ফোমো: আধুনিক সমাজের অদৃশ্য মনস্তাত্ত্বিক মহামারী
সাদ্দাম হোসেন
আজকের ডিজিটাল যুগে আমরা প্রত্যেকে স্মার্টফোনে চোখ গুঁজে সোশ্যাল মিডিয়ায় অবিরাম স্ক্রলিংয়ের ভেতর ক্রমশ ডুবে যাচ্ছি। বন্ধুরা একের পর এক হ্যাশট্যাগ দিচ্ছে, সুখের মুহূর্তের ছবি পোস্ট করছে কারও চাকরি হয়েছে, কেউ বিদেশে পাড়ি দিচ্ছে, কারও প্রি-ওয়েডিং শ্যুট ভাইরাল, কেউ দামী গাড়ি বা ফোন কিনেছে, আবার কেউ রাতারাতি ইনফ্লুয়েন্সার হয়ে উঠছে। এই দৃশ্যগুলো দেখতে দেখতে কখনো কখনো মনে হয় — আমি কি তবে সবার থেকে পিছিয়ে পড়ছি? নাকি সত্যিই ধীরে ধীরে বাদ পড়ে যাচ্ছি? ঠিক এই অনুভূতিটাই হল ফোমো বা Fear of Missing Out. অর্থাৎ, যা আমি পাচ্ছি না, তা অন্য সবাই পাচ্ছে, এমন ভাবনা থেকেই তৈরি হয় এক অস্বস্তিকর মানসিক চাপ ও অস্থিরতা।
ফোমো এক অদৃশ্য অসুখ:
একটা সময় ছিল, মানুষের ভয়ের উৎস ছিল বাস্তব বিপদ-অগ্নিকাণ্ড, দুর্ঘটনা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ। এখন সেই জায়গায় এসেছে এক নতুন, অদৃশ্য, কিন্তু আরও ভয়ংকর বিপদ-ফোমো। সোশ্যাল মিডিয়ার চমকদার ও সাজানো জীবনের সঙ্গে নিজের বাস্তব জীবনের তুলনা করতে করতে আমরা গভীরে একটি অসন্তোষ, ঈর্ষা, অপরাধবোধ ও আত্ম-ঘৃণা তৈরি করি। মানুষ এখন ব্যক্তিগত ঘর, পরিবারের ঝগড়া, প্রতিবাদ, সম্পর্কের সংকট — সবই সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশ করতে শুরু করেছে। যেন নিজেকে দেখাতে না পারলে অস্তিত্বের মূল্য কমে যায়। Yuval Harari বলছেন, আজকের সোশ্যাল মিডিয়া ও স্মার্টফোনের ডিজাইন এমন, যেন তারা আমাদের মস্তিষ্ক “হ্যাক”করে। অর্থাৎ, আমাদের অনুভূতি, ভীতি, হিংসা, লোভ — এমন “মনস্তাত্ত্বিক দুর্বলতা”খুঁজে পায় এবং সেই অনুযায়ী আমাদের মনোযোগ আকর্ষণ করে। আমরা নিজেদেরকে নিজের সঙ্গে নয়, অন্যের সঙ্গে তুলনা করতে শুরু করেছি। এই তুলনা শুধুমাত্র মনস্তত্ত্বে নয়, পরিবারের ওপরও চাপ সৃষ্টি করে। স্বামী-স্ত্রী, বাবা-মা, ভাই-বোন — সব সম্পর্কেই এক ধরনের অন্যায় প্রত্যাশা জন্ম নেয়।
ধরুন, আপনি রাতের খাবার শেষ করে বিশ্রাম নিচ্ছেন। সেই সময় সোশ্যাল মিডিয়া খুলে দেখলেন, আপনার এক সহপাঠী সদ্য আমেরিকা গেছে চাকরির জন্য। আরেকজন নতুন গাড়ি কিনেছে। কেউ আবার ইনফ্লুয়েন্সার হয়ে মাসে লাখ টাকা রোজগার করছে। আপনার মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে, “আমি এতদিন তাহলে কী করলাম? আমার জীবনে এমন কিছু কেন হচ্ছে না?” যেখানে আপনার নিজের জীবন নিয়ে হয়ত কিছুক্ষণ আগেও আপনি সন্তুষ্ট ছিলেন! এই তুলনা থেকেই জন্ম নেয় গভীর অসহায়তা। শুরু হয় চাপ, বিরক্তি, নিজেকে অবমূল্যায়ন করা। অনেকেই এই চাপ গিয়ে পরিবারে ঝেড়ে ফেলেন, যেন সোশ্যাল মিডিয়ার ঈর্ষা ঘরে ঢুকে পড়ে।

গবেষণায় দেখা গেছে, দিনে ২ ঘণ্টার বেশি সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীদের মধ্যে ৬৫.৭%-এর ক্ষেত্রে ‘মধ্যম থেকে গুরুতর মানসিক চাপ, উদ্বেগ এবং বিষণ্নতার লক্ষণ দেখা গেছে। বিপরীতে, যারা দিনে ২ ঘণ্টার কম সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করছিলেন, তাদের মধ্যে এই হার মাত্র ২৮.৬%।
ফোমো নীরব কিন্তু স্থায়ী। শরীরের কোনো ব্যথা নেই, কিন্তু মনটা চুপচাপ ক্ষয়ে যাচ্ছে। যেভাবে ডায়াবেটিস বা রক্তচাপ সমাজজুড়ে মহামারীর আকার নিয়েছে, ফোমোও শিগগিরই এক মনস্তাত্ত্বিক মহামারীতে রূপ নেবে। যেটা চোখে দেখা যায় না, কিন্তু মানুষের আত্মবিশ্বাস, সুখ, পারিবারিক স্থিতি সবকিছু নষ্ট করে দিচ্ছে নিঃশব্দে।
ফোমোর সামাজিক প্রভাব: নীরব সংকটের দিকে সমাজ
ফোমো আজ আর শুধু ব্যক্তিগত অস্বস্তির জায়গায় নেই, এটি সমাজজুড়ে মানসিক চাপের এক নীরব মহামারীতে পরিণত হয়েছে। সবচেয়ে বড় আঘাত আসে মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যে। কারও সাফল্য দেখলেই নিজেকে ব্যর্থ মনে হওয়া, জীবনের মূল্য কমে গেছে মনে হওয়া, আর ক্রমাগত তুলনার দোলাচলে পড়ে থাকা। এর পরিণতি উদ্বেগ, আত্মবিশ্বাসে ভাঙন, গভীর দুশ্চিন্তা এবং শেষ পর্যন্ত এক প্রচণ্ড মানসিক ক্লান্তি, যা মানুষকে আরও বেশি নিঃসঙ্গ করে তোলে।
ফোমোর আরেকটি বড় ক্ষতি ঘটে সম্পর্কের ক্ষেত্রে। সামাজিক মাধ্যমে সাজানো “হ্যাপি লাইফ”দেখে অনেকেই নিজের সম্পর্ক নিয়ে সন্দেহ তৈরি করে, যেখানে বাস্তবে সমস্যা না থাকলেও মনে হয় কিছু যেন কমতি বা ঘাটতি রয়েছে। ফলে দাম্পত্য থেকে পারিবারিক সম্পর্ক — সব ক্ষেত্রেই অকারণ ঝগড়া ও বিরোধ বেড়ে ওঠে। কেউ মুখে না বললেও ডিজিটাল তুলনার চাপ সম্পর্ককে ভেঙে দেয় অদৃশ্যভাবে।
এই তুলনা সমাজেও হিংসা-অসহিষ্ণুতা বাড়ায়। একে অন্যের প্রতি হিংসা, ঈর্ষা, অভিমান বা অযথা ঘৃণা তৈরি হয় শুধুমাত্র সোশ্যাল মিডিয়ায় দেখা সাফল্যের ভিত্তিতে। অন্যের উজ্জ্বল মুহূর্ত দেখে কেউ নিজের ব্যর্থতাকে অযথা বড় করে দেখে, যা সমাজে নেতিবাচকতা ছড়িয়ে দেয়।
সবচেয়ে ভয়ঙ্কর প্রভাব পড়ে আমাদের গোপনীয়তার ওপর। মানুষ এখন ব্যক্তিগত রুমের ঘটনা, পারিবারিক ঝগড়া, এমনকি প্রতিবাদের ভিডিও পর্যন্ত নিঃসংকোচে পোস্ট করে দিচ্ছে অনলাইনে। শিশুদের ব্যক্তিগত মুহূর্তও আর সুরক্ষিত থাকছে না। ফলে ব্যক্তিগত ও সামাজিক সীমারেখা ধীরে ধীরে মুছে যাচ্ছে। ফোমো তাই শুধু ব্যক্তির নয়, সমাজের মানসিক কাঠামোকে বদলে দিচ্ছে। সচেতন না হলে এই ক্ষতি ভবিষ্যতে আরও গভীর হবে।
ফোমা-র চাপ থেকে মুক্তি পেতে হলে প্রথমেই দরকার সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারে সংযম আনা। অকারণে স্ক্রল করা, অন্যের জীবনের আপডেট দেখার অভ্যাস —এগুলোই নিজের মনকে ক্লান্ত করে তোলে। তাই প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে সীমিত ব্যবহারই মনকে হালকা রাখে। অন্যের জীবনের সঙ্গে নয়, তুলনা করতে হবে নিজের গতকালের সঙ্গে। নিজের ছোট ছোট সাফল্যের একটি তালিকা রাখলে বোঝা যায়, আমরাও এগোচ্ছি, শুধু সেই অগ্রগতির ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় নেই বলেই তা অদৃশ্য মনে হয়।
“তথ্য খাওয়া নয়, তথ্য হজম”করার — মানসিক শান্তি, সচেতনতা এবং স্বাধীনতা ফিরে পেতে আমাদের পথ দেখায়। বাস্তব সম্পর্কগুলোর উষ্ণতা আমাদের দ্রুত স্মরণ করিয়ে দেয় — স্ক্রিনের বাইরের পৃথিবীই আসল। সবশেষে, নিজেকে বারবার মনে করানো জরুরি যে, সোশ্যাল মিডিয়ায় দেখা জীবনটাই সত্য নয়। উজ্জ্বল ছবির আড়ালে লুকিয়ে থাকে সংগ্রাম, চ্যালেঞ্জ, অসম্পূর্ণতা — যা আমরা দেখি না। তাই অন্যের সাজানো ছবির সঙ্গে নিজের বাস্তব জীবনকে মেলানোর প্রয়োজন নেই।
ফোমো আজ কেবল একটি মানসিক অবস্থা নয়, বরং এক ডিজিটাল যুগের চরম সামাজিক মহামারী। আমরা যদি সচেতন না হই, আগামী দিনে এটি মনুষ্যত্ব, সম্পর্ক, আত্মবিশ্বাস, সামাজিক শান্তি — সবকিছুকেই গ্রাস করবে। সুতরাং নিজেকে প্রশ্ন করুন — আপনার জীবন কি সত্যিই খারাপ, নাকি অন্যের সাজানো জীবনের সঙ্গে তুলনা করতে গিয়েই আপনি নিজের সুখ হারিয়ে ফেলছেন?








