আগে কে, দেশ নাকি রাজনীতি?
খান বাহাদুর সেখ
গত এগারো বছরে নরেন্দ্র মোদী, যোগী আদিত্যনাথ, অমিত শাহ, হিমন্ত বিশ্বশর্মাদের উগ্র হিন্দুত্ববাদী বা বকলমে মুসলিম বিদ্বেষী রাজনীতির ফলে বর্তমান সময়ে ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ ভারতে সনাতন হিন্দুধর্মের নিজস্ব ধর্মীয় আচার, সংস্কৃতি, সভ্যতার গরিমা ছেড়ে একশ্রেণির উগ্র হিন্দু জাতীয়তাবাদী অন্ধভক্ত সনাতন হিন্দুধর্ম ও মুসলিম বিদ্বেষকে প্রায় সমার্থক করে ফেলেছে। উক্ত লাইনটি শুনতে অপ্রিয় লাগলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে ইহা অনেকাংশেই সত্য। বিজেপি আরএসএসের মনুবাদী মতাদর্শ ভিত্তিক মুসলিম, খ্রিষ্টান, আদিবাসী ও দলিত বিদ্বেষ নির্ভর নব্য হিন্দুধর্ম এবং হিন্দুত্ববাদী গেরুয়া সন্ত্রাসকে বছরের পর বছর ভোটের মাধ্যমে সমর্থন করছেন হিন্দু সম্প্রদায়ের একটা বড় অংশ, যার মধ্যে লেখাপড়া জানা তথাকথিত যুক্তিবাদী এবং বড় বড় ডিগ্রিধারী উচ্চ শিক্ষিতদের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি আজকাল খুব একটা অবাক করে না।
বিজেপির আইটি সেল ও তাদের পোষ্য গদি মিডিয়ায় লাগাতার আরএসএসের মনঃপূত মুসলিম বিরোধী একের পর এক মিথ্যা মনগড়া এজেন্ডা বা ন্যারেটিভের প্রচার চলতেই থাকে। একটা ন্যারেটিভ শেষ হয় তো, আর একটা ন্যারেটিভ শুরু। নরেন্দ্র মোদি ২০১৪ সালে প্রথমবার কেন্দ্রে ক্ষমতায় আসার পর লোকসভার প্রথম অধিবেশন থেকেই শুরু হয়েছিল তিন তালাক ন্যারেটিভ দিয়ে (যেন স্বাধীন ভারতে একমাত্র তিন তালাক প্রথাই সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল!) তারপর মিউট্যান্ট বা পরিবর্তনশীল জেহাদ থেকে সিএএ, এনআরসি, ইউসিসি থেকে ওয়াকফ সংশোধনী আইন হয়ে আজকের দিনে ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে এসআইআর বা ‘স্যার’ আইন। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, যেনতেন প্রকারে বিজেপির মূল টার্গেট কিন্তু এদেশের ২০-২২ কোটি মুসলিম, যারা আদিবাসী এবং দলিতদের চেয়েও সার্বিকভাবে পিছিয়ে আছে বা পিছিয়ে রাখা হয়েছে। ভাবলে আবাক হতে হয় যে, ১৪৬ কোটির দেশে পরপর দু’বার কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় ২০-২২ কোটি ভারতীয় মুসলিমের (দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সংখ্যাগুরু) কোন প্রতিনিধি ইচ্ছে করেই রাখেননি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। তারপরও নিয়মিত ‘সবকা সাথ, সবকা বিকাশ’ এর ‘মন কী বাত’ শোনান ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ ভারতের তিন তিনবারের প্রধানমন্ত্রী।
নরেন্দ্র মোদী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর থেকেই বিজেপি আইটি সেল ও গদি মিডিয়ার সৌজন্যে ভারতবর্ষে সবচেয়ে জনপ্রিয় দুটি শব্দ হল ‘জয় শ্রীরাম’ ও ‘জিহাদ’। আরবি ‘জিহাদ’ শব্দের আভিধানিক অর্থ হল জীবন যুদ্ধে টিকে থাকতে আত্মিকভাবে লড়াই সংগ্রাম করে নিজের অস্তিত্ব বাঁচিয়ে রাখা। এবং সর্বোপরি সব রকম অন্যায়ের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক প্রতিবাদ করা। সর্বপ্রথম জিহাদ হল নিজের মনের কু-প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে। কিন্তু বর্তমান ভারতে জিহাদের যে কত রূপ, তা গদি মিডিয়া না থাকলে হয়ত এজন্মে জিহাদ সম্পর্কে অজানাই থেকে যেত! লাভ জিহাদ, ল্যান্ড জিহাদ, পপুলেশন জিহাদ, ভোট জিহাদ, আর্থিক জিহাদ, করোনা জিহাদ, ইউপিএসসি জিহাদ, কর্মসংস্থান জিহাদ, বন্যা জিহাদ, খাদ্য জিহাদ, দৃষ্টি জিহাদ, মেহেন্দি জিহাদ এবং জিহাদের ডিকশনারিতে শেষতম সংযোজন হল শরবত জিহাদ! হয়ত আসছে দিনে (আচ্ছে দিন নয় কিন্তু) গদি মিডিয়ায় জিহাদের এমন রূপ বেরোবে যে, বাপের জন্মে কোন মুসলিম কেন অমুসলিমরাও কল্পনা করতে পারবে না! স্বাধীনতার পর থেকে গত ৬০ বছরে ৮০ শতাংশ হিন্দু প্রধান দেশে ‘হিন্দু খাতরে মে হ্যায়’ কোনদিন শোনা যায়নি। কিন্তু তিন তিনবার হিন্দু হৃদয় সম্রাট প্রধানমন্ত্রী সহ দেশের একশো শতাংশ গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদে হিন্দু আসীন থাকার পরেও ‘হিন্দু খাতরে মে হ্যায়!’ এর থেকে হাস্যকর আর কী হতে পারে! এই ন্যারেটিভ প্রায় ৮০ শতাংশ হিন্দুদের বেশিরভাগের মন-মননে ঢোকাতে সফল হয়েছে গদি মিডিয়া। গেল দশকে বিজেপি আরএসএসের উগ্র সমর্থকদের মুখে জয় শ্রীরাম ধ্বনির অপব্যবহার শুনলে নিশ্চিতভাবে ভগবান রামও হয়ত আজকের দিনে অখুশিই হতেন।
গত দশ বছর ধরে কখনো জিহাদের নামে, কখনো রামের নামে, কখনো গরুর নামে কিংবা হিজাবের নামে সাধারণ ভারতীয় মুসলিমদের রাস্তা ঘাটে অযথা হেনস্থা, মারধর থেকে, খুনখারাবি (মব লিঞ্চিং) আজকাল দেশে খুবই সাধারণ মামুলি ব্যাপার। পুলিশ নিরাপত্তায় আইনি ডেসিবেল অমান্য করা কানফাটা শব্দে ডিজে বাজিয়ে মন্দির ছেড়ে কেবল মসজিদের সামনে নাচ, গান, গালাগালি, কটূক্তি থেকে জয় শ্রীরাম বলতে বলতে গেরুয়া পতাকা নিয়ে মসজিদের ছাদে উঠে উগ্র হিন্দুত্ববাদী আস্ফালন তো নতুন ভারতের প্রতীক হয়ে উঠেছে। তারপর গেরুয়া বাহিনীর একপেশে উস্কানিতে দাঙ্গা হাঙ্গামা, পাথরবাজি, সরকারি জমির অবৈধ দখলদারিত্বের নামে যোগীবাবার ‘বুলডোজার জাস্টিস’ তো আছেই। সর্বোচ্চ ন্যায়ালয়ের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে বিচারের আগেই কেবল সন্দেহের বশে মুসলিমদের ‘অবৈধ’ (?) ঘরবাড়ি, বস্তি, দোকান, মসজিদ-মাদ্রাসা বুলডোজার চালিয়ে মাটিতে মিশিয়ে দেওয়া নতুন ভারতে গর্বের ব্যাপার। আইন কানুন চুলোয় যাক; মুসলমানদের নাম-নিশানা মিটিয়ে দিলে সোশ্যাল মিডিয়ায় যোগী-দাওয়াই বলে অন্ধভক্তের দল খুশির ইমোজি দেয়!
২০১৪-র লোকসভা ভোটে বিজেপির নির্বাচনী ইস্তেহারে ছিল, বছরে ২ কোটি চাকরি, বিদেশ থেকে কালাধন ফিরিয়ে এনে প্রত্যেক ভারতীয়র একাউন্টে ১৫ লক্ষ টাকা করে দেওয়া, চাষির আয় দ্বিগুণ করা, ১০০টা স্মার্ট সিটি বানানো, দেশজুড়ে বুলেট ট্রেন চালু করা, পেট্রোলের দাম কমিয়ে ৩৫ টাকা করা, মেক ইন ইন্ডিয়া, স্বচ্ছ ভারত অভিযান, ৫ ট্রিলিয়ন জিডিপি, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ আইন, সিএএ-এনআরসি করে ভারতীয় মুসলিমদেরকে তাড়ানোর হাজারো গালভরা প্রতিশ্রুতি ১১ বছর পর আজ ভুয়া প্রমাণিত হয়েছে। অস্বাভাবিক বেকারত্ব, দুর্বল জিডিপি, নিয়ন্ত্রণহীন দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা বেসরকারিকরণ সহ নিজেদের সর্বৈব প্রশাসনিক ব্যর্থতা ঢাকতেই বিজেপি, আরএসএস ও গদি মিডিয়া মিলে গত ১১-১২ বছরে অন্ধ মুসলিম বিদ্বেষ বিষ ছড়িয়ে চলেছে।
দেশে যত সমস্যা আছে তার জিম্মেদার যেন তেন প্রকারে মুসলিমদের ঘাড়ে চাপিয়ে ভোট বৈতরণী পার হওয়া বরাবরই বিজেপির কাছে সবচেয়ে সহজলভ্য মেরুকরণ পন্থা। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, মেরুকরণ রাজনীতি করেই বিজেপি একের পর এক ভোটে জয় হাসিল করেছে। যদিও সর্বশেষ ২০২৪-এর লোকসভা ভোটে বিজেপি ইন্ডিয়া জোটের কাছে জোরালো ধাক্কা খেয়েছে। বিজেপির ভোট চুরি নিয়ে বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধীর তথ্য প্রমাণ-সহ দলিল পেশ এবং দ্রব্যমূল্য, বেকারত্ব, জিডিপি, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধান বাঁচানোর ইতিবাচক কথা বলা রাহুল গান্ধীর জনপ্রিয়তা দিন দিন বাড়ছে, যা আগামী দিনে দেশকে আশার আলো দেখাচ্ছে।








