রফা-দফা ও দফারফা
নতুন পয়গাম: ডোনাল্ড ট্রাম্প। মার্কিন প্রেসিডেন্ট। তিনি যে কখন কী বলেন, আর কখন যে কী করেন, বোঝা দায়। সকালে যা ভাবেন, দুপুরে অন্য কথা বলেন, আর রাতে করেন সম্পূর্ণ ভিন্ন কিছু। চৌপোদিন নরম-গরমে থাকেন, মানে নাতিশীতোষ্ণ মেজাজ তার। ট্রাম্প যেন টক-ঝাল-মিস্টি চানাচুর। কখন অম্ল, কখনও-বা মধুর। কখন নোনতা, কখন তিতো। কখন ভালো, আর কখন মন্দ — তার পূর্বাভাস দিতে অপারগ আবহাওয়া দফতর। কখন সোজা সাপটা বলেন, আর কখন যে বাঁকা কথা বলেন, তা বোধগম্য হওয়া দুষ্কর। কখন যে তিনি মুডে থাকেন, আর কখনই-বা তার মুড স্যুইং করে, বা মুড অফ হয়ে যায়, সেটা বোধহয় তাঁর তৃতীয় স্ত্রী মেলানিয়া ট্রাম্পও উপলব্ধি করতে পারেন না। কখন যে তিনি রাজপথ ছেড়ে আলপথ ধরে হাঁটেন, আর কখন আল টপকে আলটপকা মন্তব্য করে বসেন, তা তিনি নিজেও আঁচ করতে পারেন না। কখন তিনি কার জন্য ওকালতি করেন, আর কখন যে কাকে আসামী বানিয়ে নিজে বিচারপতি সাজেন, সে রহস্য অন্তর্যামীও টের পান না। তার ফাঁসে কখন যে কে লটকে যান, আর অনেক কসরত করে কাউকে লটকাতে না পেরে কখন তিনি নিজেই মুখ ফসকে বেফাঁস কথা বলে ফেলেন, তা টের পাওয়া চাট্টিখানি কথা নয়। কখনও তিনি মুশকিল, আবার কখনও-বা মুশকিল আসান। কখন কাকে ভাত বেড়ে ডাকেন, আর কখন কার বাড়া ভাতে ছাই দেন, কখন কার মাথায় ধান-দুব্যো দেন, আবার পরক্ষণেই তার পাকা ধানে মই দেন, ঠাহর করা দায়। এককথায় বললে, মহামান্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হলেন বহুরূপী। জ্ঞানে-গুণে নির্ঘাত গোবর-গণেশটি।
যাহোক, এখন তাঁর একটাই লক্ষ্য নোবেল শান্তি পুরস্কার। যদিও এবছর তা আর সম্ভব নয়। অলরেডি সব বিষয়ে প্রাপকদের নাম ঘোষণা হয়ে গেছে। তবুও রণেভঙ্গ নিতে নারাজ ট্রাম্প। আসছে বছর আবার হবে — আপাতত এটাই সান্ত্বনা। এখনও প্রেসিডেন্ট হিসেবে তাঁর তিন বছরের বেশি মেয়াদ আছে। ততদিনে নিশ্চিত তিনি নোবেল হাসিল করতে সক্ষম হবেন। ইতিমধ্যেই বলে রেখেছেন, তাঁকে নোবেল পুরস্কার না দেওয়া মানে আমেরিকাকে অপমান করা। তাই নোবেল হাতাতে বা বাগাতে তিনি অনুগামীদের থেকে অনলাইনে ফান্ড কালেকশন করছেন। সেই টাকা দিয়ে হয়ত নোবেল কমিটিকে কিনে ফেলবেন, অথবা নোবেল পকেটস্থ করতে না পারলেও শেষেমেষ বিপুল ডলার দিয়ে স্টকহোম এবং অসলোকে পকেটে পুরে ফেলবেন।
২০ জানুয়ারি ২০২৫ দ্বিতীয়বার গদিতে বসে থেকেই তিনি বলছেন গ্রীনল্যান্ড, পানামা, গাজা সব দখল করে নেবেন। সুতরাং নোবেল তো কোন ছার, ওটা একটা কমিটি মাত্র। ট্রাম্পের কাছে ওসব মামুলি ব্যাপার। যিনি ইউনেসকো ছেড়ে বেরিয়ে যেতে পারেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা হু-কে কান ধরে ওঠবস করানোর হুমকি দিতে পারেন, পরমাণু ও জলবায়ু চুক্তি ছেড়ে বেরিয়ে যেতে পারেন, আন্তর্জাতিক আদালতের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে পারেন, চাঁদে পরমাণু বোমা মারার হুমকি দিতে পারেন, তিনি কি ডলার-দেবতার জোরে নোবেল কমিটিকে ম্যানেজ করতে পারেন না? পারেন বৈকি, আলবাত পারেন।
নোবেলের জন্যই এখন তিনি রাশিয়া বনাম ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধের ইজারা নিয়েছেন। আবার একইসঙ্গে গাজায় ইসরাইলি যুদ্ধ বন্ধের ঠিকা না নিলেও, গাজাকে শ্মশান কিংবা কবরস্থান বানিয়ে শান্তি ফেরাতে মরিয়া তিনি। যেভাবেই হোক এখন তিনি শান্তির দূত সাজতে চাইছেন। তাই বিভিন্ন দেশের অশান্তির আগুন নেভাতে তিনি দফায় দফায় বৈঠক করছেন। সেই দফাওয়ারি বৈঠকে রফাসূত্র খুঁজছেন। আর মাথার ঘাম পায়ে ফেলেও শেষ অবধি যদি দফায় দফায় বৈঠকের পরেও রফাসূত্র না মেলে তাহলে সব দফারফা করে ছাড়বেন তিনি। যদিও এভাবে শান্তি খোঁজা আহাম্মকের কাজ। কারণ, পৃথিবীর এখন জিয়নকাঠি হল অশান্তি। অশান্তিই যেন এই গ্রহের অক্সিজেন। তাই শান্তি কেউ চায় না। লোকদেখানো শান্তির কথা বলা হলেও, তথাকথিত শান্তির জন্য যুদ্ধের প্রতিই সদিচ্ছা দেখা যায় শান্তির ফেরিওয়ালাদের।
গাজায় যুদ্ধ বন্ধ না করে, হামাসের ওপর একগুচ্ছ মানার অযোগ্য শর্ত চাপিয়ে ট্রাম্প চাইছেন গাজাকে পুরোপুরি দখল করে নিতে। তাই নেতানিয়াহুকে শান্তির সওদাগর বলে ক্লিনচিট দিয়ে গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলার নেত্রী গ্রেটা থুনবার্গ ও তার শান্তিকামী টিমকে যত অশান্তির মূল তোপ দেগেছেন ট্রাম্প। গ্রেটার বয়স অল্প হলেও ট্রাম্পকে মনে রাখতে হবে ক্ষুদে লংকার ঝাঁজ বেশি। গ্রেটা কিন্তু কোনভাবেই গ্রেটার ইসরাইল হতে দেবে না। ৮০ বছরের ট্রাম্পকে ওভারট্রাম্প করার হিম্মত রাখেন ২২ বছরের গ্রেটা।








