একজন সাহিত্যিক কি সাম্প্রদায়িক হতে পারেন ?
পাভেল আখতার
এপার বাংলার শিল্পে, সাহিত্যে, চলচ্চিত্রে স্বচ্ছ ও বস্তুনিষ্ঠভাবে পূর্ণাঙ্গ মুসলিম জীবনচিত্র অঙ্কিত হয়নি । যতটুকু আখ্যান উঠে আসে তা আদতে খণ্ডিত, মিথ্যে ও বিভ্রান্তিকর । অল্পস্বল্প চলচ্চিত্রে মুসলিম চরিত্র মানেই দেখা গেছে আপাতভাবে ছোট পেশা, হীনতম কাজ এবং বিশেষ ছাঁদের পোশাক ও পরিচ্ছদ । সাহিত্যের ক্ষেত্রেও ছবিটি তেমন ভিন্ন কিছু নয় । যেন আধুনিক জীবনের উঠোনে মুসলিমদের কোনও উত্তরণই হয়নি ! শিক্ষিত মধ্যবিত্ত মুসলিম সমাজ সম্পূর্ণ উপেক্ষিত । সিংহভাগ হিন্দুর মুসলিমদের জীবনপ্রবাহকে ‘দেখার চোখ’ এজন্যেই ভুলভাল থেকে গেল ! অপ্রিয় সত্য হল, পূর্ববঙ্গ ছেড়ে আসার বিষাদবৃত্ত থেকে অনেক ধীমান বাঙালি হিন্দুই বেরিয়ে আসতে পারেননি ! বিষণ্ন স্মৃতির মধ্যে তাঁরা এত বেশি আচ্ছন্ন থেকেছেন যে এপার বাংলার বিপুল বাঙালি মুসলমানদের নিয়ে তাঁরা সেই কারণেই আর ভাবার অবকাশ পাননি । পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি মুসলমানদের আঁতের কথা একমাত্র যিনি লিখতে পেরেছিলেন তিনি সাহিত্যিক ও সাংবাদিক গৌরকিশোর ঘোষ, যার নেপথ্যে ছিল মুসলমান জীবনকে কাছ থেকে দেখা ।
গোটা বিশ্বজুড়ে এখন ইসলামফোবিয়ার স্রোত বইছে । বাংলার তথাকথিত সাহিত্যিকদের ইসলাম সম্পর্কে অনিঃশেষ অজ্ঞতা ও মুসলমানদের সঙ্গে মেলামেশার অভাব থেকেই তাদের মনেও ইসলামফোবিয়া বাসা বেঁধেছে । তাতে হাওয়া দিচ্ছে মিডিয়া । শুধু বাংলার মুসলমান নয়, আজকের তথাকথিত অধিকাংশ সাহিত্যিক মাটি ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক না গড়েই ‘লেখক’ হয়েছেন, যা অতীতের স্বনামধন্য বাঙালি সাহিত্যিকদের জীবনের সঙ্গে মেলে না ! এরা মুসলমান হোক অথবা অমুসলমান সাধারণ মানুষ–কারোরই সুখ-দুঃখ বুঝবেন কীভাবে ?
বাংলার সাহিত্য জগৎ অভূতপূর্ব এক আবহ রচনা করেছে । সাম্প্রতিককালে কিছু তথাকথিত সাহিত্যিক অত্যন্ত নিম্ন, ক্ষুদ্র মানসিকতার পরিচয় দিয়েছেন বা দিচ্ছেন । একজন সাহিত্যিকের দৃষ্টি, মন, মনন, চেতনা ও বোধের জগৎ হতে হয় মুক্ত, স্বচ্ছ, উদার ও পরিচ্ছন্ন । কিন্তু, প্রথমে দেখা গেল শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়কে, যিনি একটি পত্রিকায় দেওয়া সাক্ষাৎকারে যেসব কথাবার্তা বললেন তা মূলত উচ্চবর্ণের অহমিকারই বহিঃপ্রকাশ । মানুষের মনে অহমিকা আসে শ্রেষ্ঠত্বের অনুভূতি থেকে । এবং, এমন মানুষ কখনওই ‘মানবতাবাদী’ হতে পারেন না ।

একজন সাহিত্যিক হবেন অতি অবশ্যই মানবতাবাদী । শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় যেসব কথা সেদিন বলেছিলেন সেসব কথা তাঁকে ‘মানবতাবাদী’ হিসেবে একেবারেই চিহ্নিত করে না । অনেকেই তখন তাঁর অনুকূলে মুখর হয়েছিলেন এই যুক্তিতে যে, শীর্ষেন্দুর ‘ব্যক্তিগত বিশ্বাস’ স্বতন্ত্র হতেই পারে । সেটা না মানলেই হল । এই অদ্ভুত যুক্তি যারা দিয়েছিলেন তাদেরও মনের ভেতরে আসলে বর্ণবাদের প্রতি আস্থা আছে । নইলে ব্যক্তিগত বিশ্বাস যদি ত্রুটিপূর্ণ হয় তাহলে সেটার সমালোচনা অবশ্যই হবে । একজন সাহিত্যিকের ‘ব্যক্তিগত বিশ্বাস’ বলেই কি সেটা সমালোচনার ঊর্ধ্বে থাকবে ? একদমই নয় । কারণ, ‘ব্যক্তিগত বিশ্বাস’ বলে আদতে কিছু হয় না । ব্যক্তিগত বিশ্বাসের একটা সামাজিক সত্তাও থাকে, যেহেতু সেটার সামাজিকীকরণ অনিবার্য । শীর্ষেন্দুর ‘ব্যক্তিগত বিশ্বাস’ শুধু একান্ত গৃহকোণে অনুশীলিত জীবনেই সীমিত থাকেনি, সেটা সমাজের সঙ্গে সংযুক্ত হয়েছে তাঁর লেখার মাধ্যমে, যার অভিঘাত অনেক বেশি তীব্র । এভাবে তাঁর লেখা হোক অথবা মুখের কথা, শেষপর্যন্ত সেটা আর ‘ব্যক্তিগত বিশ্বাস’ থাকল না, বরং হয়ে উঠল একটা প্রোপাগান্ডা ; যার অভিমুখটি সমাজের দিকে কেন্দ্রীভূত থাকায় সমাজ থেকে বিরুদ্ধ সমালোচনার ঢেউ ওঠাই স্বাভাবিক ।
বঙ্গীয় বহু তথাকথিত সাহিত্যিককেই এখন দেখা যাচ্ছে সংকীর্ণমনা ও সাম্প্রদায়িক হিসেবে । সাম্প্রদায়িকতার মূল উপাদান শ্রেষ্ঠত্বের অনুভূতি থেকে সৃষ্ট নিম্নশ্রেণির প্রতি তাচ্ছিল্য ও ঘৃণা দ্বারা চালিত হওয়ায় শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়কে এক অর্থে ‘সাম্প্রদায়িক’ বলা কি খুব অসঙ্গত ? যদিও তিনি অন্য ধর্মের বা মুসলমানদের প্রতি বিদ্বেষমূলক কোনও কথা বলেননি । কিন্তু, সদ্য মিডিয়ায় তিলোত্তমা মজুমদারের মুখনিঃসৃত বাক্যসমূহ যে সাম্প্রদায়িক মানসিকতাপুষ্ট তার মূল নির্যাস হচ্ছে মুসলমানদের প্রতি তাচ্ছিল্য ও ঘৃণা । আরেক লেখিকা সঙ্গীতা বন্দ্যোপাধ্যায় সোশ্যাল মিডিয়ায় নানা সময়ে যেসব পর্যবেক্ষণ বা অভিমত ব্যক্ত করেন তাও একই গোত্রের । এরাও কিন্তু আদতে উচ্চবর্ণের অহমিকা থেকে মুক্ত নন । কারণ, ঘৃণার মানসিকতা তারা যখন বহন করছেন তখন সেই অহমিকাটি সুপ্ত থাকতে বাধ্য । ভারতীয় সমাজে যুগ যুগ ধরে বিদ্যমান যে জাতপাত, অস্পৃশ্যতা, অসাম্য, শোষণ, বিদ্বেষ, সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে একসময় এই দেশে প্রেমচাঁদের মতো সাহিত্যিক একদা শাণিত কলম চালিয়েছিলেন, এদের মতো বহু তথাকথিত সাহিত্যিকই আবার এইসব বিষাক্ত বস্তু তাদের মনে শুধু যে লালন-পালন করছেন তা-ই নয়, সেসব বাইরে নিক্ষেপও করছেন ! অনুকূল জলহাওয়ায় তাদের মনের ছবিটি আজ উন্মোচিত হওয়ার মানে এই নয় যে, তার রচনাও হালে হয়েছে ! তারা এই মন বহন করছিলেনই, শুধুমাত্র এতদিন প্রকাশ করতে পারেননি ! ‘মানবতাবাদী’ রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, অন্নদাশঙ্কর রায়, শঙ্খ ঘোষ, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় প্রমুখের বিপরীতে এদের অবস্থান । তথাকথিত সাহিত্যিকদের বিষাক্ত সাম্প্রদায়িক মন্তব্যের বিরুদ্ধে অন্যান্য সাহিত্যিকদের প্রতিবাদে সোচ্চার হতে দেখা যাচ্ছে না । এই নীরবতার মানে কি তাহলে এই যে, তারাও আসলে মনের কোণে লুকিয়ে রেখেছেন একই সাম্প্রদায়িক অনুভূতি !
এরা মানবতাবাদী নন ! কারণ, ঘৃণা আর মানবতা একই সঙ্গে কখনও একটি হৃদয়ে থাকতে পারে না ! অতএব, দিনের শেষে এরা ‘সাহিত্যিক’ও নন । লিখলেই হয়তো লেখক হওয়া যায়, কিন্তু ‘সাহিত্যিক’ হতে গেলে অবশ্যই কিছু মহিমার প্রয়োজন হয়–এই অতি মূল্যবান কথাটা বলেছিলেন প্রয়াত সাহিত্যিক রমাপদ চৌধুরী । এরা সেই ‘মহিমা’ অর্জন করতে ব্যর্থ হয়েছেন, নিঃসন্দেহে। পরিশেষে উল্লেখ্য, এদের প্রতি ক্ষোভের সঙ্গে ধিক্কার দিতে গিয়ে একটা কথা অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে, এরা কাদের প্রেরণায় ও পৃষ্ঠপোষকতায় অনিঃশেষ বিদ্বেষ ‘উপহার’ দিচ্ছেন ! তারা বাংলার সবচেয়ে বৃহৎ একটি সংবাদগোষ্ঠী ! নামটা না বললেও কারও বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয় ! তারাও কিন্তু সমান, কিংবা বেশিই, ধিক্কারের যোগ্য !








