শিক্ষার ভবিষ্যৎ কি চায়ের কাপে?
মাফিকুল ইসলাম
একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় কল্পনা করুন, যেখানে একজন শিক্ষক পাঁচটি শ্রেণির পড়াশোনা সামলান, ক্লাস টু-এর গণিত বোঝাতে বোঝাতে ক্লাস ফোর-এর বাংলা খাতা খতিয়ে দেখছেন, আর ক্লাস ফাইভ-এর পড়ুয়াদের পরীক্ষার খাতা হাতে তুলে দিচ্ছেন। আরও ভয়াবহ হল, এর থেকেও শতগুণ ভয়ংকর বাস্তব, একজনও শিক্ষক নেই, এমন হাজার হাজার স্কুল! শিক্ষা ভবনের সাম্প্রতিক সমীক্ষা অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গের ২১,২১৫টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শূন্য বা মাত্র একজন শিক্ষক রয়েছেন। এর অর্থ দাঁড়াচ্ছে, লক্ষ লক্ষ শিশু আজ প্রাথমিক শিক্ষার মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। অথচ ২০০৯ সালের রাইট টু এডুকেশন (আরটিই) আইন স্পষ্টভাবে বলছে, প্রতিটি স্কুলে শিক্ষক-ছাত্র অনুপাত মেনে অন্তত দুই থেকে তিনজন শিক্ষক থাকা আবশ্যক। বাস্তব চিত্রটি শুধু এই আইনের লঙ্ঘন নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে অন্ধকারে ঠেলে দেওয়ার এক নির্মম উদাহরণ।
এমন এক সময়ে যখন হাজার হাজার টেট-উত্তীর্ণ দীর্ঘদিন ধরে নিয়োগের অপেক্ষায়, তখন সরকার আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতায় সবকিছু আটকে রেখেছে। মুখ্যমন্ত্রী নিজেই এই সংকট নিরসনে সুদূরপ্রসারী পদক্ষেপের বদলে শিক্ষিত যুবকদের চা, তেলেভাজা, ঘুগনি ইত্যাদির দোকান খোলার পরামর্শ দিয়ে বিতর্ক উসকে দেন। প্রশ্ন জাগে যখন বিদ্যালয়ে শিক্ষক নেই, তখন যুবকদের চায়ের দোকানে পাঠিয়ে আসলে কাকে শিক্ষার দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে? আমাদের শিশুদের ভবিষ্যৎ কি চায়ের কাপে ডুবে যাবে?
শুধু শিক্ষক সংকট নয়, রাজ্যের শিক্ষাব্যবস্থা আজ বহুস্তরে ভাঙনের মুখে। একদিকে কয়েক হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয় বন্ধ, অন্যদিকে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকে পরীক্ষার্থী সংখ্যা হ্রাসের প্রবণতা ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, প্রায় ৭০ হাজার ছাত্র স্কুলছুট। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কন্যাশ্রী প্রকল্পের রাজনৈতিক অপব্যবহার, স্থানীয় শিল্পের পতন এবং চাকরির বাজারে ভয়াবহ মন্দা। ফলত, শিক্ষা থেকে শুরু করে কর্মসংস্থান, সবকিছুতেই অন্ধকার ঘনিয়ে আসছে।
সংকট কতটা তীব্র, সরকারের প্রতিক্রিয়া কতটা অপ্রতুল এবং ব্যবহারিকভাবে এসব সমস্যার সমাধান কী হতে পারে। কারণ, প্রশ্নটা কেবল ২১ হাজার স্কুলের নয়, প্রশ্নটা রাজ্যের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে অজ্ঞতা ও বেকারত্বের ফাঁদ থেকে রক্ষা করার।
আইন অনুযায়ী, প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত প্রাথমিক স্কুলে ৩০ জন ছাত্র পড়াশোনা করলে অন্তত এক জন শিক্ষক থাকা আবশ্যক। কিন্তু, সেই প্রয়োজনের সঙ্গে বাস্তবের ব্যবধান অনেকটাই বেড়েছে। শিক্ষা ভবনের সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুযায়ী, রাজ্যে ২১,২১৫টি প্রাথমিক স্কুলে শূন্য বা মাত্র একজন শিক্ষক রয়েছেন। পূর্ব মেদিনীপুরে ২২৭, বাঁকুড়ায় ৩৭১, বীরভূমে ১৫৫, পুরুলিয়ায় ৩৭২, প্রতিটি জেলার পরিসংখ্যানই এক একটি ধাক্কা। বাস্তবে এর মানে দাঁড়াচ্ছে, লক্ষাধিক শিশু প্রাথমিক শিক্ষার মৌলিক অধিকার হারাচ্ছে, যা আরটিই আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন।
সমস্যার মূল জড়িয়ে আছে শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ায়। বহু বছর ধরে টেট পরীক্ষা, আদালতের মামলা আর প্রশাসনিক অদক্ষতার কারণে কয়েক হাজার টেট উত্তীর্ণ বেকার হয়ে বসে আছেন। অথচ বিদ্যালয়ে শিক্ষক নেই, ক্লাসরুম ফাঁকা। শিক্ষক শূন্যপদ আজ শুধু প্রাথমিক স্তরেই নয়, সার্বিকভাবে রাজ্যে ১,১০,০০০-এরও বেশি পদ খালি। ফলে শিক্ষা কার্যত ভেঙে পড়ছে।
এই সংকট মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরেও সমান ভয়াবহ। একদিকে পরীক্ষার্থীর সংখ্যা দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে, ২০০৮ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় প্রার্থীর সংখ্যা লক্ষাধিক কম। অন্যদিকে সার্বিকভাবে স্কুলছুট প্রবণতা চোখে পড়ার মতো। গত দুই বছরে শুধু মাধ্যমিক স্তরে প্রায় ৭০ হাজার ছাত্র স্কুলছুট হয়েছে। আরও ভয়াবহ তথ্য হল, রাজ্যের ৩,২৪৫টি স্কুলে একজনও পড়ুয়া নেই।
প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার চিত্রটা আরও হতাশাজনক। ২০১২ সালে রাজ্যে যেখানে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ছিল ৭৪,৭১৭টি; চলতি ২০২৫ সালে হয়েছে মাত্র ৪৯,৩৭৫। অর্থাৎ এক দশকে ২৫ হাজারেরও বেশি স্কুল বন্ধ হয়ে গেছে। অথচ একই সময়ে প্রতি বছর অজস্র মদের দোকান খোলা হয়েছে রাজ্যে। মদের দোকান বাড়ছে, স্কুল কমছে, এ যেন এক ভয়াবহ রাষ্ট্রনীতির নির্মম প্রতিচ্ছবি, যেখানে ভবিষ্যতের নাগরিক তৈরির চেয়ে রাজস্ব বাড়ানোই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
শিক্ষাক্ষেত্রের এই ভয়াবহ সংকট শুধু সংখ্যার খেলা নয়; বরং একটি প্রজন্মকে অন্ধকারে ঠেলে দেওয়ার নামান্তর। শিক্ষকহীন ক্লাসরুম, খালি স্কুল-ঘর, আর হতাশ যুবকদের দীর্ঘ বেকারত্ব, এই ছবি শুধু শিক্ষা ব্যবস্থার ভাঙন নয়, গোটা সমাজের পতনের ইঙ্গিত।
রাজ্যের শিক্ষিত যুবকদের ভবিষ্যৎ নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী যে চা, তেলেভাজা কিংবা মুড়ি-ঘুগনির দোকান খোলার পরামর্শ দিয়েছেন, তা বাস্তবতার সঙ্গে যেন কল্পনার এক নির্মম তফাতকে ফুটিয়ে তোলে। অথচ রাজ্যের শিল্প ক্ষেত্রগুলো একে একে ধসে পড়ছে, মালদা ও মুর্শিদাবাদের রেশম শিল্প, দিনাজপুরের ভুট্টা চাষ, দক্ষিণবঙ্গের পোশাক শিল্পের পতন এই বাস্তবতার দৃশ্য। ২০১৬ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে রাজ্যে ২১,৫২১টি শিল্প প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে, যার মধ্যে ২৭১টি ছিল বড় শিল্প। এ সবের মধ্যে গ্লোবাল বিজনেস সামিটে জাঁকজমকপূর্ণ প্রদর্শনীর চমক মানুষকে প্রতি বছর মায়াজালে ফেলে, কিন্তু বাস্তবে রাজ্যে কোনো বিনিয়োগ আসে না। আর সরকারি ঋণ ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। ২০১১ সালে ১.৯৭ লক্ষ কোটি থেকে ২০২৪-এ পৌঁছেছে ৬.৫ লক্ষ কোটিতে, যা প্রমাণ করে অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানে সরকারের ব্যর্থতা কেবল রূপকথার গল্প নয়, বাস্তবতাই প্রতিফলিত হচ্ছে।
শিক্ষাক্ষেত্রে সরকারের দেড় দশকের ব্যর্থতা এবার স্পষ্টভাবে সমাজে তার ক্ষতিকর প্রভাব দেখাচ্ছে। শিক্ষা ব্যবস্থার বেহাল দশায় হতাশা, আশাহীনতা আর শূন্য সম্ভাবনার মধ্যে পড়ে বহু ছাত্রছাত্রী ভিনরাজ্যে পরিযায়ী শ্রমিক হিসেবে পাড়ি জমাচ্ছে, সেই সাথে শিশু শ্রমের ঝুঁকিও বাড়ছে। সরকার মদ বিক্রির আয় দিয়ে রাজস্ব সংগ্রহের চেষ্টা করলেও, তা শিক্ষার মান উন্নয়ন ও শিল্প পুনরুজ্জীবনের জন্য কাজে লাগানো হচ্ছে না। ফলে শিক্ষিত, কর্মক্ষম যুবসমাজ হতাশ, সমাজে সামগ্রিক অস্থিরতা বাড়ছে এবং ভবিষ্যত উন্নয়নের সম্ভাবনাকে স্তিমিত করছে।
২১,২১৫টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক অভাব এবং ২৫,৩৪২টি স্কুলের বন্ধ থাকা একটিমাত্র পরিসংখ্যান নয়, এটি রাজ্যের শিক্ষার অন্ধকার ভবিষ্যতের প্রতিচ্ছবি। যে রাজ্যে শিক্ষার আলো নিভে যাচ্ছে, সেই রাজ্যের ভবিষ্যৎ কে উজ্জ্বল করবে? এ প্রশ্ন আজ সবার মনে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করছে। সমাধান আছে, কিন্তু তা গ্রহণের রাজনৈতিক সদিচ্ছা দরকার। অবিলম্বে শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছভাবে সম্পন্ন করা, ছোট ও মাঝারি শিল্পে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা নিশ্চিত করা, গ্রামীণ অর্থনীতিতে ফুড প্রসেসিং, টেক্সটাইল ও কৃষি-ভিত্তিক শিল্প গড়ে তোলা এবং শিক্ষায় বাজেট বরাদ্দ বাড়িয়ে স্কুল তথা শিক্ষায় পরিকাঠামো পুনর্গঠন – এসব পদক্ষেপই শিক্ষার আলো ফিরিয়ে আনতে পারে। শিক্ষার্থীর চোখে নতুন আশা জাগাতে এবং রাজ্যের ভবিষ্যৎকে সত্যিকারের সমৃদ্ধির দিকে পরিচালিত করতে এখনই সময়।








