এনআরসি: আমাদের প্রস্তুতি ও অবহেলা
মুহাম্মাদ শামসুদ্দোহা কাসেমী
বর্তমান পরিস্থিতিতে যদি কোনো বিষয় মুসলিম মিল্লাত বা উম্মাহকে সবচেয়ে বেশি আশঙ্কিত ও উদ্বিগ্ন করে রেখেছে, তা হল এনআরসি। এটি আসলে একটি ষড়যন্ত্র, যার মৌলিক লক্ষ্য মুসলমানদের ক্ষীণ, নির্বাসিত ও অধীন করে ফেলা। এটি শুধুমাত্র একটি প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নয়; বরং একটি সংগঠিত রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিকল্পনা, যার দ্বারা একটি নির্দিষ্ট জাতি বা সম্প্রদায়কে তাদের পরিচয় ও অস্তিত্ব সংকটের মুখে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে।
ডিটেনশন সেন্টার: আসন্ন ঝড়ের আগাম সংকেত
কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক সব রাজ্যকে নির্দেশ দিয়েছে ডিটেনশন সেন্টার নির্মাণের জন্য। এই ভবনগুলো শুধু ইট-পাথরের নির্মাণ নয়, এগুলো এক ভয়ঙ্কর ভবিষ্যতের প্রতীক। প্রশ্ন হল, এই খালি কারাগারগুলো কাদের জন্য তৈরি করা হচ্ছে? শুধুমাত্র কয়েকজন ‘অবৈধ বিদেশির জন্য কি? নাকি তাদের জন্য, যারা অসংখ্য মুসলমান, যাদের পূর্বপুরুষরা আমাদের এই প্রাণপ্রিয় দেশের স্বাধীনতার জন্য রক্ত দিয়েছেন, জীবন দিয়েছেন। কিন্তু শুধুমাত্র নথিপত্র সংরক্ষণ না করার অভাবে তাদেরকে
বে-নাগরিক ঘোষণা করা হতে পারে। আসামের পরিস্থিতি তো আমাদের সকলের সামনেই রয়েছে; সেখানে লাখ লাখ বাঙালি হিন্দু এবং বাংলাভাষী মুসলিমকে গৃহহীন ও বে-সাহারা করে দেওয়া হয়েছে।
মুসলমানদের রাজনৈতিক অদৃশ্যতা:
দেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতির সবচেয়ে বড় ক্লেশ হল, ২০ শতাংশ মুসলিম জনসংখ্যা থাকা সত্ত্বেও আমাদের কোনো শক্তিশালী ও কার্যকর আওয়াজ শাসনকক্ষে গুঞ্জে না ওঠা। বড় দলগুলো আমাদের কেবল ভোট-ব্যাংক মনে করে, আর কয়েকজন “রাজনৈতিক দোকানদার”জন্মগত উন্মাদনা-ভাষণে জনগণকে ব্যস্ত করে নিজেদের আসন সুরক্ষিত রাখে। কিন্তু এনআরসি-র মতো প্রাণঘাতী ইস্যুতে কোনো সুসংগঠিত রাজনৈতিক বা আইনি পরিকল্পনা দেখা যায় না।
অবহেলার তিক্ত ফল:
ভারতীয় মুসলমানরা এখনও এই ভ্রান্ত ধারণায় আচ্ছন্ন যে, তাদের নাগরিকত্ব কখনোই ঝুঁকিতে পড়বে না, বা কিছু প্রতিবাদী বক্তৃতা দিয়ে এই সওয়ারি থামিয়ে দেওয়া যাবে। বাস্তবতা হল, আজ নাগরিকত্ব নির্ধারণ হচ্ছে কাগুজে প্রমাণের ওপর। জমি-ভিটার কাগজপত্র, স্থায়ী নিবাস-রেকর্ড, শিক্ষাগত সনদ ইত্যাদি যাদের কাছে এসব নেই, তারা সরাসরি ঝুঁকির মুখে। লক্ষ লক্ষ দরিদ্র, কৃষক, মজুর, শ্রমজীবী ও গ্রামীণ মুসলিম, যারা জীবিকার তাগিদে ব্যস্ত, তারা সহজেই এই খেলার শিকার হতে পারেন।
জাগরণ ও বাস্তব পদক্ষেপ:
এখন সময় এসেছে আবেগী স্লেআগান ছেড়ে বাস্তব উদ্যোগ নেওয়ার।
১) আইনি প্রস্তুতি: আপনার সমস্ত দলিলপত্র, নথিপত্র ইত্যাদি প্রয়েজন মাফিক সঠিক, নিরাপদ ও আপডেট রাখুন। এটি কেবল কাগজপত্র নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করার নিশ্চয়তা।
২) রাজনৈতিক চাপ: এমন রাজনৈতিক নেতৃত্ব গড়ে তুলতে হবে, যারা কেবল ক্ষমতার লোভে নয়, জনগণের সমস্যা উপস্থাপনার সাহস রাখে ও কার্যকরভাবে এগুলো পঞ্চায়েত থেকে সংসদ পর্যন্ত পৌঁছে দিতে পারে।
৩) ঐক্য ও সংহতি: এটা সাম্প্রদায়িক বা গোষ্ঠীগত বিভেদের সময় নয়; একটি জাতির মতো একতাবদ্ধ হওয়ার সময়।
৪) উলামা ও বুদ্ধিজীবীদের নেতৃত্ব: মসজিদ-মাদ্রাসাগুলোকে সচেতনতার কেন্দ্র বানাতে হবে। যদি আমরা এই দায়িত্ব পালন না করি, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আমাদের ক্ষমা করবে না।
শেষ কথা:
আজ যেসব খালি ডিটেনশন সেন্টার নির্মিত হচ্ছে, কাল তা মূলত মুসলমানদের জন্য কারাগার বা বন্দিশালা ও শাস্তি-কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে। সময় অত্যন্ত কম এবং ষড়যন্ত্র অনেক বড়। তাই আমাদের ঘুম ভাঙিয়ে বেঁচে থাকার লড়াই সাজাতে হবে বুদ্ধিমত্তা ও কৌশলে। যদি এই সুযোগে আমরা লাটে পড়ে যাই, ইতিহাস আমাদের কপালে লিখে দেবে অবহেলা, নিষ্প্রাণতা ও কাপুরুষতার ছাপ।








