পাঠ্যপুস্তকে ইতিহাস বিকৃতির কারণ বিদ্বেষ-বিষ
ড. রাম পুনিয়ানি:যুক্তিকে ধ্বংসের ভয়ানক প্রক্রিয়া বর্তমান সময়ের সমাজ ও রাজনীতির উপর বিশেষ প্রভাব ফেলেছে। কেন্দ্র সরকার নতুন জাতীয় শিক্ষানীতি চালু করেছে। হিন্দুত্ববাদের সুবিধা করে দেওয়ার লক্ষ্যে বিকৃতি ঘটানো হচ্ছে পাঠক্রমে। এছাড়াও সার্বিকভাবে প্রচার করা হচ্ছে অসত্য ও বিশেষ সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি। ফলে কীভাবে সত্যের বিকৃতি ঘটছে, তা ইতিহাসের একটি বড় বিষয়। অতীতেও ইতিহাসের বিকৃতি ঘটেছে, তবে বর্তমান সময়ে এই চেষ্টা ব্যাপক এবং ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত।
কিছুদিন আগেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী সোমনাথ মন্দির বিষয়ে কিছু কথা বলেন। তিনি বলেন, মাহমুদ গজনি সোমনাথ মন্দিরে লুটপাট চালায় এবং মন্দিরটি ধ্বংস করার চেষ্টা করে। সুতরাং মামুদ গাজনি হিন্দু ধর্মের অবমাননা করেছে। অর্থাৎ ইতিহাসের ওই ঘটনাটি ইসলামের হাতে হিন্দু ধর্মের আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা। কিন্তু মামুদ গজনি মধ্য এশিয়া থেকে সোমনাথ মন্দিরে এসে হিন্দুদের অপমান করতে চেয়েছেন — এমন ব্যাখ্যা দেওয়া হচ্ছে। বলা হচ্ছে, মামুদ গাজনি একজন আদর্শ মুসলিম ছিলেন এবং সেই কারণেই তিনি ইসলাম ধর্ম মোতাবেক পুণ্য অর্জনের জন্য হিন্দু মূর্তি ধ্বংস করেন। প্রচারিত ধারণাটি এরকম যে, জান্নাতে যাওয়ার বাসনাতেই তিনি মূর্তিপূজার বিরুদ্ধাচরণ করেছেন। এটাই প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের উদ্দেশ্য!
এমন ব্যাখ্যাকে যুক্তি দিয়ে বিচার করে দেখা যাক। মামুদ মধ্য এশিয়ার মানুষ। যদি হিন্দু ধর্মের ভগবানের মূর্তি ধ্বংস করাই তাঁর আসল উদ্দেশ্য হত, তাহলে মধ্য এশিয়ার গজনি অর্থাৎ আফগানিস্তান থেকে সোমনাথ মন্দিরে আসার কি প্রয়োজন পড়ত? উনি তো রাস্তার দু-ধারে কিছু মন্দির ধ্বংস করলেই জান্নাত বা স্বর্গ লাভের উপযুক্ত পুণ্য অর্জন করতে পারেতন। এতদূর আসার প্রয়োজন হত কি? আসলে তিনি সোমনাথ মন্দিরে এসেছিলেন, কারণ সোমনাথ মন্দিরের সম্পদের উপর গজনির তীব্র লালসা ছিল। উনি সেই ধন-সম্পদকে লুট করতে চেয়েছিলেন। বিভিন্ন তথ্য থেকে জানা যায়, ওই সময় প্রায় কুড়ি হাজার সোনার দিনারের সমতুল্য সম্পদ ছিল সোমনাথ মন্দিরে।
এবার যদি আমরা রাজা মামুদ গাজনির বিষয়ে জানার চেষ্টা করি, তাহলে দেখা যাবে ওনার বারো জন সেনাপতি ছিলেন। তাঁদের মধ্যে পাঁচ জন ছিলেন হিন্দু, সাতজন মুসলিম। সুতরাং, এটা বলাই যায় যে, তাঁর সেনাবাহিনীতে হিন্দু ও মুসলমান উভয় ধর্মের মানুষই ছিলেন। তাহলে সোমনাথ মন্দিরে যে ধ্বংসলীলা চলেছিল, তাতে কি শুধু মুসলমানরাই শামিল ছিল, নাকি হিন্দুরাও শামিল ছিল? প্রকৃতপক্ষে ধর্মের জন্য, নাকি ধন-সম্পদের লোভ ছিল সোমনাথ মন্দির ধ্বংস করার কারণ?
তর্কের খাতিয়ে যদি ধরেও নেওয়া হয়, মামুদ গজনবি শুধুমাত্র ধর্মের জন্যই সোমনাথ মন্দির ধ্বংস করেছিলেন, তাহলেও কি বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে এ নিয়ে হিংসা বিদ্বেষ ছড়ানো বা দাঙ্গা উচিত? ইতিহাসে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনার বদলা কি বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে নেওয়া যায়? এমন ইচ্ছা প্রকাশ কি উচিত কাজ?
যখন রাষ্ট্রের শীর্ষ পদে আসীন কেউ ইতিহাসের বদলা নেওয়ার কথা বলেন, তখন তা সমাজের জন্য ভয়ের কারণ হয়ে ওঠে। গণতন্ত্রে একটি সহজ কথা প্রচলিত আছে, ‘অপরাধীকে সাজা দাও এবং নির্দোষকে রক্ষা কর।’ কিন্তু বর্তমান ভারতে ইতিহাসকে বিকৃতভাবে ব্যবহার করার মধ্য দিয়ে সমাজের মধ্যে মানুষের মধ্যে হিংসা বা দ্বেষভাব ছড়ানো হচ্ছে, যার একটি উদাহরণ হল সোমনাথ মন্দিরের ঘটনা।
আরেকটি ঘটনা হল আকবর ও মহারানা প্রতাপের মধ্যে হওয়া হলদিঘাটের যুদ্ধ। এটা কখনোই হিন্দু বনাম মুসলিমের দ্বন্দ্ব ছিল না। ওই সময় যুদ্ধক্ষেত্রে একদিকে রানা প্রতাপের সেনাবাহিনী এবং অন্যদিকে মোঘল সেনাবাহিনী মুখোমুখি থাকলেও সেই বাহিনীতে আকবর স্বয়ং উপস্থিত ছিলেন না। আকবরের বদলে সেই সময় তাঁর সেনাদের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন রাজা মান সিং। তাহলে বলুন, আকবরের সেনাবাহিনীতে শুধুমাত্র মুসলমান, নাকি হিন্দু-মুসলমান উভয় ধর্মের মানুষই ছিলেন?
উল্টোদিকে মহারানা প্রতাপ নিজের ঘোড়া চেতক-এর ওপর বসে সেনাবাহিনীকে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। তাঁরও দু’জন মহাশক্তিশালী সেনাপতি ছিলেন। তার মধ্যে একজনের নাম রাম সিং এবং অপরজন হাকিম খান সুরি। তাহলে, রানা প্রতাপের সেনাবাহিনীতে শুধু হিন্দু নাকি হিন্দু মুসলমান উভয় ধর্মের মানুষ ছিলেন? যদি দুই সেনাবাহিনীতেই হিন্দু-মুসলিম উভয় ধর্মের মানুষ থেকে থাকেন, তাহলে তাকে কি হিন্দু-মুসলিম লড়াই বলা যায়? নাকি এই লড়াই রাজার বিরুদ্ধে রাজার? এই যুদ্ধ শুধুমাত্র ধর্মের জন্য ছিল, নাকি রাজত্বের জন্য? বর্তমানে হলদিঘাটের যুদ্ধের ইতিহাসকে বিকৃত করে মানুষের মধ্যে হিংসা বিদ্বেষ ছড়ানোর চেষ্টা হচ্ছে।
মহারাষ্ট্রের খুবই শক্তিশালী রাজা ছিলেন ছত্রপতি শিবাজী। তিনি নিজে রাজ্যে বিস্তার ঘটাচ্ছিলেন। ছত্রপতি শিবাজীর বাবা কোনও মহারাজা ছিলেন না। এই রাজ্যবিস্তার ঘটানোর সময় প্রথমেই এক হিন্দু রাজা চন্দ্ররাও মোরের উপর তিনি আক্রমণ করেন। এবং সেখান থেকেই সম্পত্তি অধিকার করে তিনি তার সেনাবাহিনীকে মজবুত করেন। এরপর তিনি এক একটি জায়গায় গিয়ে রাজ্যগুলির উপর নিজের আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করতেন। সেই সময় শিবাজীর এহেন রাজ্য বিস্তার দেখে বিজাপুরের রাজা আদিল শাহ নিজের রাজ্য রক্ষা নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়লেন। তখন তিনি নিজের এক শক্তিশালী সেনাপতিকে পাঠালেন শিবাজীকে হারানোর জন্য। সেই সেনাপতি হলেন আফজল খাঁ।
তিনি প্রথমেই শিবাজীকে সন্ধি প্রস্তাব পাঠান এবং সেখানে একটি শর্তের উল্লেখ করেন। সেই শর্তে বলা হয়, শিবাজী যখন আসবেন, তিনি কোন হাতিয়ার নিয়ে আসতে পারবেন না। শিবাজী সেই সমঝোতা প্রস্তাবে রাজি হয়ে কোন অস্ত্র না নিয়ে আফজল খাঁর সাথে দেখা করতে যাচ্ছিলেন। সেই সময় তাঁর এক সেনা গুপ্তঅস্ত্র ‘বাঘনখ’ সঙ্গে রাখার পরামর্শ দেন শিবাজীকে। ওই সেনার নাম ছিল রুস্তমের জামান। তিনি একজন মুসলমান ছিলেন। এরপর শিবাজি যখন গেলে আফজাল খাঁ তার ওপর আক্রমণ করেন এবং শিবাজী সেই গুপ্ত অস্ত্র বাঘনখ দিয়েই আফজল খাঁকে প্রতিহত করেন। আফজল খাঁ মারা গেলে তাঁর এক সেনাপতি তরোয়াল নিয়ে শিবাজীর ওপর আক্রমণের চেষ্টা করেন। সেই সেনাপতির নাম ছিল কৃষ্ণজি ভাস্কর কুলকার্নি। তিনি ছিলেন হিন্দু। সুতরাং এটা হিন্দু বনাম মুসলমানের যুদ্ধ, নাকি এক রাজার বিরুদ্ধে আরেক রাজার যুদ্ধ?
রাজায় রাজায় সংঘটিত যুদ্ধকে ধর্মের রং দেওয়া হয়েছে পরবর্তীকালে। সর্বপ্রথম এই কাজ করে ইংরেজ ইতিহাসবিদরা। ভারতের ইতিহাসকে বিভিন্ন রকম দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখা হয়েছে। মহাত্মা গান্ধী তার ‘হিন্দু স্বরাজ’ বইতে লিখেছেন, ভারতবর্ষে হিন্দু-মুসলমান একসঙ্গে মিলেমিশে থাকে। মহাত্মা গান্ধীর যোগ্য শিষ্য জহরলাল নেহরুও বলেছেন, ভারতবর্ষে যখনই কোন নতুন ধর্ম বা সম্প্রদায়ের মানুষ এসেছেন, তাঁরা আগে থেকে বসবাসকারী সম্প্রদায়ের মানুষের উপর কোন রকম আঘাত না করে মিলেমিশে একসঙ্গে থেকেছে। তারা এক সঙ্গে থেকেই সভ্যতা-সংস্কৃতি এবং শিল্পকলার বিকাশ ঘটিয়েছে। এভাবেই মহাত্মা গান্ধী, জহরলাল নেহরু, সুভাষ চন্দ্র বোস প্রমুখ এক ধর্মনিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গির মধ্য দিয়ে ভারতের ইতিহাসকে দেখেছেন।
এর বিপরীত দিকে ইংরেজ ইতিহাসবিদরা অন্যরকম দৃষ্টিভঙ্গিতে ভারতবর্ষের ইতিহাসকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছেন এবং সেই ব্যাখ্যার পিছনেও কিছু উদ্দেশ্য ছিল। ভারতবর্ষের স্বাধীনতার জন্য হিন্দু-মুসলমান একযোগে ইংরেজদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিল, যা ইংরেজ সরকারের মধ্যে ভীতি ধরিয়েছিল। তখন ইংরেজরা ভারতবর্ষে নিজেদের শাসন-শোষণ বজায় রাখতে বিভেদকামী নীতির প্রয়োগ করেছিল। তাই ইংরেজি ইতিহাসবিদরা যখন ইতিহাসকে ব্যাখ্যা করেছেন, তাঁরা রাজাদের সঙ্গে তাদের ধর্মকে জুড়ে দিয়েছেন। সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে তারা ইতিহাসকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছেন এবং এর জন্য ইংরেজ ইতিহাসবিদরা সংশ্লিষ্ট রাজার ধর্মের চশমা দিয়েই গোটা ইতিহাস ব্যাখ্যা করেছেন। আর ইতিহাসের সেই ব্যাখ্যা, একদিকে মুসলিম লীগ এবং অপরদিকে আরএসএস গ্রহণ করেছিল।
ভারতের সবচেয়ে বেশি হিন্দুবিরোধী রাজা বলা হয় ঔরঙ্গজেবকে। ঔরঙ্গজেব কাশী বিশ্বনাথের মন্দির ধ্বংস করেছিলেন। এটা তুলে ধরে তার বিরুদ্ধে ইতিহাসকে বিকৃত করা হয়েছে। বলা হয়েছে, তিনি নাকি অসংখ্য মন্দির ধ্বংস করেছিলেন। তবে বাস্তবে রিচার্ড ইটন নামে এক আর্কিওলজিস্ট ইতিহাসবিদ জানিয়েছেন, ঔরঙ্গজেব দশটি মন্দির ধ্বংস করেছিলেন। বিশ্বম্ভর নাথ নামে এক ইতিহাসবিদের লেখায় পাওয়া যায়, ঔরঙ্গজেব দশটি মন্দির ধ্বংস করলেও তার বদলে প্রায় ৫০ মন্দির দান করেছিলেন। যেমন কামাখ্যা মন্দির।
ঔরঙ্গজেবের মতো মুসলিম রাজার পাশাপাশি হিন্দুরাও যে মন্দির ধ্বংস করেছেন, তার উল্লেখ আছে কাশ্মীরের কলহনের লেখা ‘রাজতরঙ্গিনী’তে। একাদশ শতাব্দীর কাশ্মীরের রাজা হর্ষদেব শুধুমাত্র মন্দির ধ্বংসের জন্যই একদল বিশেষ সেনা নিযুক্ত করেছিলেন। যাদের ‘দেবত উৎপাটন নায়ক’ বলা হত। মানে, যারা দেবতাদের মূর্তি ধ্বংস করেন। আর এদের নিয়োগকর্তা ছিলেন একজন হিন্দু রাজা। এই হিন্দু সেনারা এমন কাজ করেছিলেন। কারণ, রাজা নিজে বিলাসবহুল জীবনযাপনের জন্য রাজকোষ শূন্য করে ফেলেছিলেন। ওই সেনাদের মূল কাজ ছিল, যে সমস্ত মন্দিরে রাখা সোনা বা মূল্যবান ধাতুর যেসব মূর্তি রয়েছে, তাকে তুলে নিয়ে গিয়ে রাজকোষে জমা দেওয়া। সবথেকে বেশি মন্দির ধ্বংস করেন রাজা হর্ষদেব। যদি যুক্তি দিয়ে বিচার করি, তাহলে বলুন ধর্ম, নাকি রাজার ক্ষমতা প্রদর্শনের সঙ্গে মন্দির ধ্বংসের ঘটনা বেশি সম্পর্কযুক্ত?
একদিকে নয়া শিক্ষানীতির পাঁচ বছর পূর্ণ হল। অপরদিকে স্কুলপাঠ্য ইতিহাস বই থেকে মোঘল আমলকে বাদ দেওয়া হল। এর মধ্য দিয়ে আসলে সমাজের মধ্যে বিভেদ, বিদ্বেষ ও বিভাজনের মানসিকতা ঢুকিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা চলছে। ইতিহাসকে বিকৃত করা হচ্ছে, যাতে ধর্মের নামে চলা রাজনীতি, এক সম্প্রদায়ের মানুষের প্রতি আরেক সম্প্রদায়ের মানুষের মনে বিদ্বেষ তৈরি করা যেতে পারে। ইতিহাসকে যুক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করা দরকার। ভারতীয় ইতিহাসের সবচেয়ে সুন্দর দিক হল সর্বধর্ম সমন্বয়ের ইতিহাস, যা আমাদের দেশকে প্রগতিশীলতার দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে।








