কেমন আছে লাঙ্গল টানা মানুষেরা
ইকাবুল সেখ
দিন পাল্টেছে — সময়ের স্রোতে পাল্টে গেছে মানুষের জীবনধারা। ভবিষ্যতে আরো পাল্টাবে। আকাশ-মহাকাশ, তথ্য-প্রযুক্তি, শিক্ষা — সকল ক্ষেত্রের মতো কৃষিক্ষেত্রেও এসেছে আমূল পরিবর্তন। নতুন প্রযুক্তির অগ্রযাত্রা গ্রামীণ বাংলাজুড়ে সম্ভাবনার নতুন আলোকবর্তিকা নিয়ে হাজির হয়েছে।
একসময় ভোরবেলা মাঠের ধার দিয়ে হাঁটলে শোনা যেত বলদের গলার ঘণ্টা। লাঙলের ফলায় টান পড়ত মাটির বুকে, ধুলো-হাওয়া ভাসা আলোয় কৃষকের মুখে ফুটত পরিশ্রমের দীপ্তি। সন্ধ্যেবেলাও একই দৃশ্য — গ্রামবাংলার সুর, কৃষকের ঘাম, আর মাঠজুড়ে মানুষের প্রাণের হাসি। কৃষিই ছিল দেশের অর্থনীতির প্রাণশক্তি, শ্রমিক-কৃষকই ছিল চলমান চাকার চালিকাশক্তি।
কিন্তু সময় বদলেছে। সেই চিরচেনা দৃশ্য আজ ইতিহাস। কৃষিক্ষেত্রে যুক্ত হয়েছে যন্ত্রের নতুন যুগ — এক নতুন প্রযুক্তি-বিপ্লব। আজ গ্রামীণ কৃষি জমিতে বলদ, কাঠের লাঙল, গরুর গাড়ি, মহিষ — সবই যেন রূপকথার গল্প। চাষাবাদের নতুন ভাষা –ট্রাক্টর, পাওয়ার টিলার, হারভেস্টার, কম্বাইন মেশিন, ড্রোন-স্প্রে ইত্যাদি কতকিছু। কৃষি যেন এক নতুন প্রযুক্তির স্বর্গরাজ্য — সময় কমে গেছে, খরচও কমেছে, উৎপাদন বেড়েছে, ঝুঁকি কমেছে। কৃষিকাজ আজ অ্যাপ, ডেটা, সেন্সর, বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ –সবকিছুর সমন্বয়ে তৈরি এক আধুনিক মডেল। জমির মালিকেরা এর সুবিধা পাচ্ছেন, উৎপাদন জোরদার হয়েছে, বাজারে সরবরাহ বেড়েছে।
কিন্তু প্রশ্নটা থেকে যায় — “কেমন আছে লাঙ্গল টানা মানুষগুলো?” যারা ভোর হতেই মাঠে দৌড়াত, যারা মাটির গন্ধে স্বর্গ খুঁজে পেত — তাদের দিনের আলোর মতো স্পষ্ট ভবিষ্যৎ আজ ঘন কুয়াশার চাদরে ঢাকা। একটা যন্ত্র যেখানে একাই ঘণ্টা খানেকের কাজ ১০-১৫ মিনিটে সেরে দেয়, সেখানে শ্রমিককে রাখা যেন অলাভজনক।
ফলে যে মানুষগুলো লাঙল হাতে জীবন চালাত, তারা অনেকেই আজ বেকার, অস্থির কর্মসংস্থান, কিংবা অপ্রতুল আয়ের ঘানিতে পিষ্ট। কেউ বিদেশে শ্রম বিক্রি করছে, কেউ অটো-টোটো চালাচ্ছে, কেউ ইটভাটায় বা নির্মাণ শ্রমিক। কিন্তু যাদের নতুন দক্ষতা নেই, যাদের আর্থিক পুঁজি নেই — তাদের জীবন নেমে গেছে দারিদ্র্যের অতল গহ্বরে। অনেকে খাদ্য-বস্ত্রের টানাপড়েনে দিন কাটাচ্ছে, অসুস্থতা নিয়েও মুখ বন্ধ করে বেঁচে থাকে।
কারণ, তাদের অভিযোগ শোনার কেউ নেই। যা আছে, তা হল অভিযোগহীন আক্ষেপ, মাটির স্মৃতি, আর কষ্টে লেখা এবং মাথার ঘাম পায়ে ফেলা দিনপঞ্জি। আজ মাঠে শোনা যায় শুধু যন্ত্রের শব্দ — মানুষের সুর নয়। আজ আর কেউ গলা ছেড়ে গান ধরে না, “আমার চাষ করি আনন্দে…”
জীবনানন্দের কল্পিত রূপসী বাংলা আজ কবিতায় সীমাবদ্ধ, বাস্তবে নয়। এই পরিবর্তনের মাঝে ভুলে গেলে চলবে না — কৃষিজীবী মানুষেরাই দেশের প্রকৃত সাথী, দেশ গড়ার কারিগর। তাদের জীবনযাপন সুরক্ষিত না হলে কৃষি উন্নয়নের এই নতুন যন্ত্র-সভ্যতা দাঁড়াবে কাচের গায়ে, ঝড় লাগলে ভেঙে পড়বে।
তাই প্রয়োজন সুপরিকল্পিত সরকারি নীতিমালা, দক্ষতার সঙ্গে উন্নয়ন কর্মসূচি, বিকল্প কর্মসংস্থান, গ্রামভিত্তিক ক্ষুদ্র শিল্প এবং কৃষিশ্রমিক পুনর্বাসনের জন্য বিকল্প চিন্তাভাবনা। এখনই সময় প্রমাণ করার, কৃষিকাজে যারা ঘাম ঝরিয়ে আমাদের মুখে অন্ন তুলে দেয়, তারা আমাদের বন্ধু, আমাদের শক্তি। আজ তাদের পাশে দাঁড়ানোই আমাদের সত্যিকারের দায়িত্ব।
ডিজিটাল যুগে হারিয়ে যাচ্ছে লাঙ্গল। আমাদের সন্তানরা এই আবশ্যিক কৃষি উপকরণের সাথে তেমন পরিচিত নয়। ‘হাল’ বা লাঙলকে ইংরেজিতে বলা হয় Plough, এটি একটি তৎসম শব্দ, যা সর্বভারতীয় অঞ্চলের আদিম কৃষি যন্ত্র।
কৃষিকাজে ব্যবহৃত অন্যতম পুরনো দেশীয় যন্ত্র হল লাঙল। এটি মূলত গরু, মহিষ বা ঘোড়া, গাধা দ্বারা টানা হয়। ঠিক কবে, কোথায় লাঙলের ব্যবহার শুরু হয়েছিল, তা সঠিক জানা যায় না। তবে প্রাগৈতিহাসিক যুগে লাঙলের ব্যবহার হয়েছে। শুরুতে লাঙল ছিল সম্পূর্ণ কাঠের তৈরি। লৌহ যুগে (খ্রিস্টপূর্ব ১২০০-৬০০) লোহার ফলা-সহ লাঙলের ব্যবহার শুরু হয়। সপ্তম শতকের প্রথম দিকে বাংলায় লাঙল ব্যবহারের নিদর্শন পাওয়া যায়।
লাঙল বানানো হয় মূলত কাঠ দিয়ে। গ্রামের ছুতার বা কাঠমিস্ত্রিরা এটি বানিয়ে থাকেন। লাঙলের দুটি অংশ। একটি হাল বা লাঙল; অন্যটি হল জোয়াল, যা গরু বা মহিষের ঘাড়ে রাখা হয়। লাঙল বানানোর শুরুতে একটি কাঠ বাঁকা করে কাটতে হয়। এরপর কাঠের আগায় লোহার একটি ফলক বা ফাল লাগানো হয়। এই ফলকের সাহায্যেই লাঙল মাটি চিরে জমি চষে। লাঙলের ওপরের অংশকে বলা হয় হাতল। এই হাতল চেপে ধরেই কৃষকরা জমিতে লাঙল চালনা করেন। লাঙলের মধ্য স্থানে একটি ছিদ্র করা হয়। এই ছিদ্রপথে প্রায় আট ফুট লম্বা একটি কাঠ যুক্ত করা হয়, যার আগায় চার থেকে পাঁচটি দাঁত বা খাঁজ কাটা থাকে। এটাকে ঈষ বলা হয়। ঈষের খাঁজে রশি বেঁধে গরুর কাঁধে থাকা জোয়ালের সঙ্গে লাঙল লাগানো হয়। ঈষ যাতে লাঙলের সঙ্গে ভালভাবে আবদ্ধ থাকে, সে জন্য ছোট কাঠের একটি খিল ব্যবহার করা হয়।
লাঙল দিয়ে হালচাষ করতে কমপক্ষে একজন লোক ও এক জোড়া গরু বা মহিষের প্রয়োজন হয়। জমি চাষের সময় লাঙলের ফলা মাটিতে গেঁথে গিয়ে মাটিকে ওলট-পালট করে দেয়। মাটির নিচের স্তরের পুষ্টিগুণ ওপরে উঠে আসে এবং মাটির ওপরের আগাছা ও ফসলের অবশিষ্ট নিচে চাপা পড়ে জৈব সারে পরিণত হয়। এ ছাড়া লাঙল মাটিতে বায়ু চলাচলের পরিমাণ বাড়িয়ে মাটির আর্দ্রতা ধরে রাখতে সাহায্য করে। ভাল একটি লাঙল অনেক বছর টেকসই হয়। লাঙল ব্যবহারের সুবিধা হল, এটি সহজলভ্য, তৈরি ও পরিচালনা করা সহজ, ওজনে হালকা বলে বহনযোগ্য।
বর্তমানে লাঙলের পরিবর্তে আধুনিক ট্রাক্টর ও পাওয়ার টিলার ব্যবহার করা হচ্ছে; কিন্তু একেবারে বিলুপ্ত হয়ে যায়নি লাঙল। প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলের কিছু কিছু এলাকায় এখনো লাঙল দিয়ে হালচাষ করতে দেখা যায়।







