিলেন প্রণববাবু, আর পরবর্তীকালে মমতা যেভাবে বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ নামক নীতিবিহীন সুবিধাবাদী জোটের শরিক হয়েছিলেন, সঙ্গী হিসেবে তিনি দীর্ঘ সাড়ে ছয় বছর পালাক্রমে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় অধিষ্ঠান করেছিলেন, সেগুলি কি পারস্পরিক সম্পর্কযুক্ত?
দ্বিতীয় প্রশ্ন হল, রাষ্ট্রপতি পদে অবসরের পরেও কি প্রণববাবুর মধ্যে বিশেষ কোনও রাজনৈতিক অভিসন্ধি কাজ করেছিল, যার জেরে তিনি আরএসএসের সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা তৈরির কাজে রাষ্ট্রপতির পদকে প্রকারান্তরে ব্যবহার করার প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন?
আমাদের পারস্পরিক সমাজবদ্ধতার মধ্যে আরএসএস কীভাবে ঢুকে গিয়ে তাদের আত্মঘাতী দর্শনকে সমাজের বিভিন্ন স্তরে গেঁথে দেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, সে সম্পর্কে আমাদের ধারণা যে খুবই অল্প, প্রণব মুখোপাধ্যায় থেকে রামনাথ কোবিন্দ – এই পরিক্রমার মধ্য দিয়ে সেটা খুব ভাল করে বুঝতে পারে। যে কংগ্রেস দলের বিশিষ্ট নেতা হিসেবে প্রণব মুখার্জীর প্রায় সমগ্র রাজনৈতিক জীবনটা পরিব্যাপ্ত ছিল, সেই কংগ্রেস কিন্তু প্রণববাবুর রাজনৈতিক ব্যাপ্তির সময়কালে প্রথাগতভাবে আরএসএসের হিন্দুত্ববাদী সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিরোধী ছিল।
প্রথম জীবনে যে ‘বাংলা কংগ্রেস’-এর হাত ধরে রাজনীতিতে প্রবেশ করেছিলেন প্রণববাবু, যাঁর হাত ধরে তাঁর এই প্রবেশ, পশ্চিমবঙ্গের প্রথম অ-কংগ্রেসী মুখ্যমন্ত্রী অজয় মুখোপাধ্যায়ও কিন্তু কখনই আরএসএসের রাজনীতি ও মতাদর্শকে সমর্থন করেননি। প্রণব মুখার্জী দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে কিন্তু কখনো প্রকাশ্যে আরএসএসের রাজনৈতিক অভিসন্ধির প্রতি সমর্থন সূচক একটি শব্দও উচ্চারণ করেননি। তাহলে এই মানুষটি কংগ্রেসের প্রার্থী হিসেবে শুধু নয়, সব অ-বিজেপি দলগুলির প্রার্থী হিসেবে রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর তাঁর কার্যকালে আরএসএসের সঙ্গে কোনরকম সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল? নাকি আগে থেকেই প্রণববাবুর সঙ্গে আরএসএসের একটা টেবিলের তলার সম্পর্ক ছিল, যার জেরে তিনি রাষ্ট্রপতি পদে অবসর নেওয়ার পর তাঁকে সংঘের সদর দপ্তরে আমন্ত্রণ জানায় এবং প্রণববাবুও দ্বিধা-সংকোচ না করে আরএসএসের সদর দপ্তরে হাজির হন, সংঘের প্রতিষ্ঠাতার ছবি ও মূর্তিতে মালা দেন।








