এবারের শরৎ
গৌতম রায়
নতুন পয়গাম: দেশ রক্ষার্থে সেনার বীরত্বকে একটা বিশেষ ধর্মের প্রতীকের সঙ্গে মিলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে। আমরা নীরব থেকেছি। পাছে ‘রাষ্ট্র’ জেলে ভরে। পাছে ‘ভোট’ চলে যায়। সেই আবেগকে হিন্দু বাঙালির ধর্মীয় আবেগের সঙ্গে ‘পাঞ্চ’ করা হয়েছে। সেই ‘পাঞ্চ’-কে প্রচার দিতেই ‘রাষ্ট্রে’র একটা অংশ প্রত্যক্ষ ভূমিকা পালন করেছে। দাড়িযুক্ত ‘আসুর’-এর সঙ্গে ধর্মীয় আবেগ আবিষ্কার করে বিদ্বেষ ছড়াচ্ছে প্রতিবেশি রাষ্ট্রের অবৈধ ক্ষমতা দখলদারের পিচ্চিরা। এপার বাংলায় মাউথ ক্যানভাসিং হচ্ছে ‘মহম্মদ আলি পার্ক’ নামটির জন্য নাকি ওই পুজোটা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
‘ভবানী পাঠকে’-র আড়ালে উৎসব ঘিরে রাজনৈতিক হিন্দু অস্মিতাকে উসকে দেওয়া হচ্ছে — এমন বাংলা কখনোই দেশভাগের ঘনঘোর অন্ধকার কালেও ছিল না। দুর্গাপুজো ঘিরে উৎসবের ঘনঘটাই ছিল প্রথম এবং প্রধান। আনন্দটাই ছিল সবথেকে উল্লেখযোগ্য উপকরণ। মহিলা মহলে পুজো দেওয়া। পুজোর উপকরণ গোছানো ইত্যাদি ঘিরে একটা কাকুতি ছিল। বারোয়ারি পুজোতে এই আয়োজন ঘিরে তেমন একটা জাতপাতের বালাই ছিল না। যদিও মায়ের ভোগ রান্নায় বামুনদিদিদের ডাক পড়ত। পুরুষদের ভিতরে যুব-তরুণেরা ব্যস্ত থাকত চাঁদা তোলাতেই। ধর্মীয় আয়োজনে সরকারি বদান্যতা তখন কল্পনাই করা যেত না।
দুর্গাপুজোর বারোয়ারীকরণ হিন্দু সমাজে জাতপাতের বেড়া ভাঙার ক্ষেত্রে একটা বড় সামাজিক ভূমিকা পালন করেছিল। এই ভূমিকা পালনের রেওয়াজ অবিভক্ত বাংলার কাল থেকে শুরু হলেও সেই সময়ে দুই বাংলাতেই সমাজ নিয়ন্ত্রণে ধনী উচ্চবর্ণের হিন্দুদের যে একাধিপত্য ছিল, তাতে সামাজিক মেলামেশার অঙ্গনটি খুব পরিপূর্ণভাবে বিকাশ লাভ করতে পারেনি। দেশভাগ বহু নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি করলেও বেঁচে থাকার তাগিদকে সামনে তুলে আনতে হিন্দু সমাজে জাতপাতের বেড়াকে কিছুটা ভাঙতে পেরেছিল। বারোয়ারি দুর্গাপুজো, এপার বাংলায় তার চল দেশভাগের আগে ছিল। বস্তুত বারোইয়ারি দুর্গাপুজোর চল এবার বাংলার হুগলী জেলাতেই। সেই বারোইয়ারিই ক্রমে অপভ্রংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে বারোয়ারিতে।
এই বারোয়ারির ভাবনা এবং প্রসার বাঙালি হিন্দু সমাজের মধ্যে বিদ্বেষ-বিষ নাশের ক্ষেত্রে একটা বড় সময় ধরে বিশেষ ইতিবাচক ভূমিকা পালন করেছিল। কিন্তু ডিকেন্স খুড়ো যে ‘সময়’-কে দুই নগরীর আখ্যান রচনা করেছিলেন, সেখানে বড় ‘মারাত্মক’ আপ্তবাক্য এই ঠাকুরনকে ঘিরে বলেছিলেন। ‘সময়ে’-র জেরে বারোইয়ারির ইয়ার দোস্তেরা এখন ক্রমেই উৎসবকে একটা প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের ছোট্ট কোনে আটকে রাখতে উঠে পড়ে লেগেছে, যাতে বারো ইয়ারের, অর্থাৎ; জাতি, ধর্ম, বর্ণ, ভাষা, লিঙ্গ নির্বিশেষে ‘উৎসবে’-র আনন্দটা ক্রমে ‘শবের উপর শামিয়ানা’য় পর্যবসিত হয়।
রাজনৈতিক প্রেক্ষিত বদলের সঙ্গে উৎসবের প্রেক্ষিতটা যে বদলে যাচ্ছে অদৃশ্য হাতের দৌলতে — এটা আমরা বুঝেও যেন ঠিক বুঝে উঠতে চাইছিলাম না। ধর্ম পালন, ধর্মের আচার নিষ্ঠা এইসবের সঙ্গে শরৎকালের সম্পর্কটা ক্রমেই কমতে শুরু করেছে বেশ কয়েক বছর ধরে। সেই জায়গায় ঠাঁই করে নিতে শুরু করেছে দলীয় রাজনীতির ভাবনার সংমিশ্রণ। এই মিশেল ধীরে ধীরে উৎসবকে সর্বজনীন রূপ থেকে বিচ্ছিন্ন করে, তাকে দলীয় রাজনীতির সঙ্কীর্ণ কৌণিক বিন্দুতে এনে দাঁড় করাচ্ছে। বদলে যাচ্ছে উৎসবের আঙিনা। পাল্টে যাচ্ছে উৎসব পালনের আঙ্গিক।
রাজ্য সরকার বেশ কিছুদিন ধরে দুর্গাপুজোর জন্য সরকারি কোষাগার থেকে টাকা নিচ্ছেন। টাকার পরিমাণ প্রায় প্রতি বছরই বাড়ছে। তার সঙ্গে রয়েছে বিদ্যুৎ ব্যবহারের ক্ষেত্রে নানা রকমের ছাড়। ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধানের নামে শপথ নেওয়া কোনও সরকার একটি বিশেষ ধর্মের পূজার্চনার জন্য সরকারি কোষাগারের টাকা খরচ করতে পারেন না। এইভাবে একটা নির্দিষ্ট ধর্মের পুজোতে সরকারি কোষাগার থেকে টাকা খরচের সংস্থান কোনও অবস্থাতেই সরকারি আইন-কানুনে নেই। এভাবে কোনও ধর্মের জন্য সরকারি টাকা খরচ মানে সম্পূর্ণভাবে সংবিধান অবমাননা।
কিন্তু কে শোনে কার কথা? আইন-কানুনের তোয়াক্কা না করাই তো এখন আইনের রক্ষকদের কাছে ক্রমে একটা অবশ্য করণীয় কর্তব্যে পরিণত হয়েছে। তাই জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে নাগরিকের করের টাকা খয়রাতি দেওয়া হচ্ছে একটা বিশেষ ধর্মের ধর্মাচারণে। বিনিময়ে পুজো মন্ডপগুলিতে মুখ্যমন্ত্রীর ছবি, তাঁর সরকারের গুণকীর্তন প্রদর্শন হয়েছে বাধ্যতামূলক। দর্শকের কাছে এখন প্রতিমা দেখার মতো প্রায় বাধ্যতামূলক হয়ে উঠেছে মন্ডপে মন্ডপে মুখ্যমন্ত্রীর ছবি দেখা। অবশ্য কর্তব্য হয়ে উঠেছে তাঁর সরকারের গুণকীর্তন দেখা বা শোনার আড়ালে তাঁর দলের প্রচার দেখতে বা শুনতে বাধ্য হওয়া।
শাসকের এই ছবির জল-ছবি সমাজজীবনের একটা বড় অংশকে ঠেলে দিচ্ছে মাৎস্যন্যায়ের দিকে। পুলিশের সব বুঝেও কিছু করবার নেই। হয় তাকে চোখ বুজে থাকতে হবে। নয়ত শাসকের চটুকারিতার ঢপের দলের সখের কীর্তনিয়া হতে হবে। কোনওটার একটা পথ না ধরতে পারলে পদোন্নতি কোন ছাড়, চাকরি বাঁচানো দায় হয়ে পড়বে। অগত্যা বলি হতে হলে হাঁড়িকাঠে তো মাথা দিয়ে বসেই আছে জনগণ! অপরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা। সরু-সংকীর্ণ গলি। একটাই যাতায়াতের রাস্তা। ফেসবুকে প্রচারের জেরে ঘণ্টায় সেই সরু, আঁকাবাঁকা গলি, যার আশপাশে প্রবল জনবসতিপূর্ণ বস্তি, সেই গলি দিয়ে যাতায়াত করছে ষাট হাজারেরও বেশি মানুষ।
অতএব যা হওয়ার তাই ঘটে গেল। ভিড়ের চাপে পদপিষ্ট হয়ে মৃত্যু। পুলিশ কী করবে? অসহায় তাঁরা। যদি অনুমতি তাঁরা না দিতেন, শাসকের লোকজনেরা তাঁদের মুন্ডপাত করত। অথচ মৃত্যুর দায়, যার মূল কারণ অপরিকল্পিত আয়োজন, সেটা কিন্তু বর্তেছে পুলিশের উপর। দায় নিতে রাজি নয় আয়োজক। শাসক তো নয়ই।
আবার দেশের সুরক্ষার প্রশ্নে হিন্দু ভাবাবেগকে গায়ের জোরে যুক্ত করে দিয়ে যে দেশপ্রেমের নামে উগ্রতা ছড়াতে চাইছে হিন্দু সাম্প্রদায়িক শক্তি, সেই আবেগকে তাদের শাগরিদেরা যুক্ত করছে শারদোৎসবের সঙ্গে। সাম্প্রদায়িক শক্তির এই অপচেষ্টাকে তাচ্ছিল্য করাই ছিল বুদ্ধিমানের কাজ। কিন্তু সেপথে হাঁটতে কেন পারল না রাজ্যের পুলিশ? পুলিশ নির্বোধ — একথা তো কখনোই বলা যায় না। তাহলে?
পুলিশ কি নাগরিক স্বার্থ সুরক্ষিত করতে স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে না? যদি পারত, তাহলে কি সন্তোষ মিত্র স্কোয়ারের দুর্গাপুজো ঘিরে হিন্দু সাম্প্রদায়িকদের পাতা ফাঁদে আদৌ পা দিত? আর পুলিশ যদি নানা আইনি কথা বলে ওভাবে অহেতুক প্রচার সন্তোষ মিত্র স্কোয়ারের পুজোকে না দিত, তাহলে কি শারদোৎসবের সঙ্গে এক বিশেষ রাজনৈতিক দলের হিন্দু সাম্প্রদায়িক অভিপ্রায় ওভাবে যুক্ত হয়ে সাধারণ মানুষের একাংশকে খানিকটা হলেও প্রভাবিত করতে পারত?








