চলমান জীবন: তথ্য-প্রযুক্তি ও আমাদের করণীয়
মোঃ হাসানুজ্জামান
আমরা সকলেই এক প্রকার যাত্রী। সারা জীবন ধরে ভিন্ন পথে ভিন্ন ভাবে যাত্রা করে চলেছি। আমরা যাত্রা করি এক স্থান থেকে অন্য স্থানে, এক দেশ থেকে অন্য দেশে, এক শহর থেকে অন্য শহরে, এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে, অথবা সহজে বলতে গেলে, আমাদের কর্মক্ষেত্র ও ঘরের মধ্যস্থলে। আবার বাড়িতে থেকে দূরদর্শনে চোখ রেখে অনেকে ভাবেন, তারাও বিভিন্ন স্থান ঘুরে বেড়াচ্ছেন। মানস ভ্রমণ। যে যেখানে যেভাবেই অবস্থান করি না কেন আসলে আমরা সবাই ঘুরে চলেছি। কেননা, আমরা যে গ্রহে বসবাস করছি, সেই গ্রহই নির্দিষ্ট কক্ষপথে সূর্যের চারিদিকে অবিরত ঘুরছে। আমরাও ঘুরছি। শুধু আমরা কেন, সৌরজগতের প্রতিটি গ্রহই নির্দিষ্ট কক্ষপথে ঘুরে চলেছে। অর্থাৎ মহাবিশ্বের সঙ্গে আমরাও ভ্রমণে রত। কখন কোথায় অবস্থান করছি, নিজেরাই জানি না। এসব যেন মাথা ঘুরিয়ে দেওয়ার মতো বিষয়।
সময়ের অগ্রগমণের সঙ্গে সঙ্গে চলতে থাকে এই ভ্রমণ। এই পৃথিবীতে জন্ম গ্রহণ, তারপর অনেক বিস্ময়কর ঘটনা ও ইতিহাসের সাক্ষী হওয়া, অবশেষে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে চলে যাওয়া — ভ্রমণ চলছেই। পার্থিব জীবনের শেষ, আবার মৃত্যু পরবর্তী জীবনের শুরু; এই পৃথিবীর একদিন ধ্বংস হওয়া, আবার পুনর্গঠন — এসবই ভ্রমণ, এসবই অন্তহীন যাত্রা। জানি না এর শেষ কোথায়। এসব যেন আমাদের বোধের বাইরে, কঠিন কঠিন ভাব, তাই প্রয়োজন বিশেষ ব্যাখ্যার।
এখন আসা যাক জাতি হিসেবে মানুষের ভ্রমণের কথায়। সেই প্রাগ-ঐতিহাসিক কাল থেকেই এই ভ্রমণের সূচনা। মানবজাতির যাত্রা শুরু হয়েছে বন্য জীবন-যাপনের মধ্য দিয়ে। সেই বন্য আদিম মানুষই একদিন নগরের অধিবাসী হয়, রাজ্য জয় করে এবং রাজ্যের অধিপতিও হয়। আবার শিল্পায়নের সঙ্গে সঙ্গে গ্রাম্য জীবন থেকে শহুরে জীবনের যাত্রা শুরু হয়। জ্ঞানার্জন ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নের সাথে সাথে আদিম মানুষের ভ্রমণ একেবারে আজকের অতি-আধুনিক জীবনযাত্রায় এসে পৌঁছেছে; সেই প্রস্তুর যুগ থেকে শুরু করে ব্রোঞ্জ যুগ, লৌহ যুগ, অবশেষে পুঁথিগত জ্ঞান এবং একেবারে সাম্প্রতিক কালে ডিজিটাল যুগ — এভাবেই চলছে।
বর্তমানে যে যুগ চলছে, তা হল তথ্যের যুগ। এখন যেসব তথ্য আমরা মাত্র এক মাসেই সংগ্রহ করতে পারি, মাত্র দুই জেনারেশন পূর্বের মানুষের তা সংগ্রহ করতে সারাজীবন লেগে যেত। প্রযুক্তির দৌলতে আমরা তথ্যের জোয়ারে এসে পড়েছি। কত রকমই না তথ্য সংগ্রহের মাধ্যম (Media) – সামাজিক মাধ্যম, আমোদ-প্রমোদের মাধ্যম, ক্রীড়া মাধ্যম, সংবাদ মাধ্যম, প্রযুক্তিগত মাধ্যম, এরকম আরো অনেক মাধ্যম — যা আমাদেরকে সারা পৃথিবীর বিভিন্ন রকম তথ্য প্রতিনিয়ত প্রদান করে থাকে। সুতরাং আমরা একেবারে তথ্যের সাগরের মধ্য দিয়ে ভ্রমণ করে চলেছি, তা ডিজিটাল হোক বা অন্য কিছু।
এই তথ্যের যুগে দুই ধরনের মানুষ দেখা যায়। এক শ্রেণির মানুষ তথ্য নির্মাণ করেন, সংগ্রহ করেন এবং তা উল্লেখিত মাধ্যমে পরিবেশন করেন। অপর শ্রেণির মানুষ তা উপভোগ করেন। ঠিক যেমন চলচ্চিত্র নির্মাতা ও দর্শক, কিংবা সংবাদদাতা ও পাঠক বা দর্শক-শ্রোতা। তথ্য নির্মাতাগণ ব্যক্তিগত স্বার্থে বা অন্য কোন উদ্দেশ্যে তথ্য নির্মাণ করেন। আর উপভোক্তাগণ চলচ্চিত্র, দূরদর্শন, সংবাদপত্র, ইন্টারনেট ইত্যাদি মাধ্যম থেকে তা উপভোগ করেন — আমোদ-প্রমোদ করা, জ্ঞান অর্জন করা, অবসর সময় কাটানো, কৌতুহল মেটানো যেকোন কারণেই হোক। সেই সঙ্গে, ইন্টারনেটের প্রভূত উন্নতির ফলে ‘প্যান্ডোরার বাক্স’ এখন আমাদের আঙুলের ডগায় এসে হাজির।
এই তথ্য নির্মাণকারীও অনেক রকমের হয়। রাজনৈতিক তথ্য নির্মিত হয় প্রার্থীকে জেতানোর জন্য, চলচ্চিত্রগত তথ্য নির্মিত হয় দর্শক আকর্ষণের জন্য, ব্যবসায়িক তথ্য নির্মিত হয়ে থাকে ব্যবসায় মুনাফার জন্য ইত্যাদি। আবার মানুষের মনে আশা জাগাতেও তথ্য নির্মিত হয়। কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে হবে, কোথায় দোকান করতে হবে, কোন গাড়ি কিনতে হবে, কোন দর্শনীয় বা ধর্মীয় স্থান ভ্রমণ করতে হবে, এমনকি কেমন মেয়ে বিয়ে করতে হবে, কীভাবে অর্থ সংগ্রহ ও সঞ্চয় করতে হবে, কোন ধরনের জীবন যাপন করতে হবে; ইত্যাদি সমস্ত ব্যক্তিগত বিষয়েও আমরা তথ্যের দ্বারা অনুপ্রাণিত বা চালিত হই। এইভাবে আমরা সাধারণ মানুষেরা অন্যের নির্মিত এবং ভাবিত তথ্যের উপরে এত বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছি যে, আমরা নিজেরাই আমাদের ব্যক্তি চেতনা, ভাবনা, স্বতন্ত্রতা, সৃজনশীলতা ইত্যাদি একেবারে জলাঞ্জলি দিয়ে চলেছি।
দুর্ভাগ্যজনক ভাবে প্রদত্ত এইসব তথ্যের সবটাই একেবারে সত্য নয়। অনেক ক্ষেত্রে অতি সূক্ষ্ম ভাবে তথ্যের নির্মাতা ও উৎসাহ দাতাগোষ্ঠী প্রকৃত সত্যের পরিবর্তন করে মিথ্যা ভাবনা প্রতিষ্ঠা করার জন্য এই সকল তথ্য নির্মাণ ও পরিবেশন করেন। এগুলি এতই নিখুঁত ও উদ্দেশ্য প্রণোদিত যে, সাধারণ মানুষের সব ক্ষেত্রে কোনটি ঠিক, বা কোনটি ভুল — এসব বিচার বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় ও যোগ্যতা থাকে না। মোদ্দা কথা হল, এইভাবে তথ্যের সাগরে ডুবে থাকার জন্য বিশ্বের আসল ছবি আমরা পাই না। ঘটনাক্রমে, এই সমস্ত তথ্যের উপর আমরা এতটাই নির্ভরশীল যে, আমরা এর বাইরে বেশি কিছু জানতে পারি না। তাই দেখতে পাচ্ছি, বিবেকবোধ হারিয়ে প্রকৃত জগতের পরিবর্তে আমরা তথ্য নির্মাতাদের স্ব-ভাবনার রাজ্যে বসবাস করছি।
এই তথ্যের পরিমাণ এত বেশি যে, আমরা বিমোহিত হয়ে পড়েছি এবং নিজেদেরকে এর মধ্যে হারিয়ে ফেলেছি। যেন বৃহতঃকায় এক বাড়ি; যার মধ্যে এত বেশি জিনিসের আয়োজন, এত বেশি ঘটনা অহরহ ঘটে চলেছে, আর আমরা তাতে এমনই নিমগ্ন আছি যে, বাইরে কী ঘটছে, তার খবর রাখছি না বা খবর রাখার ইচ্ছাও থাকছে না। একইভাবে, আমাদের সকল চিন্তা-ভাবনা, দেখাশোনা ও জীবনযাপন অন্যের দ্বারা পরিবেশিত এই তথ্য ঘরেই সীমাবদ্ধ। সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে পারছি না। আমরা পাশের বাড়ির চোখে দেখা পরিচিত মানুষটির দুরবস্থার চেয়ে অনেক বেশি ভাবি এবং আলোচনা করি সিনেমার নায়ক-নায়িকা বা এইরকম দূরবর্তী সেলেবদেরকে নিয়ে।
মহাকাশযান কিংবা বৈজ্ঞানিক ঘটনা সম্পর্কে অনেক খবর রাখি, ঠিকই আছে, কিন্তু সামান্য পরিমাণেও জানতে চেষ্টা করি না ওই শরণার্থীর কথা, যার বসবাসের ঘরটা পর্যন্ত বোমা মেরে উড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, যাকে চিরদিনের জন্য পৃথিবীতে গৃহহীন করে যাযাবর বানিয়ে দেওয়া হয়েছে। আসলে এসবই আমাদের চোখ ঘোরানোর কৌশল মাত্র। তাই, যে ভাবেই হোক এই মিথ্যা তথ্যের সাগর থেকে আমাদেরকে বেরিয়ে আসতে হবে এবং চোখে পরিয়ে দেওয়া রঙিন চশমা খুলে সত্যিকারের ঘটনা ও প্রকৃতির সম্মুখীন হতে হবে। কিন্তু এক্ষেত্রেও উভয় সংকট এবং প্রশ্ন — কীভাবে এই মিথ্যা জগৎ থেকে নিজেদেরকে বিচ্ছিন্ন করব?
আমরা একটি বিদ্যুৎবিহীন সমাজ গঠন করতে পারি, যেখানে কোন তথ্য প্রদানকারী মাধ্যম থাকবে না; থাকবে না টেলিভিশন, সংবাদপত্র, সিনেমা, মোবাইল। কিন্তু এমন প্রতিজ্ঞা গ্রহণ হয়ত বেশিরভাগ মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। পাশাপাশি, এমনকি যদি আমরা ওই সকল মাধ্যম থেকে নিজেদেরকে বিচ্ছিন্ন করতে সক্ষমও হই, তাহলে কীভাবে জানতে পারব সেইসব ব্যক্তিদের সঙ্গে কী ঘটছে, যাদের সম্পর্কে আমরা অনির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ করে থাকি এই সকল অনির্ভরযোগ্য মাধ্যম থেকে? যদি এমনটি ঘটেই থাকে, তবে আমাদের দ্বারা খুব বেশি তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হবে না। সেক্ষেত্রে আমাদের প্রত্যেকের নিজ দায়িত্বে প্রতিবেশীদের কাছে যেতে হবে, জানতে হবে তারা কেমন আছেন এবং কীভাবে জীবন যাপন করছেন। পরিদর্শন করতে হবে শরণার্থী শিবির, জানতে হবে তাদের প্রকৃত দুরবস্থার কথা। স্বল্প পরিসরে হলেও এরকম প্রচেষ্টা আমরা করে দেখাতেই পারি এবং তা সম্ভবও।
যাহোক, কিছু ক্ষেত্রে আত্মসমীক্ষা ও অসত্যকে বিচারবোধের দ্বারা নির্বাচন করে মধ্যপন্থা অবলম্বন করতে হবে। আমরা এমন এক যুগে ও সমাজে অবস্থান করছি, যেখানে প্রযুক্তি ও তথ্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তবুও আমাদের প্রয়োজন সাপেক্ষে সময়ে সময়ে এসব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে সত্যিকারের পৃথিবীর মুখোমুখি হতে হবে। জ্ঞানী ও সুস্থ্য মানসিকতার মানুষের সঙ্গে ওঠাবসা করতে হবে। নিজেদেরকে যুক্ত করতে হবে প্রকৃত সেবামূলক কাজে। সময় কাটাতে হবে গাছপালা ও প্রকৃতির সঙ্গে। উপভোগ করতে হবে নদীর কুল কুল ধ্বনি ও আকাশের তারকারাজির মিষ্টি চাহনি।
জানতে হবে ঈশ্বর-সৃষ্ট এই বিশ্বকে, সেই সঙ্গে নিজেদেরকেও। আমরা কারা? কেন আমাদের এই পৃথিবীতে পাঠানো হয়েছে? আমাদের অস্তিত্বের বা বেঁচে থাকার কারণেই কি? কীভাবে, কোন উদ্দেশ্যে এবং কার নির্দেশে প্রাকৃতিক নিয়মগুলি সুষ্ঠুভাবে সংঘটিত হয়ে চলেছে? এইগুলিই সেই প্রশ্ন, যা প্রাচীন গ্রিক দার্শনিকদের মনে উদিত হয়েছিল এবং তাঁরা এই নিয়ে কাজও করেছিলেন। আর তাঁরাই ছিলেন প্রকৃত জ্ঞানী মানুষ।








