কানাডায় বাঙালি সাহিত্য-চর্চার প্রাণপুরুষ সুব্রত কুমার দাস
ড. রতন ভট্টাচার্য
প্রবাসে বাংলা সাহিত্যচর্চা একসময় ছিল বিচ্ছিন্ন, ব্যক্তিগত প্রয়াসের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই চর্চা সংগঠিত রূপ পেয়েছে, গড়ে উঠেছে সাহিত্যিক নেটওয়ার্ক, তৈরি হয়েছে আন্তর্জাতিক সংযোগ। এই পরিবর্তনের অন্যতম পথিকৃৎ সুব্রত কুমার দাস একজন সাহিত্যিক, গবেষক, অনুবাদক এবং সাংস্কৃতিক সংগঠক, যিনি কানাডার বাঙালি প্রবাসে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে বিশ্বমঞ্চে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। সত্তরের দশক থেকে ভারত ও বাংলাদেশের বহু বাঙালি পরিবার কানাডায় বসবাস শুরু করেন। আইটি বিপ্লব, উচ্চশিক্ষা এবং দক্ষ কর্মীদের আগমনে এই সংখ্যা ক্রমবর্ধমান। টরন্টো, ভ্যাঙ্কুভার, মন্ট্রিয়াল ও ক্যালগেরির মতো শহরে তাঁরা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বজায় রেখে বসবাস করেন। দ্বিতীয় প্রজন্মের প্রবাসীরা কানাডীয় সংস্কৃতিতে একীভূত হলেও বাংলা ভাষা ও সাহিত্য তাঁদের শিকড়ের সঙ্গে সংযোগ রক্ষা করে। এই প্রেক্ষাপটে সুব্রত কুমার দাসের সাহিত্যিক নেতৃত্ব প্রবাসী বাঙালিদের মধ্যে সাহিত্যচর্চাকে সংগঠিত করেছে, দিয়েছে নতুন দিশা। ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এটি একটি জাতির আত্মপরিচয়, ইতিহাসের ধারক এবং সংস্কৃতির বাহক। বাংলা ভাষার জন্ম হয়েছে শত শত বছর আগে। আজ শুধু বাংলাদেশ বা পশ্চিমবঙ্গেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বের নানা প্রান্তে। প্রবাসে বসবাসরত বাঙালিরা তাঁদের শিকড়ের সঙ্গে সংযোগ রক্ষা করতে বাংলা সাহিত্যচর্চাকে বেছে নিয়েছেন। এই চর্চা কখনো ব্যক্তিগত, কখনো সংগঠিত, কখনো অনলাইনভিত্তিক, আবার কখনো আন্তর্জাতিক মঞ্চে।বাংলা ভাষাভাষী মানুষের প্রবাসে যাত্রা শুরু হয় ঔপনিবেশিক যুগ থেকেই।
ব্রিটিশ আমলে শিক্ষিত বাঙালিরা ইংল্যান্ড, ইউরোপ এবং পরবর্তীতে আমেরিকা, কানাডা, মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় পাড়ি জমান। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পর বাংলাদেশ থেকে অসংখ্য মানুষ বিদেশে যেতে শুরু করেন। একইভাবে পশ্চিমবঙ্গ থেকে সত্তর দশক থেকে ২০০০-এর দশকে আইটি বিপ্লবের সময় ব্যাপক প্রবাসী বাঙালি গড়ে ওঠে। এসব প্রবাসীরা তাঁদের ভাষা, সংস্কৃতি এবং সাহিত্যকে সঙ্গে নিয়ে গেছেন। প্রথমে চিঠি, পত্রিকা এবং ছোটখাটো সাহিত্য আসর দিয়ে শুরু হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গড়ে উঠেছে সাহিত্য সংগঠন, অনলাইন ম্যাগাজিন এবং আন্তর্জাতিক সাহিত্য উৎসব। প্রবাসে বাংলা সাহিত্যচর্চার প্রাণ হলেন এরা। তাঁরা শুধু লেখেন না, সংগঠিত করেন, অনুবাদ করেন, গবেষণা করেন এবং নতুন প্রজন্মকে বাংলা সাহিত্যের সঙ্গে যুক্ত করেন। সুব্রত কুমার দাস (কানাডা) শ্যামল দত্ত (আমেরিকা) রুবিনা হক (ব্রিটেন) বাংলা কবিতা ও অনুবাদে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছেন। বাংলা সাহিত্যকে ইংরেজি ভাষায় অনুবাদ করে আন্তর্জাতিক পাঠকের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। প্রবাসে নানা অভিজ্ঞতা, আত্মপরিচয় এবং সাংস্কৃতিক দ্বন্দ্ব নিয়ে লেখেন তারা। তাঁদের লেখনীতে প্রবাসী জীবনের বাস্তবতা উঠে আসে। প্রবাসে বাংলা সাহিত্যচর্চাকে সংগঠিত করতে গড়ে উঠেছে বহু সাহিত্য সংগঠন ও প্রকাশনা।

কানাডাভিত্তিক সংগঠন বাংলা সাহিত্যচর্চা, লেখক সংযোগ এবং অনলাইন প্রকাশনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলো প্রবাসী লেখকদের লেখা প্রকাশ করে, পাঠকের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করে। সাহিত্য উৎসব Toronto International Festival of Authors, এখানে বাংলা সাহিত্যিকদের অংশগ্রহণ ক্রমবর্ধমান। Bangla Literature Festival USA মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বাংলা সাহিত্যিকদের নিয়ে আয়োজিত উৎসব। London Bengali Literature Circle ব্রিটেনে বাংলা সাহিত্যচর্চার অন্যতম কেন্দ্র। প্রবাসী সাহিত্যিকরা বাংলা সাহিত্যকে আন্তর্জাতিক পাঠকের কাছে পৌঁছে দিতে অনুবাদ ও গবেষণায় মনোনিবেশ করছেন।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গীতাঞ্জলি, কাজী নজরুল ইসলামের প্রবন্ধ, বাংলাদেশি উপন্যাস — এইসব অনুবাদ আন্তর্জাতিক পাঠকের কাছে বাংলা সাহিত্যের গভীরতা তুলে ধরছে। গবেষণায় উঠে আসছে বাংলা সাহিত্যের উত্তর আমেরিকা সংযোগ, জাপান-বাংলা সম্পর্ক, প্রবাসে নারীর সাহিত্যিক অভিজ্ঞতা। এসব কাজ বাংলা সাহিত্যকে শুধু সংরক্ষণ করছে না, বরং বিশ্বসাহিত্যের অংশ করে তুলছে। প্রবাসে জন্ম নেওয়া বা বেড়ে ওঠা দ্বিতীয় প্রজন্মের বাঙালিরা বাংলা ভাষা ও সাহিত্য থেকে অনেক সময় দূরে থাকেন। কিন্তু কিছু সাহিত্যিক ও সংগঠক তাঁদের বাংলা শেখাতে, বাংলা সাহিত্য পড়াতে এবং লেখালিখিতে উৎসাহিত করছেন। বাংলা স্কুল, অনলাইন সাহিত্য কর্মশালা এবং ইউটিউব ও পডকাস্টে বাংলা সাহিত্য আলোচনা — এইসব উদ্যোগ নতুন প্রজন্মকে বাংলা সাহিত্যের সঙ্গে যুক্ত করছে।
১৯৬৪ সালে বাংলাদেশের ফরিদপুরে জন্ম সুব্রত কুমার দাসের। তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এম.এ করেন। ১৯৯০ থেকে দুই দশক ধরে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্য পড়িয়েছেন। ২০১৩ সালে কানাডায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। তাঁর সাহিত্য-যাত্রা শুরু হয় ১৯৮৩ সালে একটি স্থানীয় পত্রিকায়। প্রথম বই কাজী নজরুল ইসলাম প্রকাশিত হয় ১৯৯৯ সালে। এরপর My Mahabharat, Sri Chaitanya Deb, Antarbaho, Rabindranath and Mahabharat, Bangla Katha Sahitya, Japan in Contemporary Magazines — এইসব বই বাংলা প্রবাসী সাহিত্যে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। সুব্রত কুমার দাস বর্তমানে Writer’s Union of Canada-র সদস্য এবং Bengali Literary Resource Centre-এর সঙ্গে যুক্ত থেকে প্রবাসে বাংলা সাহিত্যচর্চায় নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তাঁর উদ্যোগে কানাডার বাঙালি লেখকদের জন্য একটি সাহিত্যিক নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে, যা আমেরিকা, ইউরোপ ও এশিয়ায় প্রশংসিত। তিনি ২২ বছর ধরে অনলাইনে বাংলা উপন্যাস প্রচারে কাজ করছেন। বহু লেখককে সম্পাদনা, প্রচার ও প্রকাশনায় সাহায্য করেছেন। তাঁর Canada Journal অনুষ্ঠান কোভিড-কালে NRB টেলিভিশনে সাহিত্যিক সংযোগের এক অনন্য মাধ্যম হয়ে ওঠে।
সুব্রত দাস UNESCO Mondialogo Teacher হিসেবে পাঁচ বছর কাজ করেছেন। Agenda-21 প্রকল্পে শিক্ষক বিশেষজ্ঞ হিসেবে সাত বছর Inter-cultural dialogue-এ অংশগ্রহণ করেছেন। Rome Conference-2006) ও Mumbai Conference-2007-এ অংশগ্রহণ তাঁর আন্তর্জাতিক সাহিত্যিক সংযোগকে দৃঢ় করেছে। তিনি কাজী নজরুল ইসলামের Selected Prose, Speeches, Kemal Pasha অনুবাদ করেছেন। Rabindranath Tagore: India-Japan Cooperation Perspectives বইয়ে রবীন্দ্রনাথের জাপান সংযোগের পূর্ব ইতিহাস তুলে ধরেছেন।

সুব্রত দাস নিজেকে ‘Bookman’ বলে পরিচয় দিতে ভালবাসেন। তাঁর প্রিয় কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, যাঁর গীতাঞ্জলি নিয়ে তিনি বহুবার আলোচনা করেছেন। তাঁর মতে, “জীবন ভালবাসায় পূর্ণ, প্রতিটি মুহূর্তকে ভালবাসা উচিত।” গবেষক হিসেবে তিনি বলেন, “বিদ্যমান জ্ঞানকে সমৃদ্ধ করতে হবে, পূর্বতত্ত্বকে অবহেলা নয়।” শিক্ষক হিসেবে তাঁর বার্তা, “Let’s be grateful to others।” লেখক হিসেবে তাঁর আহ্বান, “Let’s write more and more and attain the craftsmanship of writing better.” সুব্রত দাস Nalanda Best Canadian Bengali Author Award-2023), Gayatri GaMarsh Memorial Award-2018 পেয়েছেন এবং Best Canadian Immigrant Award-2021 এর জন্য মনোনীত হয়েছেন। Toronto International Festival of Authors-এ ২০২০, ২০২২ ও ২০২৩ সালে অংশগ্রহণ করেছেন। এইসব স্বীকৃতি তাঁর সাহিত্যিক নেতৃত্ব ও প্রবাসে বাংলা ভাষার প্রতি নিষ্ঠার প্রমাণ।
তাঁর প্রিয় উপন্যাস Anna Karenina, Mahabharata, Kando Nodi Kando তাঁকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। তাঁর গবেষণা বাংলাদেশি উপন্যাস, রবীন্দ্রনাথের উত্তর আমেরিকা সংযোগ এবং জাপান-বাংলা সম্পর্ককে কেন্দ্র করে। এসব বিষয় তাঁর সাহিত্যিক দৃষ্টিভঙ্গিকে বহুমাত্রিক করে তুলেছে। সুব্রত কুমার দাস প্রবাসে বাংলা সাহিত্যচর্চার এক উজ্জ্বল নাম। কানাডার বাঙালি প্রবাসে তিনি এক আলোকবর্তিকা, যাঁর সাহিত্যিক আলো ছড়িয়ে পড়ছে বিশ্বজুড়ে। তাঁর কাজ প্রমাণ করে, প্রবাসে থেকেও শিকড়ের সঙ্গে সংযোগ রাখা যায় এবং সেই সংযোগকে বিশ্বের দরবারে তুলে ধরা যায়।
প্রবাসে বাংলা সাহিত্যচর্চা এখন আর বিচ্ছিন্ন প্রয়াস নয়। এটি একটি সংগঠিত, বহুমাত্রিক এবং আন্তর্জাতিক আন্দোলন। সাহিত্যিকদের নিষ্ঠা, সংগঠনের উদ্যোগ এবং পাঠকের আগ্রহ বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে বিশ্বমঞ্চে প্রতিষ্ঠিত করছে। এই সাহিত্যচর্চা প্রমাণ করে, ভৌগোলিক দূরত্ব কখনো শিকড়ের টানকে দুর্বল করতে পারে না। বাংলা ভাষা ও সাহিত্য, তার শক্তি, সৌন্দর্য, এবং মানবিকতা প্রবাসেও সমানভাবে জ্বলজ্বল করছে।
(লেখক: ড. রতন ভট্টাচার্য এপিজে আব্দুল কালাম পুরস্কার জয়ী বহুভাষী লেখক, ভর্জিনিয়া কমনওয়েলথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত অধ্যাপক ও সাংবাদিক)








