আগেভাগে লক্ষ্মীপুজো করে বাঙালির ক্ষতি
জহর সরকার
খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতাব্দীতে হিন্দুদের মূর্তিপুজোর আমরা প্রথম নিদর্শন পাই, আর যা দু-তিনটে দেবদেবীর আকার পাই, তার মধ্যে লক্ষ্মী অন্যতম। সাধারণভাবে লক্ষ্মীর পুজো হত বিষ্ণুর সাথেই। পৃথকভাবে লক্ষ্মীর সবচেয়ে জমজমাট পুজো হয় দীপাবলি উপলক্ষে। কিন্তু সারা ভারত যেখানে দেওয়ালির রাত্রে লক্ষ্মীর পুজো করে, বাঙালি তখন আলাদা থাকে। তাঁরা এই অনুষ্ঠানটি আগেই সেরে নেয় দুর্গাপূজার ঠিক পরে কোজাগরী পূর্ণিমার দিন। আমরা দীপাবলি উৎসবের প্রথম উল্লেখ পাই রামায়ণে, রামচন্দ্র যখন যুদ্ধজয় করে সীতাকে নিয়ে ফিরলেন, তখন অযোধ্যার ঘরে ঘরে দীপালিকায় আলো জ্বলেছিল। সেখানে অবশ্য লক্ষ্মীর কোনও নাম-গন্ধ নেই।
তৃতীয় বা চতুর্থ শতাব্দীতে রামায়ণের মোটামুটি সমসাময়িক বাৎস্যায়ানের কামসূত্রে যক্ষের রাত্রির কথা আছে, যে রাতে ছোট ছোট প্রদীপ জ্বালিয়ে জনপদ সাজাতে হয়। এটি এক লোকাচার, যা ব্রাহ্মণ্যতন্ত্র ক্রমশ গ্রহণ করে নিয়েছিল। কিন্তু এখানেও লক্ষ্মীর কোনও প্রত্যক্ষ উল্লেখ নেই।
অবশ্য যক্ষ থেকে যেমন ঐশ্বর্যের দেবতা কুবের এলেন, লক্ষ্মী যদি তেমনই এসে থাকেন, তা হলে আলাদা কথা। তবে এটা ঠিকই যে, পুরাণের দেবী লক্ষ্মী এক সময় যক্ষদের দীপালোকিত রাত্রির উৎসবটি নিজের করে নেন।
এবার ইতিহাস থেকে ভূগোলে যাওয়া যাক। হিন্দি বলয়ের হৃদয়পুরে দীপাবলি উৎসব প্রধানত লক্ষ্মীরই পুজো। দাক্ষিণাত্যে গণেশ, শিব এবং বিষ্ণুকেও লক্ষ্মীর পাশাপাশি প্রভূত ভক্তি সহকারে পূজা করা হয়। লক্ষ্মীর কথা পুরাণে আছে। সমুদ্র মন্থনের সময় তিনি দেবতা এবং অসুরদের সামনে প্রথম আবির্ভূত হন। তাঁর সঙ্গে জল, পদ্ম এবং হাতির খুব ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ লক্ষ্য করা যায়। বোঝা যায়, এর সঙ্গে ধান্যপ্রধান কৃষি-সভ্যতার একটা সম্পর্ক আছে, তথাকথিত আর্যরা যমুনা পার হওয়ার পরে এবং গঙ্গাবিধৌত অঞ্চলে জলা-জঙ্গল পরিষ্কার করে চাষবাস শুরু করার পরে যে সভ্যতা বিস্তার লাভ করে।
এই সূত্রেই এসেছে গজ-লক্ষ্মীর রূপকল্পনা: দেবী পদ্মফুলের উপর দাঁড়িয়ে, দু’পাশে দুটি হাতি তাঁকে স্নান করিয়ে দিচ্ছে। খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতাব্দীর শক রাজা আজিলসেস-এর একটি মুদ্রায় এই রূপ দেখা গেছে, তাতেই বোঝা যায় ধারণাটি কত প্রাচীন। মোদ্দা কথা হল, ধরণী শস্যশালিনী হলেই প্রচুর সম্পদ আসে এবং তখনই সম্পদের দেবী ধনলক্ষ্মী, ধান্যলক্ষ্মী, গজলক্ষ্মী — নানান নামে পূজিত হন।
চঞ্চলা বলে লক্ষ্মীর দুর্নাম আছে। হিন্দুধর্ম কখনওই সম্পদের সাধনাকে ছোট করেনি। কিন্তু তা হলে কেন লক্ষ্মীর আরাধনার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে জুয়াখেলার আচার? যেটুকু সম্পদ আছে তা উড়িয়ে দেওয়া কেন? এর একটা প্রেরণা এসেছে অবশ্যই কৈলাস পর্বত থেকে, পার্বতী নাকি সেখানে পাশাখেলায় মহাদেবকে হারিয়ে দিয়েছিলেন এবং বলেছিলেন, দীপাবলিতে জুয়া খেললে মানুষ সারা বছর সম্পদশালী হবে।
বাঙালি আজ যা করে, ভারত নাকি কাল তা করবে। লক্ষ্মীর আরাধনায় বাঙালি অনেকটা এগিয়ে — দীপাবলির পক্ষকাল আগেই তার কোজাগরী লক্ষ্মীপুজো সারা হয়ে যায়। কিন্তু আমাদের লক্ষ্মীর দু-পাশে হাতি নেই, আছে এক প্যাঁচা — যাকে অনেক ভারতীয় অশুভ মনে করে। বাংলায় আগেকার আউস ধান পাকলেই আশ্বিনে দুর্গাপুজো করত, আর ধনের দেবীকে এক সাথে কোজাগরী পূর্ণিমায় ধন্যবাদ দিত। অবশ্য এটি পূর্ববঙ্গে বেশি ছিল। পশ্চিমবঙ্গে অনেক পরিবার এখনও কালীপুজোর দীপাবলির সময়ই দীপান্বিতা লক্ষ্মীর পুজো করে।
আউশ ধান তো প্রায় উঠেই গেছে, কিন্তু আমাদের সর্বজনীন দুর্গাপুজো এখনও সেই অক্টোবরের গরমের মধ্যেই হয়। আর ঠিক পরেই কোজাগরী পূর্ণিমাতেই সর্বজনীন লক্ষ্মীপুজো সেরে নেওয়া হয়। এখন বাঙালি আমন (যার ফসল ডিসেম্বর মাসে) ও বোরো ধান (ফসল যার মার্চ এপ্রিলে) উপরই বেশি নজর দেয়, আর উপার্জনও করে।
কিন্তু সেই আগেভাগেই লক্ষ্মী পুজো করার ফলে কী না জানি না — মা লক্ষ্মী বিশেষ আশীর্বাদ তো দেনই না — বাংলার দিকে ঘাড় ঘুরিয়েও দেখেন না। এ বিষয়ে আমাদের কিছু একটা করা দরকার। অবশ্য ওই দিদিমনির লক্ষ্মীর ভান্ডারে হাত না দিয়ে।








