এসআইআর: সবথেকে ক্ষতিগ্রস্ত হবে মতুয়ারা
মানসারুল হক
এসআইআর এর জেরে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে মতুয়া সম্প্রদায়। মনে পড়ে ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশ ভ্রমণ করেছিলেন, যা নিয়ে নিকটতম প্রতিবেশি দেশটি রীতিমতো উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল। বাংলাদেশ ভ্রমণে গিয়ে মোদি যে দুটি মন্দিরে পুজো দিয়েছিলেন, তার মধ্যে একটি হল মতুয়াদের জন্য অত্যন্ত পবিত্র ওরাকান্দি ধাম! মতুয়াদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে যার ফলাও করে প্রচার করেছিল বিশ্ব হিন্দু পরিষদ। যার ফলাফল ভোটে হাতেনাতে বিজেপি পেয়েছে!
২০১৯ সালে ৬৮টি তপশিলি সংরক্ষিত বিধানসভা আসনের মধ্যে বিজেপি জেতে ৩৩ টিতে, যার মধ্যে ২৫টিতে মতুয়ারা মূলত বড় অংশের ভোটার, ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির একটি বিধানসভা কমে হয় ৩২। বর্তমানে পশ্চিমবাংলার মোট ৭.৬৬ কোটি ভোটারের মধ্যে ১.৩ কোটি মতুয়া, যারা বাংলাদেশ থেকে এদেশে এসে স্থায়ী বাসিন্দা এবং আমাদের সহ নাগরিক হয়েছেন! এর মধ্যে সর্বশেষ ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে মতুয়া ভোট পড়েছিল ৭৪ শতাংশ, সংখ্যার নিরিখে যা প্রায় ৯৬ লাখ।
মতুয়ারা সবচেয়ে বেশি যে জেলাগুলিতে বসবাস করেন সেগুলো হল নদীয়া, উত্তর ও দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা, পূর্ব বর্ধমানের কিছু অংশ, বীরভূমের কিছুটা এবং মালদার গাজোল সহ বৈষ্ণবনগর ইত্যাদি বিধানসভা এলাকায়। এর মধ্যে শুধু নদীয়াতেই ২৩ লাখের বেশি মতুয়া ভোট পড়েছিল ২০২১ এর বিধানসভা নির্বাচনে। মতুয়ারা মূলত নমশূদ্র, কেউ কেউ আবার দলিত অর্থাৎ বর্ণাশ্রম অনুযায়ী সবচেয়ে নীচের সারিতে থাকা দুই জনগোষ্ঠী।
পশ্চিমবঙ্গের যে বিধানসভা কেন্দ্রগুলিতে সর্বাধিক মতুয়া ভোটার রয়েছে, সেগুলো হল বাগদা (৪৮ শতাংশ), বনগাঁ দক্ষিণ (৪৬ শতাংশ), রানাঘাট উত্তর পূর্ব(৪৪.৬ শতাংশ), বনগাঁ উত্তর (৪৩ শতাংশ), গাইঘাটা (৪২.৫ শতাংশ), কৃষ্ণগঞ্জ (৩৫.৭ শতাংশ), রানাঘাট উত্তর পশ্চিম (৩১ শতাংশ), কল্যাণী (২৯ শতাংশ), হরিণঘাটা (২৮.৩ শতাংশ), গাজোল (২৮ শতাংশ), স্বরুপনগর (২৬.৫ শতাংশ)! এছাড়াও রাজ্যের মোট ২৮টি বিধানসভায় মতুয়াদের যথেষ্ট প্রভাব রয়েছে।
এই প্রায় ১.৩ কোটি মতুয়া ভোটারদের কতজনকে শেষ ১১ বছর কেন্দ্রে ক্ষমতায় থাকাকালীন সিএএ-এর মাধ্যমে বিজেপি নাগরিকত্ব দিয়েছে? সংখ্যাটা ৪০০ পেরোবে কিনা সন্দেহ। অথচ ২০১৯ থেকে মতুয়া ভোটারদেরকে ইভিএমে চুষে নিয়েছে বিজেপি! তাই সংঘ পরিবারের চাড্ডিদের সিএএ নিয়ে দেওয়া জুমলাবাজি বা ভাঁওতাবাজি এখন আর মতুয়ারা খাচ্ছে না। মতুয়াদের ক্ষোভের মুখে পড়ে বিজেপি বিধায়ক অসীম সরকার থেকে শান্তনু ঠাকুর… সবাই সুর পাল্টে বিজেপিকে আক্রমণ করেছেন এসআইআর এবং তার সাথে অতপ্রোতভাবে জড়িত নাগরিকত্বের বিষয় নিয়ে। মতুয়া অঞ্চলগুলোতে হাহাকার শুরু হয়েছে ইতিমধ্যেই কোলকাতা থেকে মাত্র ৭৫ কিমি. দূরে অবস্থিত মতুয়া প্রধান এলাকা ঠাকুরনগরে মতুয়াদের মধ্যে এসআইআর নিয়ে তৈরি হওয়া আতঙ্ক বিষয়ে অসাধারণ কভারেজ করেছে How!
এসআইআর প্রশ্নে রাজ্যের অ-বিজেপি রাজনতিক দল মূলত বাম-কংগ্রেসকে জাগিয়ে তোলার চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। ভোটের অঙ্কের হিসেবে এটা খুব সহজেই অনুমেয়। ২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে সর্বাধিক মতুয়া ভোটার থাকা ১০টি বিধানসভায় বাম-কংগ্রেস জোটের ভোট শতাংশ জানলে চোখ কপালে উঠবে বৈকি। বাগদায় কংগ্রেস জয়ী হয়েছিল তৃণমূলকে পরাস্ত করে ৪৯.৭ শতাংশ ভোট নিয়ে। বনগাঁ দক্ষিণ আসনে সিপিএম ভোট পেয়েছিল ৩৪.৯ শতাংশ। বনগাঁ উত্তরে বামফ্রন্টের শরিক দল ফরোয়ার্ড ব্লক ভোট পেয়েছিল ৩৩.১ শতাংশ। রানাঘাট দক্ষিণে সিপিএম ৪৭.৫২ শতাংশ ভোট পেয়ে জয়লাভ করে। রানাঘাট উত্তর পূর্ব আসনে সিপিএম ভোট পেয়েছিল ৪০.৪ শতাংশ। রানাঘাট উত্তর পশ্চিমে কংগ্রেস ৫২.১ শতাংশ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছিল। গাইঘাটায় সিপিআই পেয়েছিল ৩৩.৩ শতাংশ ভোট। কৃষ্ণগঞ্জে সিপিএম ৩৩.২ শতাংশ ভোট পেয়েছিল। কল্যাণীতে সিপিএম ৩৬.৮ শতাংশ, হরিণঘাটায় সিপিএম ৩৮.২ শতাংশ পেয়েছিল। গাজোলে সিপিএম ৪৩.৩৪ শতাংশ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছিল। স্বরূপনগরে সিপিএম পেয়েছিল ৪৩.৪ শতাংশ।
অতএব এসআইআর দিয়ে মতুয়া অধ্যুষিত অঞ্চলগুলোতে বিজেপিকে নাকে দড়ি দিয়ে দৌড় করানো যেতে পারে। ২০২৬ এর বিধানসভা নির্বাচনে এটা সম্ভব। তবে এই ইস্যুতে তৃণমূল কংগ্রেস কাজ শুরু করেছে প্রায় ২ মাস আগে, আর বাম-কংগ্রেস শীতঘুমে আছে। ফলে মতুয়া এলাকায় মমতা ব্যানার্জীর ঘাসফুল শিবির অভূতপূর্ব ফলাফল করলে এবং বাম-কংগ্রেস আবার ব্যর্থ হলে দায়ী থাকবেন আলিমুদ্দিন স্ট্রীটের মহম্মদ সেলিম এবং বিধানভবনের শুভঙ্কর সরকাররা।








