ফিলিস্তিনি সংহতি দিবস অয়দিপাউস ও নেতানিয়াহু
মুদাসসির নিয়াজ
ফিলিস্তিনের জাতীয় কবি মাহমুদ দারবিশ লিখেছিলেন, ”পিপাসায় শুকিয়ে গেলেও গাছেরা নদীর কাছে মাথা নোয়ায় না!” সত্যিই তাই। দীর্ঘ সাড়ে সাত দশকেরও বেশি ইসরাইলি হত্যাযজ্ঞে শাহাদাতের সুনামি বয়ে গেলেও ফিলিস্তিনিরা ইসরাইলের কাছে মাথানত করেনি। খুন-পসিনা দিয়ে, নিজেদের জীবন বাজি রেখে রক্ত দিয়ে তারা স্বাধীন ফিলিস্তিনের পতাকা এঁকে চলেছে।
দীর্ঘ ১৮ বছর ধরে ইসরাইলি অবরোধে ‘বিশ্বের বৃহত্তম উন্মুক্ত কারাগার’-এ পরিণত হয়েছে গাজা উপত্যকা। মাঝেমধ্যেই বিদ্যুৎ, পানি, খাদ্য, ওষুধের সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হয়। তখন অসহায় ফিলিস্তিনিরা রোযা রাখে, নদীর পানি পান করে।
ইসরাইল চায় গোরস্থানের শান্তি। আর সেই শান্তির জন্যই তারা যুদ্ধ চায়। তাই ফিলিস্তিনিদেরকে পুরোপুরি নিকেশ করে মদ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র থেকে উধাও করে দিয়ে সমগ্র ভূখণ্ড কব্জা করে বানাতে চায় গ্রেটার ইসরাইল। আর ফিলিস্তিনিরা যুদ্ধের হাত থেকে বাঁচতে শান্তি চায়। তাই তারা জমি, ভিটে, পুত্র-কন্যা, বাবা-মা, স্বামী-স্ত্রী সবাইকে ও সর্বস্ব হারিয়েও শান্তি চায়, স্বাধীনতা চায়। তবু তাদের বেঁচে থাকার মৌলিক অধিকারটুকু ছিনিয়ে নিয়েছে ইসরাইল। ৮০ শতাংশেরও বেশি ভূখণ্ড হারিয়ে তারা বাকি অংশটুকুতেই স্বাধীন দেশ চায়। তবু তাদের স্বাধীনতা আন্দোলনকে ‘সন্ত্রাসবাদী’ তকমা দেওয়া হয়।
২৯ নভেম্বর ছিল ৩৯তম আন্তর্জাতিক ফিলিস্তিনি সংহতি দিবস। ১৯৭৭ সালে রাষ্ট্রসংঘ এই দিনটি ঘোষণা করে। এর ১০ বছর পর ১৯৮৭ সালের ২৯ নভেম্বর মজলুম ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতি জানাতে প্রস্তাব পাস হয় এবং বিভিন্ন দেশে এই দিনটি পালিত হয়। যদিও তার সাড়ে তিন দশক পর আজও স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়নি। অথচ সাড়ে সাত দশক আগে ফিলিস্তিনের বুকের ওপর ইসরাইলকে স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দিয়েছে আন্তর্জাতিক মহল। পশ্চিমাদের সেই আনুকূল্য, বদান্যতা ও সহযোগিতায় টানা প্রায় ২৫ মাস ধরে আশ্রয়দাতা ফিলিস্তিনের ওপর পাশবিক ও বর্বরোচিত একতরফা যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের বিষফোড়া অবৈধ দেশ ইসরাইল। ২০২৩ এর ৭ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া অসম যুদ্ধ শুরুর পর দু-দুটো সংহতি দিবস চলে গেল, কিন্তু গণহত্যা, ধ্বংসযজ্ঞ তথা রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস বন্ধ করেনি ইসরাইল। গত ১০ অক্টোবর ২০২৫ মিশরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প-সহ ২০ দেশের রাষ্ট্রপ্রধান গাজায় যুদ্ধবিরতি চুক্তি করেন। কিন্তু তারপর গত দিনে ৫০০-রও বেশি বার গাজায় হামলা চালিয়েছে ইসরাইল। পাশাপাশি এখন তারা নতুন করে ওয়েস্টব্যাঙ্কেও হামলা শুরু করেছে। ইহুদীরা এতবড় বেইমান ও নিমকহারাম, যারা তাদেরকে ইউরোপীয়দের থাবা থেকে রক্ষা করতে আঁচল পেতে দিয়েছিল, কোলে তুলে নিয়েছিল, সেই ফিলিস্তিনিদেরকেই গণহত্যা চালিয়ে যাচ্ছে নরখাদক ইসরাইল।

১৯৪৭ সালের ২৯ নভেম্বর রাষ্ট্রসংঘে উত্থাপিত প্রস্তাবের ওপর ভোটাভুটির মাধ্যমে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডকে দু-টুকরো করে দুটি আলাদা রাষ্ট্র গঠনের সিদ্ধান্ত হয়। ইহুদিদের জন্য ইসরাইল এবং অন্যটি ফিলিস্তিনিদের জন্য। মূলত ব্রিটেন ও আমেরিকার পৃষ্ঠপোষকতায় পাস হয়েছিল সেই কুখ্যাত প্রস্তাব। সমর্থন দিয়েছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন, ইউরোপের অন্যান্য দেশ এবং চীনও। সেই প্রস্তাবে ফিলিস্তিনকে ৪২ শতাংশ এবং ইসরাইলকে ৫২ শতাংশ ভূখণ্ড দেওয়া হয়। বিতর্কিত জেরুসালেম নগরীকে (৬ শতাংশ ভূখণ্ড) রাষ্ট্রসংঘের অধীনে রাখা হয়। পরজীবী জর্ডনকে এর তত্ত্বাবধায়ক করা হয়। এই হল রাষ্ট্রসংঘের ইনসাফ! যদিও বিগত সাড়ে সাত দশক ধরে অধিগ্রহণ ও আগ্রাসন চালিয়ে ৮০ শতাংশেরও বেশি ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড জবরদখল করে নিয়েছে ইসরাইল।
উল্লেখ্য, ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরাইল নামক জারজ রাষ্ট্র গঠনের নীলনকশা ১০৭ বছর আগেই সেরে ফেলেছিল ইংল্যান্ড। তদানীন্তন ব্রিটিশ বিদেশমন্ত্রী আর্থার জেমস বেলফোর ১৯১৭ সালের ২ নভেম্বর ‘বেলফোর ডিক্লারেশন’ ঘোষণা করেন, এটাই ছিল মধ্যপ্রাচ্যে বিষবৃক্ষের বীজ বপন। যায়নবাদের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা থিওডোর হার্জেলকে চিঠি লিখে বেলফোর সেই ঘোষণাপত্রের কথা জানান। সেই অনুসারেই রাষ্ট্রসংঘে ১৯৪৭ সালের ২৯ নভেম্বর প্রস্তাবের ওপর ভোটাভুটি হয়। যাতে ইসরাইল রাষ্ট্র গঠনের পক্ষে ৩৩, ফিলিস্তিনের পক্ষে ১৩ দেশ ভোট দেয় এবং ১০টি দেশ ভোটদানে বিরত থাকে। এর ৬ মাস পর ১৯৪৮ সালের ১৪ মে রাষ্ট্রসংঘের প্রস্তাব মোতাবেক ইসরাইল রাষ্ট্র গঠিত হয়। ঠিক তার ১০ মিনিটের মধ্যেই ইসরাইলকে স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দেয় আমেরিকা।
ফিলিস্তিনের মূল শহর বা নগর হল কয়েক হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী জেরুজালেম। মধ্যপ্রাচ্য সংকটের মূলে রয়েছে এই জেরুজালেম। মূলত আমেরিকা ও ব্রিটেনের মদদে বাহুবলে পুরো এলাকাটি দখল করে নিয়েছে ইসরাইল। পৃথিবীর ইতিহাসে ফিলিস্তিন একমাত্র দেশ, যারা মানবিকতা ও উদারতা দেখাতে গিয়ে নিজেদের দেশকে হারিয়ে ‘নেই রাজ্যের বাসিন্দা’ হয়েছে। উল্লেখ্য, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর থেকেই মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক কাঠামো এবং ইতিহাস-ভূগোল আমূল বদলে যায়। অষ্টাদশ শতকের শেষদিকে যায়নিজম বা কট্টর ইহুদীবাদের ধারণা জন্ম নেয় ইউরোপের মাটি থেকে। ইউরোপ ও রাশিয়ায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ইহুদীদের জন্য একটা আলাদা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাই ছিল তাদের একমাত্র লক্ষ্য।
ফিলিস্তিন ছিল অটোমান সাম্রাজ্য বা তুর্কি খিলাফতের অধীন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে তুরস্ক হেরে গেলে কয়েকশো বছরের উসমানীয় শাসনের অবসান হয়। ফিলিস্তিন চলে যায় ব্রিটেন ও ফ্রান্সের দখলে। দুই ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদী শক্তিধর রাষ্ট্র ভাগাভাগি করে ৩০ বছর শাসন করে ফিলিস্তিনকে। ১৯১৭ সালে বেলফোর ঘোষণার পর দলে দলে ইহুদীরা ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে লোটাকম্বল গুছিয়ে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে যাওয়ার হিড়িক পড়ে যায়। প্রথমে ফিলিস্তিনিরা তাদেরকে স্বাগত জানায়। তারা বুঝতে পারেনি এই মানবিকতা ও আতিথেয়তাই একদিন কাল হবে। উড়ে এসে জুড়ে বসা ইহুদিরাই একদিন মূলনিবাসী ফিলিস্তিনিদেরকে তাদের চোদ্দ পুরুষের ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ করবে। এমনকি নিজেদের ভূখণ্ড থেকেই চিরতরে ফিলিস্তিনিদেরকে উৎখাত বা বিতাড়িত করে নিজভূমে পরবাসী করা হবে – এই অদূরদর্শিতাই ছিল ফিলিস্তিনিদের ঐতিহাসিক ভুল।
১৮৯৭ সালে ইহুদি পণ্ডিত থিওডোর হারজেল ‘ওয়াল্ড যায়োনিষ্ট অর্গানাইজেশন’ গড়ে তোলেন। যায়নবাদীদের স্বপ্ন ছিল, ইউরোপের কোথাও ইহুদীদের জন্য একটা স্বতন্ত্র রাষ্ট্র গড়ে তোলা। কিন্তু সেসময় ইউরোপে অ্যান্টি সেমিটিজম বা ইহুদী বিদ্বেষ এত প্রবল ছিল যে, সে সম্ভাবনা অঙ্কুরেই বিনাশ হয়। ফলে যায়নবাদীরা ইউরোপের মানচিত্র ছাড়িয়ে মধ্যপ্রাচ্যে তাদের রাষ্ট্র গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখতে থাকে। সাম্রাজ্যবাদী ও উপনিবেশবাদী চশমা পরিয়ে পশ্চিমারা তাদেরকে এই স্বপ্ন দেখায় এবং স্বপ্ন পূরণের আশ্বাস দেয়। শেষ পর্যন্ত হলও তাই। ফিলিস্তিনের অঙ্গ হানি করে ইসরাইল নামক ইহুদি-রাষ্ট্র গড়ে তোলায় সর্বাত্মক পৃষ্টপোষকতা দিল বিশ্ব মোড়লরা। এ যেন ফিলিস্তিনের হার্টে ইসরাইলি পেসমেকার বসানো। আর মধ্যপ্রাচ্যের আসলে ইউরোপীয়রা ইহুদীদের বিশ্বাস করত না, তাই ইউরোপের বুকে ইহুদী রাষ্ট্র তারা চায়নি। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে ইহুদিদের পাঠিয়ে দিয়ে আপদ বিদায় করে ইউরোপীয়রা হাঁফ ছেড়ে বাঁচে। একইসঙ্গে হিটলারের জেনোসাইড এর প্রায়শ্চিত্য করতে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইহুদীদের জন্য দেশ গড়ে দেয় পশ্চিমারা।
২০১৭ সালের ৬ ডিসেম্বর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গাজোয়ারি করে জেরুজালেমকে ইসরাইলের রাজধানী বলে ঘোষণা করেন। জেরুজালেম যেন তার পৈতৃক সম্পত্তি। তার দু-সপ্তাহ পর ২১ ডিসেম্বর রাষ্ট্রসংঘে পাল্টা প্রস্তাব পাস হয় এবং ট্রাম্পের সেই ঘোষণা বাতিল হয়ে যায়। এই প্রস্তাব পাস করানোর জন্য শতাধিক দেশের রাষ্ট্রপ্রধানের সঙ্গে কূটনৈতিক দৌত্য চালান তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তৈয়ব এরদোগান। রাষ্ট্রসঙ্ঘের জেনারেল এসেম্বলিতে বিপুল সংখ্যাধিক্যে পাস হয় সেই প্রস্তাব।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ব্রিটিশ ও ফরাসি উপনিবেশবাদের কফিনে শেষ পেরেক পুঁতে দিলে বৈশ্বিক কূটনীতিতে আমেরিকা এতই শক্তিশালী ও প্রভাবশালী হয়ে ওঠে যে, রাষ্ট্রসংঘে প্রস্তাব পাস হলেও এখনও জেরুসালেম ইসরাইলের রাজধানী হয়েই রয়ে গেছে। এবার ট্রাম্প পুনরায় জিতে মসনদে ফিরতে চলেছেন। ২০ জানুয়ারি ২০২৫ তিনি হোয়াইট হাউসের চাবিকাঠি হাতে পাবেন। তারপর ফিলিস্তিনের ভাগ্যে কী হবে, তা সময়ই বলবে।
মক্কা-মদীনার পর বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম ইসলামী ঐতিহ্যবাহী ইবাদাতগাহ তথা মুসলিম উম্মাহর প্রথম কিবলা তথা বিশ্বনবী (সা.) এর মিরাজের স্মৃতি বিজড়িত পবিত্র বায়তুল মুকাদ্দাস এই জেরুজালেম নগরীর প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত। অতএব বলাবাহুল্য যে, ট্রাম্প ৭ বছর আগে নেতানিয়াহুকে জেরুজালেম উপহার দেওয়ায় মুসলিম উম্মাহ মুণ্ডু-বিহীন ধড়ে পরিণত হয়েছে। তবুও ৫৭টা মুসলিম দেশ ঐক্যবদ্ধ হতে পারছে না। ওআইসি, আরব লিগ বারে বারে লোক দেখানো বৈঠক করছে এবং অশ্ব ডিম্ব প্রসব করছে।

জেরুজালেম ছিল শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদী ট্রাম্পের যায়নবাদী মাস্টারস্ট্রোক। এটাই হল মধ্যপ্রাচ্যে দ্বিরাষ্ট্র সমাধানের সূর্যাস্ত। ১৯৯৩ সালে বিল ক্লিনটনের মধ্যস্থতায় সই হওয়া অসলো চুক্তি ছিল সুপার ফ্লপ। ওই চুক্তিতে ইসরাইলও সই করেছিল। যাতে উল্লেখ ছিল ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেবে ইসরাইল। গাজা উপত্যকায় ফিলিস্তিনি কতৃপক্ষের স্বশাসন চলবে। কিন্তু ২০০৬ সালের নির্বাচনে গাজায় হামাস জয়ী হলে ইসরাইল তা সহ্য করতে পারেনি। সেই থেকেই টানা ১৭ বছর ধরে গাজাকে তিনদিক থেকে সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ করে রেখেছে ইসরাইল। ৩২০ বর্গকিমি. এলাকা বিশিষ্ট গাজায় প্রায় ২৬ লক্ষ মানুষ গাদাগাদি ঠাসাঠাসি করে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে।
গত ১৪ মাসের যুদ্ধে নারী ও শিশু-সহ প্রায় ৫০ হাজার ফিলিস্তিনিকে নৃশংসভাবে হত্যা করেছে ইসরাইল। তবুও পশ্চিমারা তাদের ঔরসজাত লাওয়ারিশ সন্তান ইসরাইলকে গণহত্যা চালিয়ে যেতে অবাধ লাইসেন্স দিয়ে রেখেছে। কেউ জানে না, আর কত ফিলিস্তিনি শহীদ হলে নেতানিয়াহুর রক্ত-পিপাসা মিটবে? তারপর অয়দিপাউসের মতো মৃত নগরীর রাজা হবেন তিনি!








