গ্রীনল্যান্ডে সবুজ সংকেত কে দিল?
দুদিন আগেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, গ্রীনল্যান্ড নিয়ে পিছু হটার জায়গা নেই। বৃহস্পতিবার দাভোসে ‘ওয়ার্ল্ড ইকনোমিক ফোরাম’-এ যোগ দেবার পথে ট্রাম্প আবার স্পষ্ট করে দেন, গ্রিনল্যান্ড দখল বা নিয়ন্ত্রণের পরিকল্পনা থেকে একচুলও সরছেন না। যেন তেন প্রকারে, এমনকি প্রয়োজনে সামরিক শক্তি প্রয়োগ করেও গ্রিনল্যান্ড দখল তিনি করবেনই। আমেরিকার জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থেই এটা জরুরি। কারণ, ট্রাম্পের নীতি হল ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ এবং তাঁর ব্রত, ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’। সব আন্তর্জাতিক আইন-কানুন, রীতিনীতিকে অমান্য করে একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশের অবিচ্ছেদ্য অংশকে গায়ের জোরে কেড়ে নেবার এমন হুমকি বিশ্ব রাজনীতি ও কূটনীতিতে বিরল দৃষ্টান্ত।
এর জন্য ট্রাম্প যে ছেলেমানুষি বা মনগড়া অজুহাত খাড়া করছেন, সেটা হল চীন-রাশিয়া নাকি গ্রিনল্যান্ড দখলের জন্য মুখিয়ে রয়েছে। তাদের হাত থেকে ডেনমার্ক নাকি গ্রিনল্যান্ড রক্ষা করতে পারবে না। তাই ট্রাম্প আগেভাগে গ্রিনল্যান্ডকে পকেটস্থ করে নিতে চান। যদিও চীন বা রাশিয়া কোনোদিন তাদের এমন আকাঙ্ক্ষার কথা কখনও ব্যক্ত করেনি। আসলে দুরাত্মার ছলের অভাব হয় না।
বিশ্বের বৃহত্তম দ্বীপ গ্রিনল্যান্ড ডেনমার্কের অধীনস্ত একটি স্বশাসিত অঞ্চল। চির তুষারাবৃত দ্বীপটিতে বাস করেন মত্র ৫৮ হাজার মানুষ। মার্কিন নেতৃত্বে পশ্চিমাদের সামরিক জোট ন্যাটের সদস্য ডেনমার্কও। ন্যাটো চুক্তির অন্যতম প্রধান বিষয় হল, তাদের কোনো সদস্য দেশ বহিঃশত্রু দ্বারা আক্রান্ত হলে ন্যাটো সদস্যরা সবাই একযোগে ঝাঁপিয়ে পড়বে। সেই নিয়ম অনুযায়ী গ্রিনল্যান্ড তথা ডেনমার্ক চীন-রাশিয়া দ্বারা আক্রান্ত হলে আমেরিকার নেতৃত্বে গোটা ইউরোপ তথা ন্যাটো পালটা আক্রমণে নামবে। তাহলে রাশিয়া-চীন কর্তৃক গ্রিনল্যান্ড দখলের আশঙ্কা অমূলক।
ন্যাটো চুক্তির দৌলতে ইউরোপের প্রায় সব দেশেই রয়েছে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি। পেন্টাগনের নিশ্চিদ্র নিরাপত্তা বেষ্টনির মধ্যে আছে ইউরোপ। এমনকি গ্রিনল্যান্ডেও আছে মার্কিন বিমান ঘাঁটি ও নৌঘাঁটি। মার্কিন সেনারা ইতিমধ্যেই প্রবলভাবে গ্রিনল্যান্ডে মোতায়েন আছে। চীন-রাশিয়া দখল করলে আমেরিকার সঙ্গে গোপন আঁতাত করেই তা করতে হবে। সেটা নিতান্তই বাতুলতা। চীন-রাশিয়ার গ্রিনল্যান্ড দখলের কোনও প্রশ্নই নেই; বরং গ্রিনল্যান্ড দখলে মরিয়া এবং বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন খোদ ট্রাম্প। দ্বিতীয়বারের জন্য ক্ষমতায় এসেই সমস্ত আন্তর্জাতিক নিয়মনীতি লঙ্ঘন করে মাফিয়ার মতো ঔদ্ধত্য আচরণ শুরু করেছেন ট্রাম্প। কানাডা, মেক্সিকো, গ্রিনল্যান্ড, গাজা, পানামা খাল দখলের হুমকি লাগাতার দিয়ে চলেছেন। কেশর ফুলিয়ে এও বলেছেন, তার গ্রিনল্যান্ড দখল প্রক্রিয়ায় যে বাধা দেবে তার গায়ে গুড় দিয়ে চাঁটবেন না। ইতিমধ্যে ফ্রান্স, জার্মানি-সহ ৮ ইউরোপীয় দেশের বিরুদ্ধে শুল্ক অস্ত্র প্রয়োগ করেছেন। অথচ জি-৭ এর সদস্য দেশ কানাডা, মেক্সিকো হল লাতিন আমেরিকার একটি স্বাধীন দেশ, বিশ্বের বৃহত্তম দ্বীপ গ্রিনল্যান্ড ডেনমার্কের অধীনস্ত একটি স্বশাসিত অঞ্চল, গাজা হল মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ফিলিস্তিনের অবিচ্ছেদ্য অংশ, পানামা হল কানাডার মতোই উত্তর আমেরিকা মহাদেশের অন্তর্গত একটি স্বাধীন ক্ষুদ্র দেশ। এইসব দেশ ও অঞ্চলকে ট্রাম্প তার দেশের সঙ্গে জুড়ে নিয়ে ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ করতে চান। একইভাবে ব্রিটেন, ফ্রান্সের মতো একদা ঔপনিবেশিক দেশগুলো যদি তাদের পুরনো অধীনস্ত দেশগুলোকে টেনে নিতে চায়, তাহলে কী হবে? ঝুড়ি-কোদাল নিয়ে ট্রাম্প বাবাজীকে এসব কে বোঝাবে? উল্লেখ্য, ১৬০৭ থেকে ১৭৮৩ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ১৭৬ বছর ব্রিটিশ শাসনের অধীনে ছিল আমেরিকা। তার বেলায় কী হবে? ট্রাম্প কি ঘুণাক্ষরেও এসব ভেবেছেন?
ট্রাম্পের এমন একতরফা হুমকিতে ইউরোপজুড়ে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। ৭০ বছরের ন্যাটো জোটে ভাঙনের আভাস উঁকি মারছে। ট্রাম্পের হুমকিতে ইউরোপের সার্বভৌমত্বই শুধু বিপন্ন নয়, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাও ঝুঁকির মুখে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধোত্তর বিশ্বব্যবস্থার মৌলিক ধারণা ও কাঠামোকেই ট্রাম্প লংঘন করতে শুরু করেছেন। অর্থহীন করে দিতে চাইছেন রাষ্ট্রসঙ্ঘকেও। তিনি আমেরিকাকে বিশ্বগুরুর আসনে বসাতে কোনকিছুর তোয়াক্কা করছেন না। পুঁজিবাদ, সাম্রাজ্যবাদ, উগ্র শ্বেতাঙ্গবাদ ও যায়নবাদের সমন্বয়ে ককটেল মার্কা নিউ ওয়ার্ল্ড অর্ডার রচনা করতে চাইছেন ট্রাম্প। একবিংশ শতাব্দীতে যা হবে আধুনিক সাম্রাজ্যবাদী রাজতন্ত্র।
ট্রাম্পের সাম্রাজ্য বিস্তারের সেই ঔপনিবেশিক যুগের ধ্যানধারণা আজো বুকে বয়ে বেড়াচ্ছেন। তাই মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের একচ্ছত্র দাপট দেখাতে তিনি সমরশক্তির প্রদর্শনে মেতেছেন। নিজ দেশের প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের নাম বদলে করেছেন যুদ্ধ মন্ত্রক। রণংদেহী ট্রাম্পের মতে, প্রতিরক্ষা বা আত্মরক্ষা নয়, এখন চাই পুরোদমে যুদ্ধ। যেহেতু তিনি নোবেল শান্তি পুরস্কার পাননি, তাই তিনি আর শান্তি নিয়ে বেশি মাথা ঘামাতে রাজি নন। কিন্তু তিনি ইতিহাস জানেন না। গত শতাব্দীতে ভিয়েতনাম যুদ্ধে মার খেয়ে এবং চলতি শতাব্দীতে দু-দশকের ইরাক ও আফগানিস্তান যুদ্ধে ব্যর্থ হবার পর মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ট্রাম্পের হাত ধরে পুনরায় পুনরুজ্জীবিত হতে চাইছে। তাই ইউরোপকে তার প্রতিদ্বন্দ্বী মনে হচ্ছে। তিনি চাইছেন একমেরু বিশ্ব গড়তে। তাই ইউরোপকে দুর্বল করতে সচেষ্ট হয়েছেন। ২৭ সদস্যের ইউরোপীয় ইউনিয়নকে ভেঙে টুকরো করতে অপপ্রয়াস চালাচ্ছেন। নাহলে তার ঠাটবাট বজায় রাখা যাচ্ছে না।
আসল কথা দুটি তো নয়, একটিই মোটে। সেটা হল বিপুল মজুত খনিজ ও প্রাকৃতিক সম্পদ, বিশেষ করে বিরল ধাতু এই অফুরন্ত সম্পদের দখল নিতেই ট্রাম্পের মাথায় গ্রিনল্যান্ড দখলের কীটপতঙ্গ কিলবিল করছে। সাম্রাজ্যবাদের আঁতুড়ঘরেই এখন আমেরিকা বনাম ইউরোপ যুদ্ধের দামামা বাজছে।








