পুশব্যাক এক অশনি সংকেত!
ড. নূরুল ইসলাম
প্রতি বছর স্বাধীনতা দিবসে লালকেল্লার প্রাকার থেকে জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ প্রদান করেন প্রধানমন্ত্রী। এই ভাষণে তিনি সাধারণত সরকারের নীতি ও কৌশল ঘোষণা করেন। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শ্রী নরেন্দ্র দামোদরদাস মোদি এবছরের ভাষণে অনুপ্রবেশ ও অবৈধ অভিবাসীদের বিরুদ্ধে সরকারের বিশেষ পরিকল্পনা ঘোষণা করেন। এই ভাষণে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে, অনুপ্রবেশের ফলে দেশের জনবিন্যাস পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে! দেশের নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা বিঘ্নিত হচ্ছে! দেশের আর্থিক প্রবৃদ্ধি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে! সত্যিই তো, পৃথিবীর কোন দেশই বিদেশিদের অনুপ্রবেশ মানতে পারে না।
অতঃপর প্রধানমন্ত্রী ও বিজেপি দলের নেতা-কর্মীরা ধারাবাহিকভাবে কথিত অনুপ্রবেশ ও জনবিন্যাস পরিবর্তন নিয়ে সোচ্চার প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন। শুধু প্রচার নয়, সরকার ইতিমধ্যে বহু বিদেশি অনুপ্রবেশকারী এবং সেই সঙ্গে এদেশের বহু বৈধ নাগরিককে জোরপূর্বক দেশের বাইরে তাড়িয়ে দিচ্ছে! পুশ ব্যাক করে চলেছে! অনেকটা চুপিসারে। কারণ, সরকার আন্তর্জাতিক আইন ও বিধি অনুসরণ না করে একাজ করে চলেছে। এজন্য এনিয়ে সরকার প্রকাশ্য ঘোষণা না দিয়ে এবং গণমাধ্যমকে এড়িয়ে একাজ করে চলেছে। এজন্য আন্তর্জাতিকভাবে ভারতের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে। ভারত পৃথিবীর বৃহত্তম গণতন্ত্র। এজন্য ভারত সরকার মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হবে, এটাই স্বাভাবিক।
বস্তুত, আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নাগরিক এবং আধুনিক রাজতন্ত্রে প্রজার সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা আছে। পৃথিবীর সকল দেশে নাগরিকত্ব গ্রহণ এবং পরিত্যাগ করার সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি আছে। কারা নাগরিক এবং কারা অবৈধ অভিবাসী – তাও সবিস্তারে বলা হয়েছে। অবৈধভাবে কোন দেশে অনুপ্রবেশ করলে তাকে বলা হয় অনুপ্রবেশকারী। অবৈধ অভিবাসীও বলা হয়। আবার পাসপোর্ট ও ভিসা প্রক্রিয়া অনুসরণ করে বিদেশে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত বৈধভাবে বসবাস করা যায়। এ ধরনের মানুষ বিদেশি। কিন্তু বৈধ অভিবাসী।
অনুপ্রবেশ ও রাজনীতি:
অনেকেই বিশ্বাস করেন, দেশের বর্তমান ক্ষমতাসীন দল ও সংগঠন গড়ে উঠেছে মুসলিম সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে গৃহীত বিশেষ এক ধরনের নীতি ও আদর্শের ভিত্তিতে। আধুনিক সকল রাজনৈতিক দলের মতো বিজেপিরও নিজস্ব আদর্শ ও নীতিমালা আছে। তারাও পশ্চিমাদের অর্থনীতি ও রাজনীতি অনুসরণ করে। এসব নীতিমালা মানুষের মনে তেমন ছাপ ফেলে না। অন্য সব রাজনৈতিক দল থেকে তারা আলাদা। এটা তারা প্রমাণ করতে চায়। এজন্য তারা মসজিদ-মন্দির, অনুপ্রবেশ, ইউনিফর্ম সিভিল কোড, সংবিধানের ৩৭০ ধারা, মুসলিমদের জব্দ করা ইত্যাদি এজেন্ডা বাস্তবায়ন করে চলেছে। এগুলো তাদের বিশেষ বৈশিষ্ট্য। এই বিশ্বাস, এজেন্ডা ও নীতিমালা এক শ্রেণির হিন্দুদের মধ্যে তাদের জনপ্রিয়তা বাড়িয়ে দিয়েছে। বস্তুত এসব ইস্যু তাদের জীবনরেখা। তাদের প্রাসঙ্গিকতা। আর বর্তমান সরকার এই নীতি ও কৌশল বিশ্বস্ততার সঙ্গে অনুসরণ করে চলেছে।
বর্তমান অনুপ্রবেশ নিয়ে দেশে যে হইচই হচ্ছে তা এই নীতির বহিঃপ্রকাশ। যতদূর জানা গেছে, সম্প্রতি সরকার যত লোক নিয়ম মেনে বা না মেনে পুশব্যাক করেছে, তারা সকলেই মুসলিম। সত্য বলতে কী, এদেশের জনবিন্যাস পরিবর্তন করতে বিদেশি কোন চক্রান্ত কাজ করে চলেছে – এমন কথা কেউ বিশ্বাস করেন না। আবার একথাও সত্য যে, অনেক মানুষ প্রতিবেশি অনেক দেশ থেকে দীর্ঘদিন ধরে এদেশে এসে চলেছে। বাংলাদেশ, নেপাল, তিব্বত, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান থেকে এসেছে। তবে আরব থেকে আসছে কিনা বলতে পারব না। আমরা বিশ্বাস করি, কোন দেশ এভাবে দীর্ঘদিন ধরে বিদেশিদের গ্রহণ করতে পারে না। যেখানে অতিরিক্ত জনসংখ্যা এদেশের একটি বড় সমস্যা। অনুপ্রবেশ এখন গোদের উপর ফোড়া। কিন্তু বিজেপি ও এনডিএ সরকার উদ্বিগ্ন শুধুমাত্র বাংলাদেশী মুসলিমদের নিয়ে। তাদের ছাড়া আর কাউকে বিদেশি অবৈধ অনুপ্রবেশকারী মনে করে না।
বস্তুত বিদেশি অবৈধ অভিবাসীদের কোন পরিসংখ্যান সরকারের কাছে নেই। তবে মাঝে মাঝে সরকারি আমলা ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা বলেন, অবৈধ অভিবাসীদের সংখ্যা কয়েক কোটি। অ্যাবসার্ড! এই পরিসংখ্যান বিশ্বাসযোগ্য নয়। বিশেষ করে তারা যাদের বিদেশি বলে চিহ্নিত করে চলেছে, সেই বাংলাদেশী মুসলিম অনুপ্রবেশকারীর সংখ্যা কোনমতেই এত হতে পারে না। তারা কোন দুঃখে এদেশে আসবে? আচ্ছা, এদেশে তাদের কে আশ্রয় দেবে? এদেশের স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায় চিরস্থায়ী নিরাপত্তাহীনতার শিকার। বিদ্বেষ ও বৈষম্যের শিকার। অশিক্ষা ও দারিদ্র্যের শিকার। দাঙ্গা ও মব লিঞ্চিং এর শিকার। সেখানে তারা নিজেদের সংখ্যা বাড়াতে বিদেশি মুসলিমদের ডেকে নিয়ে আসবে! একথা শুনে গাধাও হাসবে! ভারত আমেরিকা নয়। পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি দরিদ্র মানুষের বসবাস ভারতে। এদেশে আসলেই লোভনীয় চাকরি পাবে নাকি! কীসের প্রলোভনে বিদেশিরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ভারতে অনুপ্রবেশ করবে!
তবে একথা সত্য। এদেশে লক্ষ লক্ষ মানুষ এসেছে। কারা এসেছে? কোথা থেকে এসেছে? সরকার জানে। দলের নেতাকর্মীরা জানে। সকল ভারতীয় জানে। কিন্তু সে কথা সহজ ও সরলভাবে বললে পলিটিক্স হবে না। মুসলিম সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে মানুষ তাতানো যাবে না। মনে রাখতে হবে, যারা বাংলাদেশ, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কায় ও নেপালে জন্ম গ্রহণ করে ভারতকে পিতৃভূমি জ্ঞান করে। তারাই এদেশকে ভালবেসে আপন করতে এদেশে চলে আসছে। এদেশের হাজার হাজার সীমান্তরক্ষী বাহিনী তাদের স্বাগত জানাচ্ছে। হৃদয় থেকে না পয়সার বিনিময়ে – সে কথা হলফ করে বলতে পারব না। তারা তো সীমান্ত পার হয়ে আসছে। দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করে একটি পাখিও এদেশে প্রবেশ করতে পারবে না। অথচ কোটি কোটি মানুষ! এসব ভন্ডামি বুঝতে গবেষক হতে হবে না।
মুসলিমদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ:
গত কয়েক মাসে মুসলিমদের টার্গেট করে সরকার যেভাবে হয়রানি শুরু করেছে, তা খুব বিপজ্জনক! এই কথিত অভিযান ইতিমধ্যে বিপুল সংখ্যক মানুষের মধ্যে অসন্তোষ ও অস্থিরতা সৃষ্টি করে চলেছে। যেকোন বাহানায় সরকার তাদের উপর নাগরিকত্ব প্রমাণের দায় চাপিয়ে দিচ্ছে। ভোটার তালিকায় নাম তুলতে, আধার কার্ড করতে গিয়ে, পাসপোর্ট করতে গিয়ে, পশ্চিমবঙ্গের বাইরে কাজ করতে গিয়ে এবং সরকারি প্রকল্পের সুবিধা নিতে গিয়ে তাদের অগ্নি পরীক্ষা দিতে হচ্ছে। তাছাড়াও, এক শ্রেণির তথাকথিত উগ্র রাষ্ট্রবাদী হিন্দু মুসলিমদের দেশছাড়া করার হুমকি দিয়ে সমাজে অস্থিরতা সৃষ্টি করে চলেছে। সেই সঙ্গে সরকার সিএএ, এনআরসি এবং এসআইআর ইত্যাদি অভিযান চালিয়ে মুসলিমদের নাগরিকত্ব নিয়ে স্থায়ী অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগ সৃষ্টি করে চলেছে। সরকার নিরপেক্ষ ও ন্যায়ের পক্ষে কাজ করবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সরকার ধর্মনিরপেক্ষ নয়। একটি ধর্মের পক্ষে এবং একটি ধর্মের বিপক্ষে অবস্থান গ্রহণ করেছে।
অবাক লাগে, এমত অবস্থায় এদেশের দারিদ্র্য ক্লিষ্ট ও অশিক্ষিত মুসলিমরা নির্বিকার! তাদের বিরুদ্ধে এত বড় চ্যালেঞ্জ! কিন্তু এথেকে তাদের পরিত্রাণের উপায় ও পন্থা উদ্ভাবন করার কোন পরিকল্পনা নেই। কোন প্রচেষ্টা নেই।
পরিস্থিতি অনিশ্চিত:
যাদের বিরুদ্ধে এই ধরনের ভয়ানক কর্মসূচি বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে তারা নির্বিকার! পরিস্থিতির গভীরতা ও স্পর্শকাতরতা উপলব্ধি ও বিবেচনা করে, একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি। এই মুহূর্তে দেশের প্রতিটি মুসলমানকে খেয়ে না খেয়ে নাগরিকত্ব প্রমাণের নথি জোগাড় করতে হবে। কিন্তু এই দরিদ্র ও অশিক্ষিত মানুষ কীভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা করবে! কখন, কোথায়, কে এই অগ্নিপরীক্ষার সম্মুখীন হবে, কেউ জানি না। বিচ্ছিন্নভাবে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা সম্ভব নয়। পরিকল্পিত এবং ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। অন্যথায় পরিণতি ভয়ঙ্কর হবে! প্রতিটি মহল্লা, পাড়ায় কমিটি করে এক অপরকে সাহায্য করুন। নথি জোগাড় করতে সহযোগিতা করুন।








