ছুটির বাঁশিতে সকরুণ সুর শুনব কবে?
পাভেল আখতার
”এমনি করেই যায় যদি দিন যাক না!” রবীন্দ্রনাথের এই গানটি আমার শিশুপুত্রের খুব পছন্দ। গত বছরের কথা। তিন-চারদিন গৃহশিক্ষক আসেননি। অবশেষে আসবেন শুনে ওর শিশুসুলভ প্রশ্ন, ”স্যারের পুজো কি শেষ হয়ে গেছে?” প্রশ্ন শুনে আমার মনে হল, রবীন্দ্রনাথ ওর মুখে উদ্ভাসিত হয়েছেন — অর্থাৎ, ‘এমনি করেই যায় যদি দিন যাক না’ বন্ধ করে আবার কেন পড়াশুনার হাঙ্গামা। তার ওপর স্যারের দেওয়া ‘বাড়ির কাজটুকু’ করলেই তো হয় না — একথায় ওর বিস্ময় অন্তহীন। তারপর আবার কী থাকতে পারে পড়ার সেটাই ওর কাছে দুর্বোধ্য।
বড়রাই যেখানে ভাবনাবর্জিত ছুটি-প্রিয়, সেখানে ছুটি পেয়ে ‘এমনি করেই যায় যদি দিন যাক না, মন উড়েছে উড়ুক না রে, মেলে দিয়ে মনের পাখনা’ অনন্তকালের অমল গীতসুধা যে নয়, যা ক্ষণিকের তা-ই আনন্দের ইত্যাদি ‘গুরুকথা’ শিশুর পক্ষে কি বোঝা সম্ভব? ছুটি পেলে কেবল শিশুরা নয়, ধেড়ে শিশুরাও বেজায় খুশি হয়ে ওঠে। ছুটির ভাল-মন্দ, উচিত-অনুচিত, ছুটির সীমা, ছুটি কি কেবল অলস দিন যাপনের অঙ্গ, না-কি তাকে ইতিবাচক কাজেও লাগানো যায়, ইত্যাদি ভাবনা এখন বিরল।
প্রসঙ্গত সৈয়দ মুজতবা আলী বলছেন: “জীবনের প্রথমেই আমি ঠিক করে নিয়েছিলাম যে, আমি মাস্টারি করব। কারণ, ছুটি অনেক এবং সেজন্য আমি লেখাপড়ার সুযোগ পাব। আজকাল শিক্ষকদের বাসায় সাধারণত তুমি বই দেখতে পাবে না। কাউকে দেখবে না যে বসে বসে বই পড়ছে। তবে তাদের কাছে একটা বই তুমি অবশ্যই পাবে। সেটা হল চেক বই। শোনা যায় যে, আজকাল ছেলেরা ক্লাসে যায় না। কেন যায় না জানো? কারণ, মাস্টাররা নিজেরা পড়েন না এবং সেই কারণে তারা স্বাভাবিকভাবেই ছাত্র-ছাত্রীদের পড়াতে পারেন না।”
শিশু ও কিশোরদের নিয়ে ‘বড়দের আক্ষেপ’ অন্তহীন! তারা পড়াশুনা করে না, সবসময় মোবাইলে ডুবে থাকে। নানা ‘অতিমানবদের’ নিয়ে তাদের ‘জগৎ’ তৈরি হয় এবং তাতেই তারা বিচরণ করে। কিন্তু ‘আক্ষেপ’ বা ‘দুঃখ’ যা-ই বলা যাক, সবই বড়দের ‘দায়বদ্ধতা’ বর্জিত অসার অভিব্যক্তি। শিশু-কিশোরদের ‘অনভিপ্রেত অভ্যাস’ গড়ে ওঠার নেপথ্য কারণ অনুসন্ধান করলে ‘শরাঘাতে’ নিজেদেরই বিদ্ধ হতে হবে। শিশু ও কিশোররা বেড়ে উঠছে নিঃসঙ্গতার বিষাদ-বলয়ে। ‘বড়’রা তাদের ‘সময়’ দেয় না। নিজেরাও মোবাইলে আসক্ত। গৃহ-পরিসরে একটি শিশুর সবচেয়ে বড় প্রয়োজন বড়দের ‘মরমী সান্নিধ্য’। তার সঙ্গে কথা বলা, গল্প শোনানো, খেলা করা ইত্যাদি। এসব কতটা হয়, তা প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়। উপরন্তু, তাদের অপর্যাপ্ত চাপল্য ‘বিরক্তিকর’ বোধ হওয়ায় হাতে ধরিয়ে দেওয়া হয় মুঠোফোনটি, নিশ্ছিদ্র ‘আত্মসুখ’ যাতে উদযাপিত হতে পারে, পরবর্তীকালে যা ‘চমৎকার আক্ষেপ’-এর কেন্দ্রবিন্দু হবে!
চোখের সামনে শিশুরা যদি বড়দেরই মোবাইলে আসক্ত হতে দেখে, বাড়িতে বই বা পত্র-পত্রিকা যদি বড়রা কেউ ছুঁয়েও না দেখে, তাহলে তাদের অভ্যাস ও আচরণ ভিন্নতর হবে কোন্ যুক্তিতে? তাদের নৈতিক চরিত্র, সামাজিকতার বোধ — এসবও ঠিকঠাক গড়ে না ওঠার নেপথ্য কারণ বিশ্লেষণ করলে বল নিজেদের কোর্টেই এসে পড়বে। সবথেকে সমস্যা হচ্ছে, বড়রা ক্রমান্বয়ে এইসব ভাবনা ভাবা থেকেও ‘ছুটি’ নিচ্ছেন! শিশু ও কিশোরদের জন্য উত্তম খাদ্য ও বস্ত্রের বন্দোবস্ত করতে পারলেই সব ‘কর্তব্য’ শেষ, এটাই এখন যেন একমাত্র জনপ্রিয় জীবনাদর্শ। মজার বিষয় হ’ল, এইসব যে একেবারেই ‘অজানা’ তা-ও কিন্তু নয়। নিজেদের ‘পরিবর্তিত’ করার পরিবর্তে কেবল ওই ‘আক্ষেপের বিলাসিতায়’ মগ্ন হয়ে থাকায় হয়ত বড়দের তেমন ‘ক্ষতি’ কিছু নেই, কিন্তু শিশুদের ক্ষতি অশেষ!
বস্তুত, আত্মসমীক্ষা থেকে ছুটি না নিলে দেখতে পাওয়া যাবে যে, বড়র মধ্যে যে ‘মানবতা’ শব্দটিকে কলঙ্কিত করে তোলার নিদারুণ চেষ্টা, সে যদি তার ক্রমশ ‘বড়’ হয়ে ওঠার দিনগুলিতে মানবতার পাঠ ঠিকমতো পেত, তাহলে কি ‘মানুষ’ হিসেবে নিজেই নিজের মৌলিক পরিচিতিটাকে কলঙ্কিত করতে ব্যগ্র হয়ে উঠত? একটি শিশু যখন বড় হচ্ছে আদরে ও সোহাগে, তখনই একটু একটু করে তার অন্তর্গত সত্তায় সঠিক মূল্যবোধের শিক্ষা, নৈতিকতা ও মানবতার পাঠ সঞ্চারিত করে দেওয়া প্রয়োজন।
চোখের সামনে বিপন্ন মানুষটিকে দেখেও সন্তর্পণে শিশুটিকে টেনে নিয়ে যদি ঘরের পথে পা-বাড়ানো হয়, তাহলে সে শিখল যে, এই অবস্থায় এটিই করণীয়। সাহায্যের জন্য হাত প্রসারিত করা ব্যক্তিটিকে উপেক্ষা করলে সে শিখবে যে, এটিই আদর্শ কর্মপন্থা। অতএব, শিশুকে ভাল খাদ্য, ভাল বস্ত্র বা আরও অনেক ‘ভাল’ কিছু দেওয়ার চেয়ে তার ‘উত্তম চরিত্র’ গঠন করা, তাকে ‘যথার্থ মানুষ’ করে গড়ে তোলা পিতা-মাতার দিক থেকে সবচেয়ে ভাল কাজ। শুধু ‘বড়’ হলেই হয় না, ‘ছোট’-কে কীভাবে বড় করা হচ্ছে, তার উপর ভিত্তি করেই ‘বড়’র যথার্থ ‘বড়ত্ব’ প্রমাণিত হয়।
ধর্ম ও রাজনীতি সম্পূর্ণ আলাদা! ধর্ম শুদ্ধ ও সুন্দর জীবনযাপনের প্রণালী বর্ণনা করে, আর রাজনীতি মানুষের জীবনের সুখ ও শান্তি, নিরাপত্তা, কল্যাণ ইত্যাদি নিশ্চিত করার ব্যবস্থা করে। কিন্তু, আজ এই দুটি বস্তুর মধ্যে যে গাঁটছড়া বাঁধা হয়েছে, তার দায় কেবল রাজনীতির কাঁধে বর্তায় না। সহমত হওয়া বা সমর্থনের উপরেই এমন বিষম বস্তু আমাদের জীবনে হাজির হয়েছে, যার সাক্ষাৎ ফলাফল হচ্ছে, সমাজে মানুষের সঙ্গে মানুষের সহজ সম্পর্ক বিকশিত হওয়ার শর্ত আজ আর নিছক সামাজিকতা অথবা প্রতিবেশিত্ব নয়; বরং রাজনীতির দ্বারা নির্মিত ধর্মীয় ভেদ-ভাবনার অসুন্দর ধারণা! এর ঢেউ এতদূর অবধি আজ গড়িয়েছে যে, মানুষের দুঃখ, বিপন্নতা, এমনকি মৃত্যুও নিছক মানবিক বোধে মানুষকে যেন বিচলিত করে তুলতে ব্যর্থ হচ্ছে।
“গাহি সাম্যের গান, মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান” — ‘মানুষ’ কবিতায় নজরুলের এই বাণীর অন্তর্নিহিত নির্যাস আমাদের ভাবনা থেকে যে ‘ছুটি’ নিয়েছে, তার ক্ষতি থেকে আমরা কেউই কি রক্ষা পাব? হাত, পা, চোখ, কান ইত্যাদি একটি অথবা একাধিক অঙ্গ অসুস্থ থাকা আসলে শরীর অসুস্থ থাকা। সমাজও মানব-শরীরের মতো, কেবল পার্থক্য হচ্ছে, এক্ষেত্রে আমরা বিচ্ছিন্ন করে দেখার ভ্রমে আচ্ছন্ন, যার মূলে ক্রিয়াশীল আছে আর পাঁচটা বিষয়ের মতো ভাবনাকে ‘ছুটিতে পাঠানো’ ভাবনাহীন জীবনযাপনের অভ্যাস!
সুখের আলস্যে “আমাদের ছুটি ছুটি চল নেব লুটি ওই আনন্দ ঝরনা” — উত্তমকুমার অভিনীত ‘জয়জয়ন্তী’ সিনেমার এই গান আমাদের প্রাণে যে আরাম এনে দেয়, তা আবার দিনের শেষে রবীন্দ্রনাথের গান “আঁধার সকলই দেখি” গাইতে বাধ্য করবে না তো?








