এসআইআর হলে কি আচ্ছে দিন আসবে?
খান বাহাদুর সেখ
এসআইআর নিয়ে দেশজুড়ে খুব হইচই চলছে। যেসব প্রোপাগান্ডা চলছে, তা মূলত রাজনীতি বা ভোটের স্বার্থে। সাধারণ মানুষের ঘুম উবে যাচ্ছে দুশ্চিন্তা, উদ্বেগ এবং অজানা আতঙ্কে। প্রশ্ন হল, বিজেপি বাদে বাকি সব দল কেন এনিয়ে চেঁচামেচি করছে? বিজেপির কেন মাথাব্যথা বা হেলদোল নেই? এসআইআর হলে কি দেশে আচ্ছে দিন আসবে? সবকা সাথ সবকা বিকাশ হবে? নাকি দেশ সোনায় সোহাগা হয়ে যাবে?
প্রতি বছরই ভোটার তালিকার সংশোধন হয়, নতুন কিছু নাম ঢোকে, কিছু নাম বাদ যায়। সেটা হল রুটিন ভোটার তালিকা সংশোধন। আর এসআইআর মানে হল বিশদভাবে বা নিবিড় সংশোধন, খুঁটিয়ে দেখা, ত্রুটিমুক্ত করা। এটা ২০০২ সালেও হয়েছে। তখন এ নিয়ে এত হইচই হয়নি। কিন্তু এবার হচ্ছে। হইচই শুধু পশ্চিমবঙ্গে নয়, সারা দেশেই হচ্ছে। কারণ, বিষয়টাকে নিয়ে ভোটের মুখে রাজ্যগুলো রাজনৈতিক ইস্যু বানিয়ে বাজার গরম করতে চাইছে। ক্ষমতাসীন এবং বিরোধী উভয় পক্ষেরই এতে ফায়দা।
এসআইআর নিয়ে এত বেশি হইচই হওয়ার কারণ, এবার নির্বাচন কমিশন অন্যভাবে কাজটা করার কথা বলছে। আগে এসআইআর হত চালু ভোটার তালিকা নিয়ে। সেখানে যাদের নাম আছে, দেখা হত তাঁরা জীবিত আছে কিনা ও সত্যি সত্যিই উল্লেখিত ঠিকানায় আছে কি না। যদি ভোটার তালিকায় উল্লেখিত ঠিকানায় সে বসবাস করে থাকে বা জীবিত থাকে, তার নাম নতুন ভোটার তালিকাতেও থাকত। এই পদ্ধতি যথেষ্ট যুক্তিযুক্ত ছিল। কারণ, যার নাম একবার ভোটার তালিকায় আছে, সে তো কোনও না কোনো নথিপত্র, প্রমাণপত্র দিয়েই তালিকায় নাম তুলেছে। ভোটার তালিকায় নাম আছে, অথচ সেই ব্যক্তি সেখানে থাকে না, কর্মসূত্রে অন্য কোথাও থাকে, অথবা কারও দুই জায়গায় নাম আছে, সে বাদ যেত নতুন তালিকা থেকে। এইভাবে পশ্চিমবঙ্গে ২০০২ সালে ২৮ লক্ষ নাম বাদ গিয়েছিল। কোনও হইচই হয়নি। এখন এত বেশি হট্টগোল করা হচ্ছে, কারণ সামনে বিধানসভা নির্বাচন।
২০০৩ সালে অটল বিহারী বাজপেয়ীর নেতৃত্বে এনডিএ সরকারের মন্ত্রী ছিলেন মমতা ব্যানার্জি। সেই সরকার নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন এনে বলেছিল, ১৯৮৭ সালের পর যারা এদেশে জন্মেছে তারা সরাসরি দেশের নাগরিক নয়। তাঁদের প্রমাণ করতে হবে যে তাঁদের মা বাবা, কেউ একজন এদেশের নাগরিক ছিল। এখন নির্বাচন কমিশন বলছে, ১৯৮৪ সাল বা তার পরে যারা জন্মেছেন, তাঁরা ভোটার কিনা তা সন্দেহজনক, তাদেরকে প্রমাণ করতে হবে তাঁদের বাবা মা ২০০২ সালে পশ্চিমবঙ্গের কোথাও ভোটার ছিল। এটা কার্যত ২০০৩ সালের আইন অনুযায়ী নাগরিকত্ব প্রমাণের চেষ্টা।
এনআরসি বা ন্যাশনাল রেজিস্ট্রার অব সিটিজেন্স হচ্ছে ঘুরিয়ে। বিজেপি সরকার আসামে এনআরসি করে সেখানে নাগরিকত্ব খোঁজার চেষ্টা করেছিল, সেখানেও আনুষ্ঠানিকভাবে এনআরসি শুরু করার আগে কাজ শুরু হয়েছিল আগে ভোটার তালিকা নিয়ে। বিজেপি’র ইচ্ছা ছিল সারা দেশে এনআরসি করা, করতে পারেনি। এখন নির্বাচন কমিশনকে নিয়ে সেই কাজে নেমেছে। এক নাম একাধিক জায়গায়, বাদ যাবে?
পশ্চিমবঙ্গে যখন প্রথম এসআইআর হয়েছিল ২০০২ সালে, তখন ভোটার ছিল ৪ কোটি ৯৬ লক্ষ, ২০১১ সালে তা হয় ৫ কোটি ৬২ লক্ষে। গত ১৪ বছরে তা বেড়ে ২০২৫ সালে হয়েছে ৭ কোটি ৬৩ লক্ষ। যদি ধরে নিই যে জনসংখ্যা বৃদ্ধির মতোই ভোটার সংখ্যাও চক্রবৃদ্ধির হারেই বাড়বে, তাতে অঙ্ক কষে দেখানো যায়, ২০০২ সালকে ভিত্তি করে ২০২৫ সালে পশ্চিমবঙ্গে ভোটার সংখ্যা হওয়া উচিত ৬ কোটি ৮২ লক্ষ। তালিকায় সংখ্যা তার চেয়ে ৮১ লক্ষ বেশি। এরা কারা? আসলে এই এত ভোট বাড়ার কারণ, অনেক মৃতদের নাম এখনও আছে, কেউ অন্য জায়গায় চলে গেলে দু’জায়গাতেই নাম আছে, এসব বাদ দেওয়া হয়নি। ভোটের সময় এসব ভোটগুলি গায়ের জোরে দিয়ে আসছে বিভিন্ন দল, যার যেখানে ক্ষমতা বা দাপট আছে।
ভোটার বৃদ্ধি নিয়ে বিজেপি’র ঘৃণ্য প্রচার:
বিজেপি বলছে, বাড়তি ভোটাররা সব বাংলাদেশের মুসলমান অনুপ্রবেশকারী। এটা বলে বিজেপি কিছু মুসলমানের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দিতে চায়। এতে মুসলমানদের প্রতি বিদ্বেষ ছড়ানো গেল, আর তৃণমূলের অপকর্মকেও আড়াল করা গেল। ঘৃণা বিদ্বেষের পরিবেশ তৈরি করতে চায় মুসলমানদের বিরুদ্ধে। সেই অনুযায়ী গত ১০ অক্টোবর দিল্লিতে দেশের সর্বাধিক প্রচারিত সংবাদপত্র দৈনিক জাগরণ পত্রিকা আয়োজিত এক আলোচনাসভায় কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী অমিত শাহ বলেন, দেশে মুসলিম জনসংখ্যা বাড়ছে এবং তা বাড়ার কারণ – অনুপ্রবেশ। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী সহ তাবড় তাবড় বিজেপি নেতা এতদিন মুসলিম পুরুষের চারটি বিয়ে ও গাদা গাদা বাচ্চা মুসলিম জনসংখ্যা বাড়ানোর কথা বলে এসেছেন। কিন্তু অমিত শাহ সেদিন বলেছেন, বেশি বাচ্চা হওয়ার জন্য মুসলিমদের জনসংখ্যা বাড়ছে তা নয়, তা আসলে বাড়ছে অনুপ্রবেশের জন্য। তার বক্তব্য, মুসলিমদের সংখ্যা “পশ্চিমবঙ্গে অনেকগুলি জেলায় এখন ৪০ শতাংশ অতিক্রম করেছে, বর্ডার সংলগ্ন জেলাগুলিতে ৭০ শতাংশ হয়ে গেছে”।
অমিত শাহর এই তথ্য ডাহা মিথ্যে। মোদির আমলে দীর্ঘদিন জনগণনা হয়নি বলে অমিত শাহ যা খুশি বলছেন। বাংলাদেশের সাথে বর্ডারে পশ্চিমবঙ্গে মোট ৯টি জেলা, তার মধ্যে ২০১১ সালের জনগণনা অনুযায়ী মুর্শিদাবাদে ৬৭ শতাংশ মুসলিম ছিল, তারপরে মালদায় ৫১ শতাংশ, উত্তর দিনাজপুরে ৫০ শতাংশ, আর ৬টি জেলাতে ৩০ শতাংশের কম। মুর্শিদাবাদ ছাড়া আর কোনও জেলার ক্ষেত্রেই বর্তমানে মুসলিম শতাংশ ৭০ শতাংশ হওয়া অসম্ভব। সীমান্তবর্তী ছাড়া অন্য জেলাগুলির মধ্যে একমাত্র বীরভূমে মুসলিমদের হার ৪০ শতাংশে পৌঁছাতে পারে, আর কোন জেলার ক্ষেত্রে তা হতে পারে না। বীরভূমে ২০১১ সালে ৩৭ শতাংশ ছিল, অন্য জেলাগুলিতে ৩০ শতাংশের নিচে।
মুসলিম অনুপ্রবেশের তত্ত্ব কতটা সঠিক:
২০০১ থেকে ২০১১, সারা দেশে মুসলিমদের শতাংশ বেড়েছে ২৪.৬, অমিত শাহ সেটা উল্লেখ করেছেন। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে তা ২১.৮। অনুপ্রবেশে তো পশ্চিমবঙ্গে এই শতাংশ বাড়ার কথা, তা হয়নি তো। অমিত শাহর বক্তব্য অনুযায়ী, অনুপ্রবেশে সীমান্তবর্তী জেলাগুলিতে বেশি ভোটার বাড়ার কথা। কিন্তু শুধু সেখানে তা বাড়েনি। ওই দেশে সংখ্যালঘু নিরাপত্তার অভাবে, হিন্দুরা এদেশে আসতে পারেন, বাস্তবে এসেছেন। কিন্তু ব্যাপকভাবে মুসলমানের বাংলাদেশ থেকে এদেশে আসার সম্ভাবনা কম। কারণ, ভারতের অর্থনীতির এমন কোনও উজ্জ্বল অবস্থা নয় যে, দলে দলে জীবিকার প্রয়োজনে মানুষ বাংলাদেশ থেকে আসবেন।
এসআইআর-এ বাদ পড়ার আশঙ্কা:
মুসলমানদের নাম বাদ দেওয়া হবে বলে বিজেপি প্রচার করছে, এটা আসলে বুমেরাং হতে পারে। উদাহরণ আসাম। আসামে এনআরসি করে ১৯ লক্ষ ধরা পড়ল। যারা কাগজ দেখাতে পারল না, তার মধ্যে মুসলমান ৫ লক্ষ বা ২৬ শতাংশ। তাহলে বাকি ৭৪ শতাংশ কারা? তাদের অধিকাংশই হিন্দু। অল্প কিছু বৌদ্ধ ছিল। আসামে জনসংখ্যার ৩৪ শতাংশ মুসলমান।
আসলে গরিব মানুষ, অশিক্ষিতি বা অল্পশিক্ষিত (হিন্দু, মুসলমান উভয়েই), তফসিলি জাতি, আদিবাসী, যারা ঠিকমতো কাগজপত্র গুছিয়ে রাখতে পারে না, তারাই পারবে না পুরানো কাগজ দেখাতে। তাঁদের নামই বাদ যাবে। বিহারে এসআইআর-এ ঠিকমতো কাগজ দেখাতে পারেনি বলে ৬৫ লক্ষ লোকের নাম বাদ গেছে। এদের মধ্যে কতজন অনুপ্রবেশকারী? নির্বাচন কমিশন বা সরকার বলতে পারেনি।
বিজেপি’র আসল উদ্দেশ্য কী:
বিজেপি জানে, দলে দলে মুসলমানরা বাংলাদেশ থেকে এদেশে ঢুকে পড়েনি। কিন্তু অনেক হিন্দু ঢুকেছে, এটা সত্যি। কিন্তু তবুও বিজেপি মুখে কেবলই মুসলমানদের বিরুদ্ধে বলছে, বলবে। আসামের এনআরসি’র মতো পশ্চিমবঙ্গের এসআইআর-এ যদি আসলে হিন্দুদের নাম বেশি বাদ পড়ে, তাতেও বিজেপি’র কিছু যায় আসে না। বিজেপি’র আসল উদ্দেশ্য হল, এক তীব্র ঘৃণা বিদ্বেষের পরিবেশ তৈরি করা। হিন্দু-মুসলিম যত বিভাজন হবে, তত বিজেপি’র লাভ। তৃণমূলেরও তাতে লাভ। ওরা দু’জনেই হিন্দু ও মুসলমানের পারস্পরিক ঘৃণার পরিবেশ তৈরি করতে চায়। এত দুর্নীতি, এত বেকারত্ব, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম এত বেশি… এসব ভুলে গিয়ে মানুষ হিন্দু-মুসলমান বিভাজনে মেতে থাকুক, এতেই এই দুই দলের সুবিধা। দেশের উন্নয়নে কাজ করার প্রয়োজন নেই, এনআরসি, এসআইআর, ইউসিসি, সিএএ এরকম ইস্যু দিয়েই ভোট বাক্স ভরে যাচ্ছে, যাবে।








