কোচবিহার রাজবাড়িতে সংঘের শতবর্ষ উদযাপন
মো. ইরফান সাদিক
নতুন পয়গাম, কোচবিহার, ২৩ সেপ্টেম্বর: উত্তরবঙ্গের কোচবিহার বরাবরই শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের পীঠস্থান। যেখানে সাম্প্রদায়িকতা অপ্রত্যাশিত ছিল এতকাল। কিন্তু এখানকার ঐতিহ্যবাহী রাজবাড়িতে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের শতবর্ষ উদযাপন আমার প্রাণের শহরে কাম্য নয়। প্রশ্ন হল, সম্প্রীতির আঁতুড়ঘর বাংলার বুকে এভাবে মহড়া কার অনুমতিতে হল!
সবার সংগঠন সম্মেলন অনুষ্ঠিত হোক। কিন্তু সেটা কোনো নির্দিষ্ট ধর্মীয় গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়কে নিশানা করে যেন না হয়। হিন্দু, মুসলিম, শিখ, ইসাহী সবাই যে যার ধর্ম প্রচার প্রসার করবে। ধর্মনিরপেক্ষ ভারতবর্ষে এটা স্বাভাবিক। কিন্তু কোনো সংগঠনের উদ্দেশ্য যদি ভিন ধর্ম বা সম্প্রদায়ের মানুষদের ওপর অত্যাচার করা হয়, তাহলে সেটা কখনোই মানব কল্যাণে নিয়োজিত সংগঠন হতে পারে না।
আসএসএস-এর জন্ম ১৯২৫ সালে। অর্থাৎ মাত্র একশো বছর আগে। আর হিন্দু বা সনাতন কয়েক হাজার বছরের প্রাচীন ধর্ম। তাহলে সংঘ পরিবারের বিরোধিতা মানে হিন্দু ধর্মের বিরুদ্ধাচারণ করা — এই যুক্তি ধোপে টেকে না। হিন্দু ধর্ম খাতরে মে হ্যায় বলে যে উসকানি দেওয়া হয় বা জুজু দেখানো হয়, তা কতদূর সত্য, সে সম্পর্কে জানতে হলে শঙ্করাচার্য, স্বামী বিবেকানন্দ, রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব প্রমুখ মনীষীর কাছে ধর্মের প্রকৃত পাঠ নেওয়া উচিত।
আরএসএস শুধুমাত্র সুড়সুড়ি দিয়ে সহানুভূতি কুড়োতে কত কি-না করে। দলিত ও মুসলিমদেরকে প্রহার করে উল্টে আক্রান্তের উপরেই দোষ চাপিয়ে ভিক্টিম কার্ড খেলে। তারা ন্যারেটিভ তৈরি করে যে, এদেশে হিন্দুরা বিপদে রয়েছে। অথচ যুগ যুগ ধরে এদেশের মাটিতে হিন্দু-মুসলিম ও অন্যান্য সম্প্রদায় প্রতিবেশি ও সহ-নাগরিক হিসেবে শান্তি ও সম্প্রীতির সঙ্গে সহাবস্থান করে আসছে। কোথাও কোনো গণ্ডগোল ছিল না। সবাই কত সুখে-শান্তিতে জীবনযাপন করে আসছিল। দু-একটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা বাদ দিলে এদেশ বরাবরই নানা ভাষা, নানা মত, নানা পরিধান সত্ত্বেও বৈচিত্রময়। আর বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্যই ভারতবর্ষের সনাতন ঐতিহ্য ও পরম্পরা।
গঙ্গা যমুনা তেহজিবকে ধূলিসাৎ করে দিয়ে গত এক দশকে আমদানি করা হল নতুন তত্ত্ব। আর এই এক দশক ধরেই আওয়াজ তোলা হচ্ছে, হিন্দু ধর্ম নাকি সংকটে। আসলে কোন ধর্মই সংকটে নেই। সংকটে রয়েছে দেশের শিক্ষিত বেকার যুবক-যুবতীরা, মূল্যবৃদ্ধি, কর্পোরেট ট্যাক্স মুকুব, ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে অর্থনীতির মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়া, লাভজনক রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা জলের দরে বিক্রি করে দেওয়া এবং সর্বোপরি কেন্দ্র সরকারের কর্পোরেট-বান্ধব নীতিই দেশকে গভীর সংকটে ফেলেছে। যেখান থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর পথ নেই। এসব কেন করা হচ্ছে, তার যথাযথ উত্তর কিন্তু সংঘ পরিবার কিংবা বিজেপির কাছে নেই। তারা কেবল স্টিরিওটাইপ চালিয়ে যাচ্ছে। জবাব চাইলেই আওড়ানো হবে সে…ই পাকিস্তান, মুঘল আমল, বিরিয়ানি, লাভ জিহাদ তত্ত্ব।
স্বামী বিবেকানন্দ শিকাগোয় ঐতিহাসিক ভাষণে বলেছিলেন, তিনি এমন একটি ধর্মের অন্তর্ভুক্ত হতে পেরে গর্বিত, যা সর্বজনীন সহনশীলতা ও গ্রহণযোগ্যতার পাঠ শেখায় এবং সকল ধর্মকে সত্য বলে গ্রহণ করে। এই বক্তৃতার মাধ্যমে তিনি পাশ্চাত্য সমাজে প্রথম হিন্দু ধর্ম প্রচার করেন এবং বলেছিলেন, তাঁর লক্ষ্য হল ভারতের দরিদ্র মানুষের জন্য সাহায্য চাওয়া। এই বক্তৃতার সূচনা হয়েছিল ‘আমেরিকার ভগিনী ও ভ্রাতৃবৃন্দ’ সম্বোধন দিয়ে, যা সারা বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। বিবেকানন্দের থেকে বেশি ধার্মিক আর মানবিক আধুনিক ভারতে ক’জন আছে।
বিশ্বের বৃহত্তম জনসংখ্যা ও বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশে কেউ কারো ওপর ধর্মীয় বা সামাজিক মতবাদ, মতাদর্শ জোর করে চাপিয়ে দিতে পারে না। কারো ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকার কেড়ে নিতে পারে না। এতে সমাজ ও দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবে, মানুষ আর মানুষকে মানবিক দৃষ্টিতে দেখবে না, পরস্পরের মধ্যে ঘৃণা-বিদ্বেষের উদ্রেক হবে, যা অনভিপ্রেত।
মানুষকে ভয় দেখিয়ে হয়ত সাময়িক জয়ী হওয়া যায়, কিন্তু মানুষের মন জয় করা যায় না। অতীত সাক্ষ্য দেয়, কোনো জাতি বা গোষ্ঠী অত্যাচার করে ইতিহাসে কুখ্যাত হয়েই পরিচিতি পেয়েছে এবং তাদের অনুসারীর সংখ্যা কমেছে, বই বাড়েনি। প্রবল প্রতাপশালী হিটলার, মুসোলিনী কিংবা ফেরাউনের একজনও সমর্থক আজ নেই, যে চিৎকার করে বলবে, আমি হিটলার, মুসোলিনী অথবা ফেরাউনকে ভালবাসি, কিংবা আমি নাৎসীবাদ, ফ্যাসিবাদের অনুগামী! কারণ, তারা ছিল কুখ্যাত দানব বা নরপিশাচ, যারা রক্তাক্ত করেছে ইতিহাসকে, হত্যা করেছে বিশ্ব মানবতার নিষ্পাপ শিশুটিকে।








