মানবতার অবক্ষয় ও ভোগবাদের উত্থান
মুহাম্মদ সামিউল গাজী
“মানুষ মানুষকে পণ্য করে, মানুষ মানুষকে জীবিকা করে” — এই বহুল উচ্চারিত গানের পঙক্তির ভিতর লুকিয়ে আছে সভ্যতার দীর্ঘশ্বাস, অন্তহীন আর্তি এবং অব্যক্ত প্রতিবাদ। আধুনিক পৃথিবীতে মানবিকতা যেন এক অদৃশ্য নিলামে বিকিয়ে গেছে; আর সেই নিলামের দাম পরিশোধ করছে দরিদ্র, নিপীড়িত ও বঞ্চিত মানুষজন।
পুঁজিবাদের অদৃশ্য জাল, মানুষের ওপর মানুষের আধিপত্য: আজকের বিশ্বে পুঁজিবাদ এমন এক যান্ত্রিক ব্যবস্থায় রূপ নিয়েছে, যেখানে মানুষ পরিণত হয়েছে পণ্য, আর মানবিকতা পরিণত হয়েছে বিলাসী এক শব্দে। উচ্চবিত্তের ঝকঝকে অট্টালিকায় নেওয়া সিদ্ধান্তের ভার বহন করে গ্রামের কৃষক, শহরের দিনমজুর, কিংবা ফুটপাতে দিন কাটানো অসহায় পরিবার। রাজনীতি, অর্থনীতি ও ক্ষমতার অদৃশ্য চক্রব্যূহে সাধারণ মানুষের জীবন দাঁড়িয়ে আছে এক নির্মম অসমতায়, যেখানে সুযোগ কেবল প্রিভিলেজড শ্রেণির, আর বঞ্চনা নিত্যসঙ্গী গরিবের।
চাকরি, শ্রম ও লক্ষ্য; এক নতুন দাসত্বের নাম: মানবসভ্যতা বহুদিন আগে দাসপ্রথাকে বিদায় দিয়েছে, কিন্তু আজকের কর্পোরেট দুনিয়া তৈরি করেছে দাসত্বের নতুন রূপ। চাকরি, বেতন, টার্গেট, ইনসেনটিভ — সবই এখন আধুনিক শোষণের শিকল। শ্রমিকের ঘাম, কৃষকের পরিশ্রম, এমনকি শিশুর স্বপ্নও বাজারে মুনাফার হিসাবের অঙ্কে পরিণত হয়েছে। এক শ্রেণি দিনরাত কাজ করে বাঁচে, আরেক শ্রেণি সেই পরিশ্রমের ওপর দাঁড়িয়ে অহংকারের প্রাসাদ তৈরি করে।
রাজনীতি, যেখানে মানুষ হয়ে যায় ভোটের পণ্য: রাজনীতি একসময় ছিল মানুষের সেবার ক্ষেত্র, আজ তা পরিণত হয়েছে লাভজনক ব্যবসায়। ভোটের বাজারে মানুষ এখন ‘সংখ্যা’, বর্ণ, ধর্ম ও জাতপাত ‘অস্ত্র’, আর দারিদ্র্য — সবই এখন ভোটের ‘কৌশল’ ও বিভাজনের হাতিয়ার। যারা ক্ষমতায় থাকে, তারা জনগণকে বিভক্ত করে, ভয় দেখায়, শোষণ করে, আর শেষে সেই জনগণেরই মুখ দিয়েই তাদের নামে স্লোগান তুলিয়ে নেয়। সচেতন জনগণের চোখে আজ রাজনীতি মানে চাকরি নয়, ব্যবসা; নেতৃত্ব নয়, প্রভাব; আর সেবা নয়, স্বার্থ। মানুষের কষ্ট, ক্ষুধা ও অশ্রুকে ব্যবহার করা হয় ভোটের মঞ্চে; এমন লজ্জাজনক সময়ে আমরা কীভাবে নিজেদের সভ্য বলি?
ধর্মের নামে স্বার্থের ব্যবসা: সমাজের আরেকটি গভীরতম ক্ষত হল ধর্মের নাম নিয়ে ব্যক্তিস্বার্থের বাণিজ্য। কিছু ধর্মগুরু, মুফতি, পুরোহিত, আচার্য — যাঁরা মানুষের বিশ্বাসকে পুঁজি করে নিজেদের অবস্থান গড়ে তোলেন — তাঁরা ধর্মকে নয়, বরং ধর্মের প্রভাবকে ব্যবহার করেন স্বার্থ রক্ষার ঢাল হিসেবে। যেখানে ধর্মের উদ্দেশ্য হল, মানুষকে মানবতার পথে আনা, ন্যায়ের বোধ তৈরি করা, চেতনার উন্মেষ ঘটানো, সমাজকে সৎ পথে পরিচালিত করা, সবক্ষেত্রে মানবতার মৌলিক নীতিমালা মেনে চলা, ইনসাফ বা ন্যায়পরায়ণ হওয়া, সবার হক বা অধিকার যথাযথ আদায় করা, নৈতিকতা ও মূল্যবোধের ভিত্তিতে জীবন গঠন করা, সেখানে কিছু ব্যক্তি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের নামে অনুদান, শিক্ষা কেন্দ্র, ধর্ম রক্ষার নামে রাজনীতির মঞ্চ থেকে কিংবা সামাজিক সংগঠনের আড়ালে তৈরি করেছেন ব্যক্তিগত লাভের সাম্রাজ্য।
যে রাসূল (সা.) করুণা ও ন্যায়ের পথ দেখিয়েছেন, গুরু নানক মানবতার বাণী দিয়েছেন, বিবেকানন্দ বলেছেন “জীবসেবাই ঈশ্বরের সেবা” — তাঁদের আদর্শ পাশে সরিয়ে রেখে কেউ কেউ নিজেদের মতো করে ‘ফতোয়া’ ও ‘ব্যাখ্যা’ তৈরি করছেন। এই ভণ্ডামি মানুষের অন্তরে ধর্মের প্রতি ভয়, বিভ্রান্তি এবং বিরক্তি তৈরি করছে, যা সমাজের নৈতিক ভিত্তিকে ক্ষয় করছে।
বাড়িঘর ভাঙার রাজনীতি, গরিবদের বেঁচে থাকার অধিকার কেড়ে নেওয়া: আজ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে দেখা যাচ্ছে, দরিদ্র মানুষের শেষ সম্বল একটি ছোট্ট আশ্রয়, সেটিকেও ভেঙে দেওয়া হচ্ছে বুলডোজার দিয়ে ‘অবৈধ’ তকমা লাগিয়ে। বছরের পর বছর শ্রমে গড়া একচিলতে ঘর, যেখানে প্রতিবেশীর ভালবাসা আর জীবনের স্মৃতি মিলেমিশে আছে — সবকিছু এক নির্দেশে ভেঙে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হচ্ছে। তাই প্রশ্ন জাগে, এই ভাঙা ঘরের জায়গায় কোন উন্নয়ন হবে? কার স্বার্থ রক্ষা পাবে? সরকারি নীতির নামে অসহায় মানুষের জীবনকে অনিশ্চয়তার অতল গহ্বরে ঠেলে দেওয়া কি উন্নয়ন? এই কি তবে বিকশিত ভারতের মডেল?
হিন্দু-মুসলিম বৈরিতা; কৃত্রিম বিভাজনে ক্ষতবিক্ষত সমাজ: এই উপমহাদেশ মাওলানা আবুল কালাম আজাদ, মহাত্মা গান্ধী, আম্বেদকর, রামপ্রসাদ বিসমিল, স্বামী বিবেকানন্দ, গুরু নানক, ভগৎ সিং, আসফাকউল্লা খান, রাজা রামমোহন রায় এবং খান আবদুল গফ্ফার খান প্রমুখ — এই সকল আলোকিত ব্যক্তিত্বের শিক্ষা, ত্যাগ, মানবিকতা, অহিংসা, সাম্যচেতনা, সহমর্মিতা ও যৌথ সমাজদর্শনের ভিত্তিতেই গড়ে উঠেছে। কিন্তু আজ আমরা এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে আছি, যেখানে হিন্দু-মুসলমান বিভাজনকে পরিকল্পিতভাবে উসকে দেওয়া হচ্ছে। যে দেশ শত দুর্যোগে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়েছে, সেখানে এখন ধর্মীয় ভেদাভেদকে রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এই বিভাজন কেবল ধর্মের সীমায় আটকে নেই — এটি জাতিগত এবং আর্থ-সামাজিক স্তরেও গভীর ক্ষত তৈরি করছে; যার ফলে গরিব ও প্রান্তিক মানুষের অবস্থান ক্রমেই আরও দুর্বল হয়ে যাচ্ছে।
বৈশ্বিক অমানবিকতা, এক মুখোশধারী সভ্যতা: বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ, হত্যা ও নির্যাতনের খবর আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে, মানুষ এখনো নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে মানুষকেই হত্যা করছে। ইজরাইল-গাজা সীমান্ত, রাশিয়া-ইউক্রেন, আমেরিকা বনাম লাতিন আমেরিকা, সুদান, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন অঞ্চল — সবখানেই রক্তের বাজার চলছে স্বার্থের নামধারী নির্বাচনী অঙ্কে।
সভ্যতার অগ্রগতি যত দ্রুত হচ্ছে, মানবিকতার পতনও ততই ত্বরান্বিত হচ্ছে। তবু মানবতার আলো নিভে যায়নি। এই অন্ধকারের মধ্যেও কিছু মানুষ আছেন, যাদের জন্য পৃথিবীতে এখনো মানবতা বেঁচে আছে। কেউ নিজের অঙ্গদান করে অপরিচিতকে জীবন দেন; কোনো শিক্ষক নিঃস্ব ছাত্রের পাশে দাঁড়ান; কোনো পথিক ক্ষুধার্তকে খাবার দেন; কোনো তরুণ রক্ত দান করেন অচেনা রোগীর জন্য। বিপদের মুহূর্তে, দুর্ঘটনাস্থলে, প্রাকৃতিক দুর্যোগে কত মানুষকে দেখা যায় ধর্ম, জাত, বর্ণ ইত্যাদি না দেখে এগিয়ে এসে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে। হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান পরিচয় ছাপিয়ে যে মানুষটি নিঃস্বার্থভাবে অন্যকে তুলে ধরে, তার মধ্যেই মানবতার প্রকৃত শক্তি প্রকাশ পায়। ইতিহাসের প্রত্যেক যুগেই এমন উদাহরণ অসংখ্যবার প্রমাণ করেছে,
মানুষ এখনো পুরোপুরি পণ্য হয়নি। মানবিকতা এখনো বেঁচে আছে, ক্ষীণ হলেও দীপ্তিমান।
মানুষকে আবার মানুষ হতে হবে: ইতিহাস একদিন যখন এই সময়কে বিচার করবে, আমরা কি লজ্জা পাব না? যেখানে মানুষকে মানুষ নয়, ‘দল’, ‘ধর্ম’, ‘বর্ণ’, ‘ভোটব্যাঙ্ক’ হিসেবে দেখা হয় — সেই সমাজ কি সত্যিকারের সভ্য? আমরা কি পারব না মানুষকে আশ্রয় দিতে? একজন অসহায় মানুষ তোমার হাত ধরে দাঁড়ালে তোমার কি কমে যাবে? না, বরং সমাজটা আরও সুন্দর হবে। আমাদের দরকার এমন এক পৃথিবী, যেখানে মানুষ মানুষকে ব্যবহার করবে না, বরং পাশে দাঁড়াবে; যেখানে ভালবাসা বিক্রয়যোগ্য পণ্য হবে না; যেখানে ন্যায়বিচার ক্ষমতার মুদ্রায় কেনা-বেচা হবে না; যেখানে নাগরিক পরিচয়ের নিচে থাকবে একটাই পরিচয় — আমি মানুষ।








