দক্ষিণ এশিয়ায় গণতন্ত্রের অস্থিরতা জনগণের আকাঙ্ক্ষা ও রাষ্ট্রের দায়
জানে আলম
নতুন পয়গাম, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৫
দক্ষিণ এশিয়া আজ এক জটিল সময় পার করছে। জাপান, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ, নেপাল-সহ আরও কয়েকটি দেশ সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা, নির্বাচিত সরকারের পতন কিংবা গণআন্দোলনের মুখোমুখি হয়েছে। ঘটনাগুলোর প্রকৃতি আলাদা হলেও মূল সুর এক — জনগণের আস্থা হারাচ্ছে রাষ্ট্রক্ষমতা।
সরকারগুলো ভেঙে পড়ছে কেন: দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি প্রতিটি দেশের জন্য দীর্ঘস্থায়ী ব্যাধি হয়ে দাঁড়িয়েছে। জনগণ দেখতে পাচ্ছে, নির্বাচিত নেতারা ক্ষমতায় এসে নিজেদের সুবিধা নিশ্চিত করছেন, অথচ সাধারণ মানুষের মৌলিক সমস্যা রয়ে যাচ্ছে অমীমাংসিত। অর্থনৈতিক সংকট পরিস্থিতিকে আরও ঘনীভূত করছে। শ্রীলঙ্কায় বৈদেশিক ঋণ, খাদ্যাভাব ও জ্বালানি ঘাটতি সরাসরি সরকারের পতন ডেকে এনেছে। পাকিস্তান বারবার আর্থিক স্থবিরতায় পড়ে রাজনৈতিক সংকটে নিমজ্জিত হচ্ছে। নেপালে প্রায় প্রতিবছর সরকার বদল হলেও জনগণ উন্নয়নের স্বাদ পাচ্ছে না। জাপানে সরাসরি সরকার পতন না হলেও ভোক্তা কর ও মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে জনগণের চাপ ক্রমেই বাড়ছে। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্বলতাও স্পষ্ট। আদালত, নির্বাচন কমিশন, সংসদ ইত্যাদি প্রতিষ্ঠান স্বাধীনভাবে কাজ করতে না পারলে জনগণের আস্থা টেকে না। বাংলাদেশে নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে বিতর্ক ও বিরোধী কণ্ঠ দমনের অভিযোগ এই আস্থাহীনতাকে আরও বাড়িয়েছে।
জনগণ কী চাইছে: স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা: জনগণ সৎ ও দায়িত্বশীল নেতৃত্ব প্রত্যাশা করছে। অর্থনৈতিক নিরাপত্তা: খাদ্য, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও কর্মসংস্থান নিশ্চিত হোক। গণতান্ত্রিক অধিকার: মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, ন্যায়বিচার এবং অংশগ্রহণমূলক রাজনীতি। রাস্তায় নেমে জনগণ বলছে, “আমরা শুধু ভোট চাই না, সত্যিকারের গণতন্ত্র চাই।”
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট: দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক অস্থিরতা এককভাবে দেশীয় কারণেই সীমাবদ্ধ নয়। বৈশ্বিক শক্তিগুলোও সরাসরি প্রভাব ফেলছে। পাকিস্তানে সেনাবাহিনী ও আন্তর্জাতিক কূটনীতির অঘোষিত আঁতাত রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে দিচ্ছে। শ্রীলঙ্কায় চীনের ঋণ কূটনীতি অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের একটি বড় কারণ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, সৌদি আরব ও চীন প্রত্যেকে এই অঞ্চলে নিজেদের প্রভাব বিস্তার করতে চাইছে, যা স্থানীয় সমস্যাকে আরও জটিল করছে।
নেপাল: চলতি সেপ্টেম্বর মাসে সরকার ২৬টি সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয়। এর ফলে তরুণ প্রজন্ম, বিশেষত Gen-Z অসন্তোষে ফেটে পড়ে। দুর্নীতি, বেকারত্ব ও ন্যায়বিচারহীনতার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে, সরকারি ভবনে অগ্নিসংযোগ হয়, প্রাণহানি ঘটে। অবশেষে প্রধানমন্ত্রী কে.পি শর্মা ওলি-সহ অনেক মন্ত্রী পদত্যাগ বাধ্য হন এবং অনেকে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান। সংসদ ভেঙে দেওয়া হয়।
জাপান: ভোক্তা কর কমানোর প্রশ্নে সরকার ও বিরোধীপক্ষের মধ্যে দ্বন্দ্ব তীব্র হচ্ছে। খাদ্য ও জরুরি পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ নাগরিককে চাপে ফেলছে। যদিও সরকার এখনও টিকে আছে, তবুও জনগণের ক্ষোভ রাজনীতিতে চাপ বাড়াচ্ছে।
পাকিস্তান: রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও সেনাবাহিনীর দ্বন্দ্ব, দুর্বল অর্থনীতি ও বৈদেশিক ঋণ দেশটিকে বারবার রাজনৈতিক অস্থিরতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। নির্বাচিত সরকারগুলো টেকসই হতে পারছে না।
বাংলাদেশ: নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিতর্ক, বিরোধী দলের উপর দমন-পীড়ন ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্বলতা জনগণের আস্থা কমিয়ে দিচ্ছে।
শ্রীলঙ্কা: বৈদেশিক ঋণ, খাদ্য ও জ্বালানি সংকট, এবং জনরোষ ২০২২ সালে সরাসরি সরকার পতন ঘটিয়েছে। আজও দেশটি অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে সংগ্রাম করছে।
ভারত ও চীনের জন্য শিক্ষা: ভারত বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণতন্ত্র। কিন্তু দুর্নীতি, ধর্মীয় মেরুকরণ বা প্রতিষ্ঠান দুর্বল হলে ভারতও একই ধরনের সংকটে পড়তে পারে। চীন যদিও গণতন্ত্র নয়, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দিয়ে জনগণের আস্থা ধরে রেখেছে। তবে বেকারত্ব ও অর্থনৈতিক বৈষম্য বেড়ে গেলে সেখানেও অস্থিরতা তৈরি হতে পারে।
আরব বিশ্বের প্রেক্ষাপট: আরব দেশগুলোতে গণতন্ত্র নেই, কিন্তু তেলনির্ভর অর্থনীতি আপাতত স্থিতিশীলতা এনে দিয়েছে। তবে তেলের বাজার ভেঙে পড়লে সেখানেও জনগণ গণতন্ত্রের দাবি আরও জোরালো করবে।
সমাধানের পথ: স্বচ্ছ নির্বাচন ও শক্তিশালী গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, অর্থনৈতিক সংস্কার ও দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, আন্তর্জাতিক ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি, জনগণের কণ্ঠস্বর শোনা ও নীতি প্রণয়নে অংশগ্রহণ সুনিশ্চিত করা।
দক্ষিণ এশিয়ার বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্বকে শিখিয়ে দিচ্ছে — গণতন্ত্র কেবল নির্বাচন নয়; বরং জবাবদিহিতা, অংশগ্রহণ ও ন্যায়বিচারের উপর দাঁড়িয়ে থাকে। নেপালের Gen-Z আন্দোলন প্রমাণ করেছে, তরুণ প্রজন্ম তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে গণতন্ত্রের দাবিতে এগিয়ে আসছে। জাপানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ দেখাচ্ছে, অর্থনৈতিক ন্যায়বিচারও গণতন্ত্রের ভিত্তি। ভারতের মতো বৃহৎ ও বহুদলীয় গণতন্ত্রের জন্য স্পষ্ট সতর্কবার্তা হল, জনগণকে অবহেলা করা যাবে না। আর বিশ্বের কাছে বার্তা একটাই, কোনও রাষ্ট্রই জনগণের কণ্ঠস্বর দীর্ঘকাল দমন করতে পারে না।








