শতবর্ষে মাওলানা আজাদ কলেজ শিক্ষা, সংস্কৃতি, সংহতি ও প্রগতির পথে যাত্রা
পাশারুল আলমঃ কলকাতা শহরের বৌদ্ধিক ও সাংস্কৃতিক মানচিত্রে মাওলানা আজাদ কলেজ এক অনন্য নাম। এটি কেবল একটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়; বরং আধুনিক শিক্ষার আলোয় বাংলার মুসলিম সমাজ-সহ নানা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সামাজিক উত্তরণ, জাতীয় চেতনার বিকাশ এবং ধর্মনিরপেক্ষ মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার এক ঐতিহাসিক সাক্ষ্য। ১৯২৬ সালে ‘ইসলামিয়া কলেজ’ নামে যাত্রা শুরু করা এই বিদ্যাপীঠ ২০২৬ সালে তার গৌরবময় শতবর্ষে পদার্পণ করল, যা শিক্ষা ও সমাজ ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
ঐতিহাসিক পটভূমি: ঔপনিবেশিক সীমাবদ্ধতা থেকে জ্ঞানমুক্তিঃবিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে ব্রিটিশ ভারতের মুসলিম সমাজ শিক্ষা ও প্রশাসনিক ক্ষেত্রে মারাত্মকভাবে পিছিয়ে ছিল। কলকাতার মতো বাণিজ্যিক ও প্রশাসনিক রাজধানীতেও মুসলিম যুব সমাজের জন্য আধুনিক উচ্চশিক্ষার সুযোগ ছিল সীমিত। এই বাস্তবতা থেকেই জন্ম নেয় ‘ইসলামিয়া কলেজ’ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ। ১৯২৪ সালের ৯ ডিসেম্বর তৎকালীন বাংলার গভর্নর লর্ড লিটন কলেজটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন এবং ১৯২৬ সালে এটি আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যক্রম শুরু করে।
এই উদ্যোগের পেছনে যাঁদের দূরদর্শী নেতৃত্ব ছিল, তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন শেরে বাংলা এ.কে. ফজলুল হক, সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী ও স্যার আবদুর রহিম। প্রথম অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব নেন এডিনবারা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রখ্যাত প্রাচ্য ভাষাবিদ এ.এইচ. হার্লে। কলেজটির লক্ষ্য ছিল, কেবল ধর্মভিত্তিক শিক্ষা নয়; বরং বিজ্ঞান, মানববিদ্যা ও প্রশাসনিক শিক্ষার মাধ্যমে এক আত্মবিশ্বাসী, আধুনিক নাগরিক শ্রেণি গড়ে তোলা।
দেশভাগোত্তর রূপান্তর ও নামকরণের তাৎপর্যঃ১৯৪৭ সালের দেশভাগ কলেজটির ইতিহাসে এক গভীর সংকট ও রূপান্তরের অধ্যায়। বহু ছাত্র ও শিক্ষক দেশান্তরিত হন, সামাজিক পরিকাঠামো ভেঙে পড়ে। তবু প্রতিষ্ঠানটি টিকে থাকে এবং নতুন ভারতের বাস্তবতায় নিজেকে পুনর্গঠিত করে। ১৯৬০ সালে কলেজটির নামকরণ হয় স্বাধীন ভারতের প্রথম শিক্ষামন্ত্রী মাওলানা আবুল কালাম আজাদের নামে। এই নামকরণ ছিল নিছক আনুষ্ঠানিক নয়; এটি ধর্মনিরপেক্ষতা, জাতীয় ঐক্য ও শিক্ষার মাধ্যমে জাতি গঠনের আদর্শের প্রতি এক দৃঢ় অঙ্গীকার।
একাডেমিক উৎকর্ষ ও গবেষণার ঐতিহ্য:প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে মাওলানা আজাদ কলেজ কলা, বিজ্ঞান ও বাণিজ্য — এই তিন ধারায় শিক্ষা প্রদান করে আসছে। বর্তমানে এটি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ কলেজ হিসেবে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর স্তরে বহু বিষয়ে পাঠদান করে থাকে। পদার্থবিদ্যা, রসায়ন, গণিত, অণুজীববিজ্ঞান, উদ্ভিদবিদ্যা, ইতিহাস, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, দর্শন, বাংলা, ইংরেজি ও উর্দু ইত্যাদি বিভাগ দীর্ঘদিন ধরে তাদের একাডেমিক মান বজায় রেখে চলেছে।
শিক্ষায় উৎকর্ষের স্বীকৃতি স্বরূপ কলেজটি NAAC-এর কাছ থেকে A+ গ্রেড (CGPA 3.46) অর্জন করেছে এবং ভারত সরকারের ডিপার্টমেন্ট অফ বায়োটেকনোলজি থেকে ‘স্টার কলেজ’ এর মর্যাদা লাভ করেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অ্যাড-অন ও ক্যারিয়ার-ভিত্তিক কোর্স চালু করে শিক্ষাকে আরও বাস্তবমুখী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
মানবসম্পদ ও প্রাক্তনীদের অবদান:মাওলানা আজাদ কলেজের প্রকৃত শক্তি তার ছাত্র ও শিক্ষকসমাজ। এই প্রতিষ্ঠান থেকে বেরিয়ে এসেছেন দেশের রাজনৈতিক, সাহিত্যিক ও প্রশাসনিক ক্ষেত্রে খ্যাতিমান বহু ব্যক্তিত্ব। যেমন- কমিউনিস্ট নেতা বিমান বসু, মহম্মদ সেলিম, কবি বিষ্ণু দে, রাজনীতিক সুলতান আহমেদ, সাবেক IPS অফিসার ভিপুল অগারওয়াল ও আবদুল্লাহ আল মাহমুদ প্রমুখ তাঁদের মধ্যে অন্যতম। শিক্ষকদের মধ্যে ভাবতোষ দত্ত, তপন রায়চৌধুরী ও প্রাক্তন উপাচার্য অশুতোষ ঘোষের মতো মনীষীরা এই কলেজের গৌরব বৃদ্ধি করেছেন। আজও এখানকার শিক্ষার্থীরা JAM, GATE, NET-এর মতো জাতীয় স্তরের পরীক্ষায় সাফল্যের সঙ্গে নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণ করছে।
সামাজিক দায়িত্ব ও বহুত্ববাদী চর্চা:মাওলানা আজাদ কলেজ বরাবরই ধর্মনিরপেক্ষতা ও সামাজিক সম্প্রীতির চর্চায় অগ্রণী। বহুধর্ম, বহুভাষা ও বহুসাংস্কৃতিক শিক্ষার্থীদের সহাবস্থান এখানে স্বাভাবিক বাস্তবতা। সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক পটভূমির শিক্ষার্থীদের জন্য এটি একটি নিরাপদ ও সহানুভূতিশীল শিক্ষাক্ষেত্র।
পরিবেশ সচেতনতার ক্ষেত্রেও কলেজটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। প্লাস্টিক-মুক্ত ক্যাম্পাস, সৌরশক্তির ব্যবহার, বৃষ্টির জল সংরক্ষণ এবং ই-অফিস ব্যবস্থা তার উদাহরণ। NSS, রক্তদান শিবির, সামাজিক সচেতনতা কর্মসূচি এবং LGBTQ+ অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি বৃহত্তর সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা পালন করে চলেছে।
শতবর্ষে ভবিষ্যতের স্বপ্ন:শতবর্ষে পদার্পণ করে মাওলানা আজাদ কলেজ অতীতের গৌরবকে স্মরণ করার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ নির্মাণের লক্ষ্যেও এগিয়ে চলেছে। আধুনিক গবেষণা পরিকাঠামো, ডিজিটাল শিক্ষাব্যবস্থা, নতুন গবেষণাভিত্তিক কোর্স এবং স্বায়ত্তশাসনের পথে অগ্রসর হওয়া — এই লক্ষ্য সামনে রেখে পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। আধুনিক ল্যাবরেটরি, উন্নত মানের ছাত্র-পরিসেবা ও পরিকাঠামো উন্নয়নের কাজ ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে।
পরিশেষে বলা যায়, মাওলানা আজাদ কলেজের শতবর্ষ একটি প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘায়ুর উদযাপন মাত্র নয়; এটি একটি আদর্শের ধারাবাহিক বিজয়ের কাহিনি। শিক্ষা যে সমাজকে বদলাতে পারে, প্রান্তিককে ক্ষমতায়িত করতে পারে এবং বহুত্ববাদী ভারতের ভিত আরও মজবুত করতে পারে — এই সত্যের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত মধ্যকলকাতায় অবস্থিত মাওলানা আজাদ কলেজ। শতবর্ষের এই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আমরা আশা করি, জ্ঞান, মানবিকতা ও সম্প্রীতির যে আলোকবর্তিকা নিয়ে এই প্রতিষ্ঠান ১৯২৬ সালে যাত্রা শুরু করেছিল, আগামী শতাব্দীতে তা আরও দীপ্ত হয়ে জ্বলতে থাকবে।








