উড়ান সংস্থার বিপর্যয় কেন
মাত্র এক সপ্তাহেই উড়ান সংস্থা ইন্ডিগোর পরিকাঠামো ও পরিষেবা তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছে। একইসঙ্গে দেশের অসামরিক পরিবহণ ব্যবস্থার মেরুদণ্ড ভেঙে গিয়েছে। নরেন্দ্র মোদীর জামানায় বিকশিত ভারতে উন্নয়ন যখন চিলেকোঠায় উঠে গেছে, দেশ যখন ৫ ট্রিলিয়ন ডলারের গণ্ডি ছাড়িয়ে বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির তকমা জোটাতে চাতক পাখির মতো হাপিত্যেশ করছে, তখন আচমকা বাতিল হয়েছে কয়েক হাজার উড়ান। দেশের প্রায় সব রাজ্যের বিমান বন্দরে হাজার হাজার যাত্রী চূড়ান্ত নাকাল ও দুর্ভোগের শিকার। প্রযুক্তিগত বা যান্ত্রিক গোলযোগের কারণে এই নজিরবিহীন অচলাবস্থা তৈরি হয়নি। ধর্মঘট বা আন্দোলনের কারণেও এমন সঙ্কট তৈরি হয়নি। বরং এমনটা হতে পারে জানা সত্ত্বেও আগাম কোনও ব্যবস্থা না নিয়ে কয়েক লক্ষ বিমান যাত্রীকে এমন ঘোরতর হেনস্তা ও সঙ্কটের মুখে ঠেলে দেওয়া হল। সবথেকে আশ্চর্যের ব্যাপার হল, এমন একটা অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে যাচ্ছে , তা জেনে-বুঝেও কেন্দ্র সরকার সতর্ক হয়নি বা কোনও পদক্ষেপ নেয়নি।
শেষ পর্যন্ত যখন গোটা ব্যবস্থাটাই ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়, তখন শেষবেলায় পরিস্থিতি সামাল দিতে আসরে নামে সরকার। অসামরিক বিমান পরিবহণ নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ জিডিসিএ’র চালু করা পাইলট ও বিমান কর্মীদের ডিউটি সংক্রান্ত নতুন বিধি স্থগিত করেছে সরকার। বিমান মন্ত্রী ঘোষণা করেছিলেন, তিন দিনের মধ্যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এক সপ্তাহ পরেও স্বাভাবিক ছন্দে ফেরেনি ইন্ডিগো। অবশ্য যাদের জন্য এই বিপর্যয় সেই ইন্ডিগো-র সিইও জানিয়েছেন ১৫ ডিসেম্বরের আগে স্বাভাবিক হবে না। আজ সেই বহু আকাঙ্খিত ১৫ ডিসেম্বর। দেখা যাক, আজ থেকে কোন ফুসমন্তর বা জাদুবলে উড়ান পরিষেবা স্বাভাবিক হয়!

বিমানের পাইলট ও কর্মীদের ডিউটি সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক কিছু নিয়ম আছে। অতিরিক্ত মুনাফার জন্য দেশীয় বিমান সংস্থাগুলি সেই নিয়ম উপেক্ষা করে অবসরের সময় কমিয়ে জোর করে অতিরিক্ত সময় কাজ করাতে বাধ্য করে। সপ্তাহে ৩৬ ঘণ্টা বিশ্রাম এবং বেশি নাইট ডিউটি ও রাতে বেশি বিমান অবতরণে বাধ্য করা হত পাইলটদের। ফলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়তে থাকে এবং যাত্রী নিরাপত্তা বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। তাই ডিজিসিএ নতুন বিধি তৈরি করে গত বছর জানুয়ারি মাসে এবং তা চালু করার কথা ঘোষণা করে এ’বছর জুন থেকে। কিন্তু বিমান সংস্থাগুলির চাপে তা কার্যকর করা সম্ভব হয়নি। পরে দিল্লি হাইকোর্টের নির্দেশে নভেম্বর-২৫ থেকে তা কার্যকর হয়। নতুন বিধিতে অতিরিক্ত পাইলট ও কর্মী প্রয়োজন জেনেও দেশের বৃহত্তম বিমান সংস্থাগুলো তা করেনি। কম পাইলট দিয়ে কাজ চালাতে গিয়ে পাইলটের অভাবে উড়ান বাতিল হতে হতে পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার নেয়। অতঃপর সরকারের হস্তক্ষেপে স্থগিত হয়ে যায় নতুন বিধি। এখন প্রশ্ন হলে, এক বছরেরও বেশি সময় পেয়েও কেন নতুন পাইলট ও কর্মী নিয়োগ করা হয়নি। সরকারই বা এই প্রশ্নে এতদিন নজর দেয়নি কেন?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বেসরকারি সংস্থার চাপের কাছে নতি স্বীকার করেছে কেন্দ্র সরকার। অথবা বেসরকারি সংস্থার বাড়তি মুনাফার স্বার্থে সরকার নিষ্ক্রিয় ছিল। ইন্ডিগো বিমান পরিষেবার ৬৫ শতাংশ দখল করে একচেটিয়া ব্যবস্থা কায়েম করে সরকারের মাথায় চেপে বসেছে। তারা জানে গোটা নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে। তাই সরকার তাদের পক্ষে কাজ করতে বাধ্য বা তাদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ করার হিম্মত সরকারের নেই। এই জন্য সম্ভবত সচেতনভাবে বিপর্যয়ের সুযোগ তৈরি করেছে নতুন কর্মী নিয়োগ না করে। একচেটিয়া ব্যবস্থা এভাবেই জনস্বার্থকে বুড়ো আঙুল দেখায়।
স্বাধীন ভারতের ইতিহাসে, বিশেষ করে দেশে উদারনীতি চালু হবার পর সর্বত্র বেসরকারি পুঁজির দাপটের মধ্যে এমন মহাবিপর্যয় এই প্রথম। বিশ্বাস করা কঠিন যে, বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম বিমান পরিবহণ বাজারে এমন অচলাবস্থা অবলীলায় তৈরি হয়ে গেল। বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি হবার স্বপ্নে মশগুল কোনও সরকার এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন হতে পারে! আসলে উদারনীতিতে বেসরকারিকরণের ঢালাও সুযোগে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠেছে বহু বেসরকারি উড়ান সংস্থা। আর্থিক সামর্থ্য, যোগ্যতার মাপকাঠি, নিরাপত্তার বিধি যথাসম্ভব শিথিল, যাকে তাকে এই ব্যবসায় নামার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি কম ভাড়া এবং টিকিটে অফারের নামে যাত্রী বাড়ানোর লক্ষ্যে নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিধি বেপরোয়াভাবে লঙ্ঘন হতে থাকে। মেয়াদ উত্তীর্ণ বিমান, সময়মতো যথাযত মেরামতি, নিত্যদিন পরীক্ষা-নীরিক্ষা না করেই কোন বিশ্রম না দিয়েই দিনের পর দিন আকাশে উড়তে থাকে লজঝড়ে বিমান। বিশ্রাম পান না পাইলট, কো-পাইলট থেকে কর্মীরাও। মোটা মুনাফার লোভে উড়ান সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিধিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে পাইলটদের বিশ্রাম ও রাতে ঘুমোনোর পর্যাপ্ত সুযোগ না দিয়ে বিমান চলে আকাশের বুক চিরে। যাত্রীদের জীবনের নিরাপত্তা ছেড়ে দেওয়া হয় চরম ঝুঁকিতে। এভাবেই মানুষের জীবন নিয়ে চলে ছিনিমিনি খেলা। দুর্ঘটনা ঘটলে কিছু ক্ষতিপূরণের ঘোষণা দিয়েই সবাই খালাস পায়।
রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা এয়ার ইন্ডিয়া বিক্রি হয়ে যায় টাটার কাছে। দেশের বিমান বন্দরগুলি একে একে তুলে দেওয়া হয় আদানিদের কাছে। ফলে যাত্রী বিমান পরিবহণ ব্যবস্থা ও পরিষেবা চলে যায় বেসরকারি পুঁজির অধীনে। সরকারের নিয়ন্ত্রণ বা হস্তক্ষেপের অধিকার কার্যত লাটে উঠে যায়। দেশি-বিদেশি বেসরকারি কর্পোরেট পুঁজির কাছে সরকার হয়ে যায় ঠুঁটো জগন্নাথ।








