অনুপ্রবেশ যখন হাতিয়ার
মুহাম্মাদ আবদুল মোমেন
উইপোকা ভারতবর্ষকে বিনাশের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। সংসদে দাঁড়িয়ে দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর অনুপ্রবেশ তত্ত্বের এই ক্রোনোলজি থেকেই প্রশ্ন করতে হয়, অনুপ্রবেশ ঘটলে তার দায় কেন্দ্রীয় সরকারের এবং বিশেষত কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের। সুতরাং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে ব্যর্থ অমিত শাহ। ভারতবর্ষের মতো বৃহত্তর শক্তিশালী দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ব্যর্থতায় দেশটাকে উইপোকায় কুরে কুরে খোকলা করে দিচ্ছে! অথচ তার ভাষ্যে, ভারতবর্ষ লঙ্গরখানা নয়, আবার ধরমশালাও নয়। তাই অনুপ্রবেশকারী মুসলমানরা এখানে এসে বসবাস করবে কেন?
মোদী-শাহরা দেশকে ধরমশালা হতে দেবেন না। তবে কি আইন করে আশ্রম বানাবেন? কারণ, মুসলমান ছাড়া অন্য সকলকে নাগরিকত্ব দিতেই তো তৈরি হয়েছে সিএএ আইন। সুতরাং অন্যদের নাগরিকত্ব বা আশ্রয় দেওয়ার ক্ষেত্রে দরাজ বা উদার, কিন্তু মুসলিম প্রসঙ্গে এলেই ধরমশালা বা লঙ্গরখানার কথা উঠবে। সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন (সিএএ) প্রণয়ন ও কৌশলে তা কার্যকর করার উদ্দেশ্যে সম্প্রতি বিহার থেকে বিশেষ নিবিড় ভোটার তালিকা সংশোধনী বা এসআইআর শুরু করেছে নির্বাচন কমিশন। যদিও নির্বাচন কমিশন একটি স্বশাসিত সংস্থা, তারপরও কমিশনের এই প্রক্রিয়াকে সরকারি কর্মসূচি বলতে দ্বিধা করছেন না বিরোধীরা। কারণ, কমিশন সরকারের ভাষা ও ইচ্ছায় কথা বলছে এবং কাজ করে যাচ্ছে। কমিশন যার দ্বারা (নরেন্দ্র মোদী) নিয়োজিত তার প্রতিই দায়বদ্ধতা দেখাচ্ছে। অর্থাৎ কমিশন বিজেপির দলদাসে পরিণত হয়েছে। তাই বিরোধীরা নির্বাচন কমিশনকে বিজেপির বি-টিম বলে অভিহিত করেছে।
নির্বাচন কমিশনের কাজকর্ম থেকে চলন বলন সবেতেই শাসকদলের অনুকরণ। দেশের বিরোধী দলের প্রতি কমিশনের আচরণ শাসকদলের নেতার ন্যায়। শাসকদল যা বলছে, কমিশন তাই করছে। আবার কমিশন যেটাই করছে, বিজেপি সেটাকেই উদ্বাহু সমর্থন করছে। বিজেপি আরএসএস-এর দীর্ঘকালের অভিযোগ হল, দেশে লাগামছাড়া ও অনিয়ন্ত্রিত হারে মুসলিম জনসংখ্যা নাকি বৃদ্ধি পাচ্ছে। সংঘীরা বহুকাল ধরে এই অপপ্রচার চালাচ্ছে যে, মুসলিমরা সচেতনভাবে তাদের সংখ্যা বৃদ্ধি করে চলেছে। উদ্দেশ্য, এখানে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে হিন্দুদের দেশান্তরিত অথবা ধর্মান্তরিত করা। তাই একাধিক বিবাহ এবং গণ্ডা গণ্ডা বাচ্চা পয়দার পরিকল্পনা নিয়ে চলেছে মুসলিমরা।
এছাড়াও রয়েছে লাভ জিহাদ, ব্লাড জিহাদ, অনুপ্রবেশ ইত্যাদি। গত মাসে স্বাধীনতা দিবসে লালকেল্লার ভাষণে প্রধানমন্ত্রীর মুখ থেকে অনুপ্রবেশ শব্দ ফের নতুন করে ধ্বনিত হয়েছে। যদিও এই বক্তব্যের দ্বারা নিজেকেই কাঠগড়ায় তুললেন তিনি। কারণ, অনুপ্রবেশ রোখার দায়িত্ব কেন্দ্রীয় সরকারের। সুতরাং অনুপ্রবেশ হলে তার দায় মোদি-শাহদেরই। কিন্তু তারা সরকারের ব্যর্থতাকে শাক দিয়ে মাছ ঢাকার চেষ্টা করে ভোট ভিক্ষায় অভ্যস্ত।
জনগণের প্রতি দায়িত্ব-কর্তব্য এবং প্রতিশ্রুতি পূরণে ব্যর্থতা ঢাকতে সুচতুরভাবে দেশবাসীকে বিভ্রান্ত ও দিকভ্রান্ত করাই ওদের সহজাত প্রবৃত্তি। এ বিষয়ে এখন আলোচনার অর্থ হল আচ্ছে দিন নিয়ে চায়ে পে চর্চা করা। এসআইআর-এর পক্ষে সাফাই দিতে বস্তাপচা সেই মুসলিম সংখ্যা বৃদ্ধি ও তার নেপথ্য রহস্য অনুপ্রবেশের তত্ত্ব আমদানি করা ছাড়া গতি নেই। দিল্লির সুরে তাল মিলিয়ে এ রাজ্যের কিছু লোক বলছে, বাংলায় দু’কোটি বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশকারী মুসলিম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়বে। এই যে নির্লজ্জ মিথ্যা কথন বা ন্যারেটিভ তৈরি করা হয়েছে, সেগুলো সাধারণ নাগরিক কীভাবে নিচ্ছেন, তা কি মহামান্যরা একবারও ভেবেছেন? বাংলার বীরপুঙ্গবরা সজ্ঞানেই এসব মিথ্যাচার করছেন। কারণ, তারা ভাল করেই জানে, বাংলায় অনুপ্রবেশকারী (মুসলিম) নেই বললেই চলে। তার প্রমাণ পেতে সেন্সাসের শরণাপন্ন হতে হয়।
সেন্সাস রিপোর্ট বলছে, বিগত চার দশকে বাংলার জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার জাতীয় বৃদ্ধির তুলনায় যথেষ্ট কম। ১৯৮১ থেকে ২০১১ পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গের সামগ্রিক জনসংখ্যা ও ধর্মভিত্তিক জনসংখ্যার হার — ১৯৯১: ২৪.৭%, ২০০১: ১৭.৮%, ২০১১: ১৩.৮%। তুলনামূলক বিগত তিনটি সেন্সাসে সামগ্রিক জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কমছে। ধর্ম ভিত্তিক জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ও হিন্দু জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার — ১৯৯১: ২১.১%, ২০০১: ১৪. ২%, ২০১১: ১০.৮%। দেখা গেল গত তিনটে শুমারিতে হিন্দু সংখ্যা বৃদ্ধির হার কমছে।
এবার দেখা যাক মুসলিম জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার — ১৯৯১: ৩৬. ৯%, ২০০১: ২৫.৯%,
২০১১: ২১.৮%। দেখা যাচ্ছে মুসলিমদের সংখ্যাও স্বাভাবিক নিয়মে কমছে। পশ্চিম বাংলার সাথে দেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধির তুল্যমূল্য বিচারে দেখা যাচ্ছে, সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে বৃদ্ধির হার — ১৯৯১: ২২.৭%, ২০০১: ১৯.৯%, ২০১১: ১৬.৮%। সারা দেশে মুসলমান জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার — ১৯৯১: ৩২.৯%, ২০০১: ২৯. ৫%, ২০১১: ২২.৬%। অর্থাৎ এক্ষেত্রেও বাংলার মুসলিম সংখ্যা বৃদ্ধির হার জাতীয় হারের থেকে কম।
সংঘী ও তাদের পোষ্য গদি মিডিয়া যতই অপপ্রচার চালাক, আসল ঘটনা হল, বিগত তিন দশক ধরে দেশের সার্বিক জনসংখ্যা এবং তার সাথে সঙ্গতি রেখে মুসলিম জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার নিম্নগামী। বাংলায় হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার জাতীয় গড়ের থেকে কম। অথচ নিরন্তর বলা হচ্ছে, দু’কোটি বাংলাদেশী ও রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশকারী নাকি অবৈধভাবে এই বাংলায় রয়েছে এবং তারাই রাজ্য তথা দেশের অর্থনীতির অধোগতির জন্য দায়ী। এদের জন্যই বেকারত্ব বেড়েছে, কর্মসংস্থানে এরাই থাবা বসিয়েছে! প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, এরাজ্যে সাকুল্যে মুসলমানের সংখ্যা আড়াই কোটি। তার মধ্যে দু-কোটি বাংলাদেশী ও রোহিঙ্গা হলে এদেশীয় বা পশ্চিমবঙ্গীয় মুসলিম মাত্র ৫০ লক্ষ? ভুলে গেলে চলবে না, অবিভক্ত বাংলায় মুসলিম ছিল ৫৭ শতাংশ। তাহলে তারা কোন গ্রহে চলে গেল!
এপার বাংলা অনুপ্রবেশকারীদের মরুদ্যান হলে আদমশুমারীর সংখ্যাতত্ত্বে তার ছাপ নেই কেন? তাহলে কীভাবে আপনারা ‘চুন চুন কর ঘুসপেটিয়োঁ কো দেশ সে বাহার নিকালেঙ্গে’? এমন আগমার্কা মন্তব্য করে হাততালি কুড়োলেও প্রশ্ন এখানেই। ২০১১-র পূর্বের সেন্সাস রিপোর্ট থেকে ঘুসপেটিয়া বাছাই তো সহজতর হবে। করোনার অজুহাতে ২০২১ সালে সেন্সাস না করার উদ্দেশ্য কি ঘুসপেটিয়া খেলার জন্য? সীমান্ত রক্ষী বাহিনী বিএসএফ তো কেন্দ্রের অধীন। তাহলে পরোক্ষে সীমান্ত রক্ষার ব্যর্থতাকে আলোকিত করলেন মোদি-শাহরা! বাংলায় দু’কোটি অনুপ্রবেশের ভাঁওতা দিয়ে ভোট ভিক্ষা করতে এলে প্রশ্নের মুখে তো পড়তেই হবে যে, বিগত এগারো বছর দেশের প্রহরীদের চোখে ধুলো দিয়ে কীভাবে এত অনুপ্রবেশ ঘটল? চৌকিদার তাহলে কী করছেন? ২০১৪ সালে কেন্দ্রে সরকার গড়ার আগে তো মোদি বলেছিলেন, তিনি ক্ষমতায় এলে সীমান্ত পেরিয়ে একটা ইঁদুরও গলতে দেওয়া হবে না।
(লেখক সাতুলিয়া মাদ্রাসার ধর্মতত্ত্ব বিষয়ের শিক্ষক)








