প্রসঙ্গ: মানবাধিকার
সাইফুল খান
বিশ্বব্যাপী মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার ঠিকাদারি রাষ্ট্রসংঘের। মানবাধিকার সংক্রান্ত বিষয়গুলো দেখার জন্য তাদের মূল প্রতিষ্ঠান হল United Nations Human Rights Council (UNHRC) বা রাষ্ট্রসংঘ মানবাধিকার পরিষদ। এছাড়াও রাষ্ট্রসংঘের ভেতরে আরেকটি বড় অফিস আছে, Office of the High Commissioner for Human Rights (OHCHR)। এটি সুইৎজারল্যান্ডের জেনেভায় অবস্থিত এবং বিশ্বব্যাপী মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ, তদন্ত, প্রতিবেদন ও সহযোগিতা করে এই সংস্থা।
UNHRC ৪৭টি সদস্য রাষ্ট্র নিয়ে গঠিত। তাদের কাজ নীতিনির্ধারণ ও আলোচনা করা, মানে টক-শো করা। আর বাস্তবায়ন, নজরদারি ও কারিগরি সহায়তা তথা হোম সার্ভিস দেয় OHCHR। আমাদের বুঝতে হবে রাষ্ট্রসংঘের মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার সৌন্দর্য আসলে কেমন। মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য আগে দরকার মানবাধিকার হরণ করার প্রোজেক্ট। হরণ না হলে অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রোজেক্ট হাতে নেওয়ার উপযোগিতা কী! মানবাধিকারের সৌন্দর্য হল বর্ডার দিয়ে মেক্সিকোকে আলাদা রাখা। এছাড়াও পাশে থাকা কিউবা, ভেনেজুয়েলা, নিকারাগুয়া, হাইতি, পানামার সঙ্গে সম্পর্কের যে ইতিহাস, সেখানেও মানবাধিকার প্রোজেক্ট চালানো যায়।
ফিলিস্তিনের চারপাশে থাকা দেশগুলো মানবাধিকার কার্যক্রমে ওতপ্রোতভাবে জড়িত আছে মজলুমদের আলাদা রেখে। সৌদি আরব যেমন ইয়েমেনের সঙ্গে মানবাধিকার দেখায় আলাদা রেখে যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়ে। ইউরোপ যেভাবে আফ্রিকাকে দেখায়। ইউরোপের স্পেন আর আফ্রিকার মরক্কোর কাছাকাছি দূরত্ব মাত্র ১৩ কিলোমিটার। ব্রিজ বা টানেল নির্মাণ করে যোগাযোগ করা যেত। যেহেতু আফ্রিকায় মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে ইউরোপকে, তাই আলাদাই থাক। মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা করতে আলাদা থাকার জন্য প্রাকৃতিক বা কৃত্রিম বিভাজন জরুরী। দেওয়ালের ওপাশ থেকে কান্নার শব্দ তো আগে আসতে হবে। তারপর না হয় মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার একটা দীর্ঘমেয়াদি প্রোজেক্ট হাতে নেওয়া যাবে। দশকের পর দশক ধরে চলতে হবে এই প্রক্রিয়া।
মানবাধিকার রক্ষায় যারা নেপথ্য থেকে ঘাম ঝরায় তাদের সম্পর্কে কৌতুহল উদ্দীপক কিছু তথ্য শেয়ার করা জরুরী মনে করছি। স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট (SIPRI)-এর তথ্য মতে, ২০২৩ সালে যে কয়েকটি কোম্পানি অস্ত্র রফতানিতে শীর্ষে ছিল, তাদের মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের Lockheed Martin একাই প্রায় ৬০ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র বিক্রি করেছে। তারা মূলত যুদ্ধবিমান (যেমন F-35), মিসাইল সিস্টেম এবং স্যাটেলাইট প্রযুক্তি তৈরি করে। এরপরেই আছে Raytheon / RTX Corporation, যারা মিসাইল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, রাডার ও উন্নত সমরাস্ত্র তৈরি করে, যার আয় প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলার। Northrop Grumman প্রায় ৩৫ বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা করে, তাদের বিশেষত্ব হল ড্রোন, সাইবার সিকিউরিটি ও নিউক্লিয়ার প্রতিরক্ষা। Boeing প্রতিরক্ষা শাখা থেকে বছরে ৩১ বিলিয়ন ডলার আয় করে, যুদ্ধবিমান ও সামরিক পরিবহন বিমান তৈরি করে। General Dynamics প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলার আয় করে ট্যাংক, সাবমেরিন ও সাঁজোয়া যান বিক্রি করে। ইউরোপীয় প্রতিষ্ঠান BAE Systems প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলারের বাজার দখল করে আছে। তারা কামান, যুদ্ধবিমান ও নৌবাহিনীর জন্য উন্নত মানের সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ করে। চীন ও রাশিয়ার কোম্পানিগুলোও (যেমন NORINCO, AVIC, Rostec) বিশাল অঙ্কের অস্ত্র উৎপাদন করে, যদিও তাদের আর্থিক হিসাব পশ্চিমা কোম্পানির মতো স্বচ্ছ নয়।
কিন্তু এখানেই একটি বড় বৈপরীত্য তৈরি হয়। যুদ্ধ ও ধ্বংসযজ্ঞের যন্ত্র বিক্রি করে যে কোম্পানিগুলো কোটি কোটি ডলার আয় করে, সেই কোম্পানিগুলোই আবার মানবিক কাজে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে থাকে। যেমন Lockheed Martin Foundation শিক্ষা, বিজ্ঞান-প্রযুক্তি গবেষণা, ভেটেরান সাপোর্ট ও দুর্যোগ মোকাবিলায় নিয়মিত আর্থিক অনুদান দেয়। কোভিড-১৯ মহামারির সময় তারা প্রায় ৪০ মিলিয়ন ডলার অনুদান দিয়েছিল। Raytheon / RTX-এর Corporate Citizenship প্রোগ্রাম আছে। তারা UNICEF ও Red Cross-এর মতো প্রতিষ্ঠানে দান করেছে এবং ভেটেরান ও পরিবেশ উদ্যোগে অর্থ ব্যয় করে। Northrop Grumman স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়ে STEM শিক্ষায় বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করে এবং ভেটেরান পরিবারকে সহায়তা দেয়। Boeing ২০২২ সালে বিভিন্ন দেশে প্রায় ২৪ মিলিয়ন ডলার শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও পরিবেশ প্রকল্পে ব্যয় করেছে। ব্রিটেনের BAE Systems-ও শিক্ষা, কমিউনিটি উন্নয়ন এবং মানসিক স্বাস্থ্য উদ্যোগে অর্থ দেয়।
তবে রাশিয়া ও চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানিগুলো এ ধরনের দাতব্য উদ্যোগ পশ্চিমা ধাঁচে প্রকাশ করে না। তারা সাধারণত সরকারের মাধ্যমে পরিকাঠামো, স্বাস্থ্যসেবা বা দুর্যোগ মোকাবিলায় অর্থ দেয়, যা রাষ্ট্রীয় প্রোগ্রামের অংশ হিসেবেই গণ্য হয়।
অতএব, একদিকে এই কোম্পানিগুলো মানুষ ও দেশ ধ্বংস করতে যুদ্ধবিমান, ট্যাংক, মিসাইল, ড্রোন বা সাবমেরিন বিক্রি করে শত শত বিলিয়ন ডলার আয় করে; আবার অন্যদিকে নিজেদের ভাবমূর্তি (!) রক্ষায় এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার (!) অংশ হিসেবে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবেশ, দুর্যোগ মোকাবিলা ও মানবিক ত্রাণে কিছু অর্থ ফিরিয়ে দেয়। সমালোচকদের মতে, মানবিক খাতে তাদের অনুদান আসলে আয়ের তুলনায় নগণ্য এবং এগুলো অনেকটাই ব্র্যান্ড-ইমেজ ঠিক রাখার জন্য করা হয়। কিছু সমর্থক বলেন, এগুলো না থাকলে হয়ত শিক্ষা ও স্বাস্থ্য প্রকল্পই বাস্তবায়িত হত না। আলোচক আর সমালোচকেরা এমনসব বিষয়ের আলোচনার ভিতরে আটকে রাখে। আমাদের মাথায় আর এটা আসে না যে, তারা সবাই প্রথমেই মানবতাবিরোধী কার্যক্রমে জড়িত। মিডিয়া, মিডিয়া ব্যক্তিত্ব সবই চলে তাদের অর্থায়নে।
অতএব আলোচনার বিষয় হিসেবে এটা আসবে না, তাদের মানব-ধ্বংসী অস্ত্র কার্যক্রম কেন মানবতাবিরোধী অপরাধ নয়? আলোচনার বিষয় বাছাই করা হবে তাদের পক্ষে রেখে সমালোচনা করার জন্য। অস্ত্র কোম্পানিগুলোর মার্কেটই মূলত যুদ্ধ। স্বাভাবিকভাবেই অস্ত্র রফতানি করতে মার্কেট তৈরি করতে হয়। সেজন্য প্রয়োজন দেশে দেশে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, সংঘাত, যুদ্ধ আর অবিশ্বাসের বীজ বোনার গোপন প্রোজেক্ট চালু রাখা।
প্রথমে ক্ষত তৈরি করতে হবে। তারপর উপশমের বিশাল আয়োজন চলবে কয়েক দশক ধরে। এটাই মানবাধিকার প্রোজেক্ট। অনুদানের সামিয়ানায় ঢাকা পড়ে থাকে ধারাবাহিক ও পরিকল্পিত মানবতাবিরোধী সব অপরাধ।
(লেখক: ইতিহাস, রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক)
হাইলাইট
যুদ্ধ ও ধ্বংসযজ্ঞের যন্ত্র বিক্রি করে যে কোম্পানিগুলো কোটি কোটি ডলার আয় করে, সেই কোম্পানিগুলোই আবার মানবিক কাজে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে থাকে। অতএব, একদিকে এই কোম্পানিগুলো মানুষ ও দেশ ধ্বংস করতে যুদ্ধবিমান, ট্যাংক, মিসাইল, ড্রোন বা সাবমেরিন বিক্রি করে শত শত বিলিয়ন ডলার আয় করে; আবার অন্যদিকে নিজেদের ভাবমূর্তি (!) রক্ষায় এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার (!) অংশ হিসেবে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবেশ, দুর্যোগ মোকাবিলা ও মানবিক ত্রাণে কিছু অর্থ ফিরিয়ে দেয়। তাদের মানব-ধ্বংসী অস্ত্র কার্যক্রম কেন মানবতাবিরোধী অপরাধ নয়?








