“এ কোন সকাল রাতের চেয়েও অন্ধকার!”
পাভেল আখতার
এক!! ‘শিক্ষক’ শব্দটির মহিমা অপার, অনন্ত ! পাঠ্য বইয়ের নিষ্প্রাণ তথ্য শিক্ষার্থীর মগজে ঢুকিয়ে কিছু পড়ানো যায়; কিন্তু ‘শিক্ষক’ হতে গেলে আরও ‘অনেক মহিমা’র প্রয়োজন হয়! ‘শিক্ষার্থী’ কোনও নির্জীব বস্তু নয়! তার যে একটি নিভৃত ও সুকুমার অন্তর্জগৎ আছে, একজন ‘শিক্ষক’ সেই সুপ্ত অন্তর্জগৎ-এর বিকাশসাধন করবেন। শিক্ষার্থীকে ‘ভাবতে’ শেখানো, তার চিন্তা ও বিশ্লেষণী ক্ষমতাকে দীপ্ত ও শাণিত করে তোলা, তাকে ‘স্বপ্নদর্শী’ করে তোলা, ‘জগতের আনন্দযজ্ঞে’ নিমন্ত্রিত হওয়ার প্রেরণা ও সমাজে শিকড় ছড়িয়ে থাকা অজস্র ‘বিষাদবৃক্ষ’ উৎপাটনের সংকল্প তার হৃদয়ে প্রোথিত করে দেওয়ার সুরে একজন ‘শিক্ষক’ তার সত্তাটিকে বাঁধবেন বড় যত্নে। ‘শিক্ষার্থী’কে তিনি করে তুলবেন যথার্থ ‘মুক্ত মানুষ’। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর সম্পর্কে থাকবে ‘বন্ধুত্বের উষ্ণতা’। একজন যথার্থ শিক্ষকের মধ্যে থাকবে সর্বোচ্চ পর্যায়ের নৈতিকতা, মূল্যবোধ, সততা, নিষ্ঠা, দায়িত্ববোধ ইত্যাদি। পোশাকে, বচনে, পরিচ্ছন্নতায় সবকিছুতেই তিনি হয়ে উঠবেন সৌন্দর্যের মূর্ত প্রতীক। ‘যোগ্য শিক্ষক’ কথাটি নিয়ে সমাজে যে চর্চা, তার মূলে কেবল অনুরণিত হচ্ছে মেধার ধার ও ভার। এই চর্চা নিতান্ত সংকীর্ণ ও সরল। ‘যোগ্য শিক্ষক’ নয়, আমাদের আসলে দরকার ‘যথার্থ শিক্ষক’। এবং, একথা বলাই বাহুল্য, এই জায়গায় বিরাট শূন্যতা রয়েছে!
দুই।। আজকাল এখানে-ওখানে অনেক ‘সাহিত্যসভা’ হয়। অনেকেই সোৎসাহে স্বরচিত কবিতা, গল্প ইত্যাদি পাঠ করে থাকেন। হাততালি পড়ে। ‘সাহিত্য’ নিয়ে বক্তৃতা হয়। এক্ষেত্রেও হাততালি কম পড়ে না। উল্লেখ্য, ‘সাহিত্যসভায়’ কিছু ‘বিনোদনের’ ব্যবস্থাও থাকে। সাহিত্যের নন্দনবনে হয়ত বিনোদনের যথেষ্ট অভাব আছে, সেই কল্পনায় এই ‘অতিরিক্ত’ আয়োজন ! আমি বুঝতে অপারগ যে, এইসব আয়োজনে সাহিত্যের ঠিক কতটা ‘উপকার’ হয়ে থাকে। যেসব লেখক ‘হাততালির’ প্রত্যাশায় থাকেন, তাদের দ্বারা আর যাই হোক ‘সাহিত্য’ হওয়া সম্ভব নয়। কারণ, যারা ‘হাততালি’ দেয়, তারা যতটা ‘হাত’ আর ‘তালি’ বোঝে, ঠিক ততটাই ‘সাহিত্য’ বোঝে কি না, সে-নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। আর আয়োজকদের কথা?
মনে পড়ছে, ‘অগ্নীশ্বর’ নিতান্ত অনীহা সত্ত্বেও এক ‘সাহিত্যসভায়’ উপস্থিত হয়ে মাত্র দুটি বাক্য বলেছিলেন। ‘অনিবার্য কারণে’ উপস্থিত হতে বিলম্ব হওয়ায় মার্জনা চেয়ে নেওয়া। আর, ‘বিনোদনের প্রতি’ অত্যধিক ঝোঁককে চিহ্নিত করা। একদা বনফুল ‘অগ্নীশ্বর’-কে দিয়ে যে ‘পর্যবেক্ষণ’ ব্যক্ত করেছিলেন, তা শাখা-প্রশাখায় আরও পল্লবিত হয়েছে। ক্রমাগত হয়ে চলা ‘সাহিত্যসভায়’ যে ‘ককটেল’ পরিবেশিত হয়, তার দ্বারা সাহিত্যের কোনও ‘উপকার’-ই হয় না। সত্য এই যে, ‘সাহিত্যবোধ’ বা ‘সাহিত্যমনস্কতা’ একেবারে ‘ভিন্ন কিছু’ প্রত্যাশা করে। অনিঃশেষ ‘সাহিত্যসভা’ যেন সেই বিজ্ঞাপনকে মনে করিয়ে দেয়: ”দেখো, আমি বাড়ছি মাম্মি !” আদৌ বাড়ে না, কিন্তু বলা চাই!
তিন।। সাহিত্য অথবা চলচ্চিত্র কি পাঠক ও দর্শকের রুচি অনুসরণ করবে, না-কি রুচি নির্মাণ করবে, তা নিয়ে একটা মতভেদ দেখা যায়। রুচি নিম্নগামী হলে তার সংস্কারের প্রয়োজন হয়। তখন রুচির পুনর্নির্মাণ করা আবশ্যক হয়ে পড়ে। রুচির নিম্নগামিতা মূলত আত্মবিস্মৃতি ও অপরকে অনুকরণের সূত্র ধরে আসে। বাঙালির একটি নিজস্ব জীবনবোধ ও জীবনচর্যা আছে। সেখানে একটা মস্ত শিথিলতা এসেছে। আত্মবিস্মৃতি ঘটেছে। পাশ্চাত্য সংস্কৃতির প্রতি আকর্ষণ ও অনুরাগ তার অন্যতম নেপথ্য অনুঘটক। তারই ফলশ্রুতি রুচির পরিবর্তন, যাকে রুচির অবনমন বা নিম্নগামিতা বলা যায়। এ প্রসঙ্গে একটি প্রশ্ন ওঠে, বাঙালির সাহিত্যে ও চলচ্চিত্রে ‘কল্পিত’ পাশ্চাত্য জীবনবোধের অনুরণন কি তার ‘আন্তর্জাতিক’ হয়ে ওঠার মাপকাঠি?
সাহিত্য ও চলচ্চিত্র তার নিজস্ব মাটি-জল-হাওয়ার কথাই বলবে। এই প্রক্রিয়ায় রচিত হবে তার নিভৃত প্রাণের গহন, নির্মল ছবি। পাশ্চাত্যের জীবনবোধ যদি বাঙালির সাহিত্যে ও চলচ্চিত্রে ফুটে ওঠে, তাহলে তা কৃত্রিম হতে বাধ্য। অনুসরণ ও অনুকরণপ্রিয়তা কখনওই বাঞ্ছনীয় নয়। রবীন্দ্রনাথের ‘পূর্ব ও পশ্চিম’ এবং প্রমথ চৌধুরীর ‘আমরা ও তোমরা’ প্রবন্ধ দুটি স্মরণীয়। বিশ্বায়নের জগৎজোড়া ফাঁদে আটকা পড়ে বাঙালি যদি তার স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক সত্তাকে বিসর্জন দেয় তাহলে তার অর্থ দাঁড়ায় যে, সে গভীর হীনম্মন্যতায় ভুগছে, অথচ তার কোনও কারণ নেই!
চার।। জীবনের নানা দিগন্তে এখন ‘ভাঙন’-এর ছায়া। প্রায় সবকিছুই ক্রমশ ভেঙে যাচ্ছে। সম্পর্ক, মূল্যবোধ, প্রতিবেশিত্ব, ঐতিহ্য ইত্যাদি। দেখছি, পরিবারও ভেঙে যাচ্ছে। গণ্ডিগুলো ছোট হয়ে আসছে। ‘আমরা’ নয়, সবখানেই চলছে ‘আমি’র দাপট। শিল্প ও সাহিত্যের একটি দিক নিয়ে বিতর্ক আছে। শিল্প ও সাহিত্য কি যা আছে তারই প্রতিনিধিত্ব করবে, না-কি যা নেই অথচ থাকা উচিত, অর্থাৎ একটা স্বপ্নের কথা, স্বপ্ন দেখার কথাও বলবে। একান্নবর্তী পরিবার এখন লুপ্তপ্রায়। নেই বললেই চলে। কিন্তু, সমস্ত বাংলা সিরিয়াল ভাঙা কাঁসরের ঘণ্টার মতো বাজিয়েই চলেছে একান্নবর্তী পরিবারের গল্প। স্বপ্নের পুনরুজ্জীবনের কথা যদি বলা হয়, তাহলে নিশ্চয় দোষ হয় না। কিন্তু, একটা জিনিস কিছুতেই বোঝা যাচ্ছে না যে, একান্নবর্তী পরিবারে মাসি, পিসি, ননদ, জামাই, ভাগ্নে, ভাগ্নি এরা আবার কোন কালে ছিল? স্বপ্ন দেখাতে গিয়ে এ তো অতিকায় নির্মাণ হয়ে যাচ্ছে ! আহা ! ”তুমি কোন্ ভাঙনের পথে এলে !”
পাঁচ।। প্রয়াত সাহিত্যিক রমাপদ চৌধুরী স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে একবার বলেছিলেন, একজন লেখকেরও ‘অবসর’ থাকা উচিত, চাকরিজীবীর মতো। তিনি কলম তুলে রেখেছিলেন ! কিছুদিন আগে একই কথা বলেছেন কবি জয় গোস্বামী। কিন্তু দেখা যায়, লব্ধপ্রতিষ্ঠ অনেক লেখক বহুদিন আগেই ‘ফুরিয়ে’ যাওয়ার পরেও তাঁদের লেখা অব্যাহত ! এর কারণ দুর্বোধ্য। এতে কি সাহিত্যের আদৌ কোনও কল্যাণ হয়? তবে শুধু লেখকদের নয়, শিল্পীদেরও ‘অবসর’ থাকা উচিত। স্বর্ণযুগের বিখ্যাত কিছু শিল্পীর শেষ বয়সে গাওয়া রবীন্দ্রনাথের গানগুলো যখন শুনি তখন খুবই বেদনাবোধ করি ! কী দরকার ছিল তাঁদের ওই বয়সে আর গান গাওয়ার ?
ছয়।। নতুন প্রাণের সখা, যেন ‘সব পেয়েছির দেশ’ AI-এর সাহায্য নিয়ে রূপের ছটায় ভুবন মাতানো হোক অথবা চিন্তা ও লেখার ভুবনে সিদ্ধিলাভ — দর্শক ও পাঠকের দ্রুত চিত্তজয়ের বাসনা অনিয়ন্ত্রিত ! সাময়িক মুগ্ধতা কুড়োনোর লীলাখেলায় ভেসে যাচ্ছে মনে স্থায়ী সবুজ প্রেমের দাগ রেখে যাওয়ার ইচ্ছে ! ”আমি রূপে তোমায় ভোলাব না, ভালবাসায় ভোলাব !” এমন গান লেখা রবীন্দ্রনাথ কি আর জানতেন যে, শুদ্ধ ভালবাসা দেওয়া-নেওয়ার প্রক্রিয়ার বিপরীতে যে দাঁড়িয়ে থাকে কৃত্রিম রূপের ঠাট ও ঠমক, সেকথা বাঙালি কালে কালে বিস্মৃত হবে ?








