ট্রাম্প বুনো ওল, মামদানি বাঘা তেঁতুল
মুদাসসির নিয়াজ
জোহরান মামদানি। নাম শুনেই বোঝা যাচ্ছে মুসলমান। শিকড় প্রোথিত রয়েছে ভারতের মাটিতে। তাঁর মা প্রখ্যাত চলচিত্র পরিচালক মীরা নায়ার, ভারতীয়। বাবা মাহমুদ মামদানি উগান্ডার লোক। পেশায় অধ্যাপক, সুলেখক, শিক্ষাবিদ। একদা তারা মুম্বইয়ে থাকতেন। তারপর সপরিবারে নিউ ইয়র্কে চলে যান। জোহরান মামদানি এখন ৩৪ এর কোটায়। বয়সে ট্রাম্পের অর্ধেকেরও কম। সেই নিরিখে হাঁটুর বয়সি বললে অতিরঞ্জন হবে না। এবার নিউ ইয়র্ক শহরের মেয়র নির্বাচনে বিরোধী দল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রার্থী হয়েছিলেন মামদানি। বুধবার সব জল্পনা কল্পনার অবসান ঘটিয়ে তিনি জিতে গেলেন। ট্রাম্পের নাকে ঝামা ঘষে দিলেন। ট্রাম্পের হম্বিতম্বির নটেগাছটি আপাতত মুড়োল। কিন্তু তিনি যে ট্রাম্প। কেউ তার ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেললে বরদাশত করতে পারেন না। তিনি ভাঙবেন, তবু মচকাবেন না। এখন ঘন ঘন সিগারেট ধরাচ্ছেন আর ভুরু কুঁচকে ভাবছেন, পরবর্তী রণকৌশল নিয়ে। দেশের প্রেসিডেন্ট হিসেবে ভাবতাসেন, নিউ ইয়র্কের কান কীভাবে টানলে মেয়র মামদানির মাথা কিংবা জানু নত হবে। তবে ট্রাম্প বুনো ওল হলে, মামদানিও বাঘা তেঁতুল। সুতরাং সম্পর্ক কখনোই কুসুমাসতীর্ণ হবে না, থাকবে সাপে নেউলেই। ট্রাম্প চেষ্টা করবেন, দেশের প্রেসিডেন্ট হিসেবে কীভাবে মামদানির পথে কাঁটা বিছানো যায়। কিন্তু অত সহজে পারবেন কি? কয়েক শত বছরের ইতিহাস ট্রাম্পের নাকে খত দিয়েছে। মার্কিন কংগ্রেসের সংবিধানকে বদলাতে হয়েছে সাংসদ ইলহান ওমর এবং রাশিদা তিলাইবের জন্য।
মামদানি এই বয়সে রাজনীতিকে হাতের তালুতে বন্দি করেছেন। আর রাজনীতিতে নবাগত ট্রাম্পের হাতেখড়ি হয়েছে ২০১৬ সালে। যে বয়সে ভীমরতি ধরে, সেই বুড়ো বয়সে রাজনীতির খাতায় নাম লিখিয়েছেন। আর মামদানির বয়সের পাটিগণিত এখনও সাড়ে তিন দশক ছোঁয়নি। এই তরুণতুর্কিকে কীভাবে জব্দ করা যায়, ট্রাম্প এখন সেই চিন্তায় বিভোর। ভাবছেন, কীভাবে সিঁধ কেটে একেবারে নিউ ইয়র্কের মেয়র হয়ে গেলেন মামদানি। মিডিয়া, ইহুদি লবি, রিপাবলিকানরা কি সব নাকে তেল দিয়ে ঘুমোচ্ছিল। সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে ঠাকুর ঘরে ঢুকে পড়ল একজন মুসলমান অভিবাসী! মামদানি কিন্তু অনেক আগেই অভিবাসী তকমা ঘুচিয়ে দিয়েছেন। ট্রাম্পের চোদ্দ পুরুষের ঠিকুজি কুষ্টি ঘেঁটে পর্দা ফাঁস করে দিয়েছেন, ট্রাম্পও এদেশের মূলনিবাসী নন। দুই পুরুষ আগে ট্রাম্পের পরিবারও মার্কিন মুলুকে এসেছিল অভিবাসী হিসেবে এসেছিল। ব্যাস, ট্রাম্পের মুখে একেবারে চুনকালি পড়ে গেল। চুপসে গেল বেলুন।

এই প্রথম নিউ ইয়র্কের ভারতীয় বংশোদ্ভূত এবং প্রথম মুসলিম মেয়র হয়ে নতুন রেকর্ড ও নতুন ইতিহাস রচনা করলেন মামদানি। পক্ষ প্রতিপক্ষের সব তাবড় নেতাদের হারিয়ে মামদানির এই জয় সম্পূর্ণ অচেনা পথে, অন্যরকম। একে মার্কিন রাজনীতিতে হাওয়া কিংবা বাঁক বদল বলা যেতে পারে। জেন জি-দের পালস তিনি বোঝেন। অভিবাসীদের ভোট টানতে ইংরেজির পাশাপাশি হিন্দি, উর্দু এমনকি বাংলাতেও প্রচার করেছেন। বহু ভাষায় তিনি সাবলীল, পারদর্শী। মামদানির মা মীরা নায়ার ভারতীয়। বাবা মাহমুদ মামদানি উগান্ডার। জোহরানের স্ত্রী সিরীয় বংশোদ্ভুত। এখন অভিবাসীদের ব্র্যান্ড এম্বাস্যাডর ,আর ইয়াং জেনারেশনের আইকন মামদানি। ট্রাম্পের নাকে ঝামা ঘষে দিয়ে সব জল্পনা কল্পনাকে নস্যাৎ করে, সব হিসাব নিকাশকে নিকেশ করে ট্রাম্পের দলের প্রার্থীকে গোহারা হারালেন। মামদানি যেখানে ৫০ শতাংশেরও বেশি ভোট পেলেন, সেখানে ট্রাম্পের প্রার্থী ১০ শতাংশ ভোটও পাননি। একরকম খালি হাতেই ফিরতে হয়েছে তাঁকে।
ট্রাম্পের অন্যতম ইস্যু অভিবাসী এবং ইসলামোফোবিয়াকেই হাতিয়ার করে প্রচার চালিয়েছেন মামদানি। সবার দুয়ারে গিয়ে প্রান্তিক মানুষের হয়ে তাদের ভাষায়, তাদেরই কথা তুলে ধরে জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সবার মন জয় করতে সক্ষম হয়েছেন। নিউ ইয়র্কবাসীর কাছে মামদানি এখন মুশকিল আসান বা ধন্বন্তরি ডাক্তার। তাদের ইত্যাকার যাবতীয় সমস্যা ও অসুবিধা দূর করতে প্রতিষেধকের নাম জোহরান মামদানি।
ভোট প্রচারে নিত্যপ্রয়োজনীয় ইস্যু নিয়ে সমাজের সব শ্রেণি ও স্তরের মানুষের চাহিদাকে হাইলাইট করেছেন মামদানি। তার কথা আমজনতা গোগ্রাসে গিলেছে। চেটেপুটে কব্জি ডুবিয়ে খেয়েছে মমদানির ভাষণ, আশ্বাস ও প্রতিশ্রুতি। আমেরিকা আগে কখনো এরকম ভোট প্রচার বা জনসংযোগ দেখেনি। আর এই মাটিঘেঁষা প্রচারেই বাজিমাত করে নয়া ইতিহাস গড়লেন মামদানি।
ইসলামোফোবিক আমেরিকায়, মুসলিম পরিচয়ই মামদানির বড় হাতিয়ার। জেতার আগে এবং পরেও জোর গলায় প্রকাশ্য সমাবেশে তিনি বলেছেন, আমি মুসলমান। মামদানি ইসরাইল বিরোধী, ট্রাম্প বিরোধী। এসব জাহির না করলেও এগুলোই তার ইউএসপি হয়েছে। ফলে তার ব্যক্তিগত রাজনৈতিক মতাদর্শ নিয়ে কোথাও তিনি নিন্দিত, কোথাও বা নন্দিত। নিজের দল ডেমোক্রেটিক পার্টিতেই তাকে নিয়ে অনেক সমালোচনা। কিন্তু সেসব জাস্ট ইগনোর করেছেন। প্রমাণ করেছেন জাত, ধর্ম নয়, ব্যবহারই মানুষের পরিচয়। নিউ ইয়র্কের ওপর ইহুদিদের ভাল প্রভাব, সেখানেই তাদের চোখে চোখ রেখে মার্জিত ভাষায়, সংযমী আচরণে সমালোচনা করেছেন মামদানি। এক পর্যায়ে ইহুদিরাও তার পাশে সর্বাত্মকভাবে দাঁড়িয়েছে। ইহুদিদের ঢালাও সমর্থন পেয়েছেন। তাদেরকে মামদানি বুঝিয়েছেন, ইহুদি, খ্রিস্টান, মুসলিম সবাই মানুষ। আমাদের মধ্যে বিভেদ, বিভাজন ঘটাচ্ছে যায়নবাদ এবং শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদ ইত্যাদি সর্বনাশা মতবাদগুলো।

ওয়াশিংটন এবং নিউ ইয়র্কের রাজনীতির এফেক্ট গোটা আমেরিকায় পড়ে। অগত্যা নিউ ইয়র্কের মেয়র হিসেবে মামদানির আমদানি এবং তার স্বতন্ত্র রাজনৈতিক ঘরানা ও আপন কা স্টাইলের প্রভাব সারা দেশেই কমবেশি পড়বে। মামদানির ছাতি ৫৬ ইঞ্চি না হলেও তার বুকের পাটা আছে। এমন চ্যালেঞ্জ নিয়েছেন, যেখানে গতবছর তার দল ডেমোক্র্যাট পার্টির প্রেসিডেন্ট প্রার্থী কমলা হ্যারিস বড় মার্জিনে হেরেছেন। কমলাও মামদানির মতোই ভারতীয় বংশোদ্ভূত। ফলে মামদানির এই ঐতিহাসিক জয়ের মানে এটাই দাঁড়াল যে, লোকে ডানপন্থী, দক্ষিণপন্থীদের ঝেঁটিয়ে বিদায় করে ভোট দিলেন সরাসরি তাদের পছন্দের প্রার্থী, কাছের মানুষ, কাজের মানুষ জোহরান মামদানিকেই।
ট্রাম্প তো লাগাতার অকথা কুকথা বলেই চলেছেন। মামদানি নাকি পাগলা, কমিউনিস্ট, মুসলিম, ইহুদি বিদ্বেষী, খ্রিস্টান বিরোধী, অভিবাসী ইত্যাদি। অনেকে আবার বলেছিলেন, মামদানি নিউ ইয়র্কের মেয়র হলে স্ট্যাচু অফ লিবার্টিকেও নাকি বোরখা পরিয়ে ছাড়বেন। এখন যা পরিস্থিতি তাতে মনে হচ্ছে, বোরকা না পরলেও ট্রাম্পকে লজ্জায় বালিতে মুখ গুঁজে থাকতে হবে, অন্তত কিছুদিন।

কারো পদলেহন করে রাজনীতিতে আসেননি মামদানি। তিনি যা হয়েছেন, তার সবটাই নিজে হাতে নিজেকে গড়ে তোলা। নিউ ইয়র্কের মতো হাইফাই শহরে ভোট প্রচারের টাকা ছিল না তার। তাই একেবারে গ্র্যাসরুট লেভেলে গিয়ে কাজটা করেছেন। সবার সঙ্গে মন খুলে মনের কথা বলেছেন। মানুষ তার মধ্যে মেকী, ফেক বা জুমলার লেশমাত্র দেখতে পায়নি। জনগণকে নিজের মতো করে বিকল্প পথের সন্ধান দিয়েছেন। অথচ তার প্রতিপক্ষ প্রার্থীদের হাতে ছিল বিপুল অর্থ, লোকবল, বাহুবল, ইহুদি লবি এবং মিডিয়া। মামদানির হাতে ছিল কেবল সোশ্যাল মিডিয়া। তা দিয়েই তিনি অসাধ্য সাধন করেছেন। মেইনস্ট্রিম মিডিয়াকে জাস্ট বুদ্ধু বানিয়ে ছেড়েছেন। মামদানি খুব জটিল, কঠিন, দুর্বোধ্য রাজনীতি ও কূটনীতির বিষয়গুলোকে বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে একেবারে জলবৎ তরলং করে মানুষকে বুঝিয়ে দিয়েছেন।
এবার আরো ইন্টারেস্টিং হবে মার্কিন রাজনীতি। নতুন সমীকরণ আসবে মার্কিন পলিটিক্সের কেমিস্ট্রিতে। খেলা হবে। খেলা আরও জমে যাবে। মামদানির পায়ে ফুটবল। ট্রাম্পকে তিনি কিছুতেই রেফারি হতে দেবেন না। অগত্যা এখন করণীয় কী? একথা ভাবতে ভাবতে রাতের ঘুম উবে গিয়েছে সে দেশের প্রেসিডেন্টের। তার সব চাল বানচাল করে দিয়ে শেষ হাসি হেসেছেন মামদানি। ট্রম্পের কৌটিল্য, চাণক্য, গৌরী সেন সবাই সেখানে ঠুঁটো জগন্নাথে পরিণত হয়েছে। গোমড়া মুখো ট্রাম্প এখন খুবই উদ্বেগে রয়েছেন। ঘন ঘন প্রেসার মাপছেন। জলও মাপছেন। লন্ডনের মেয়র সাদিক খানকে নিয়ে তিনি অনেক কিছু বলেছেন। এবার নিজের দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গরাজ্য এলিট শহরের মেয়র হয়ে গেলেন আর এক মুসলমান। ইতিমধ্যেই ইতিউতি শোনা যাচ্ছে, মামদানি নাকি পরের বার আমেরিকার প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হতে পারেন। তার মধ্যে বারাক ওবামার মতো জোশ আছে। খুবই ডায়নামিক ও স্কলার ছেলে মামদানি। সেদিক থেকে ট্রাম্প তার কাছে লিলিপুট বললে অত্যুক্তি হবে না। তবে ট্রাম্প চাইছেন, সংবিধান বদলে যদি তিনবার প্রেসিডেন্ট হওয়া যায়। কিন্তু সে গুড়ে বালি।








