অনন্য কথাকার সৈয়দ রেজাউল করিম প্রাক্তন গোয়েন্দাকর্তা লিখেছেন ৭০টি বই
নতুন পয়গাম: সাহিত্যিক সৈয়দ রেজাউল করিমের নাম শুধুমাত্র পশ্চিমবাংলা নয়; আসাম, ত্রিপুরা, বাংলাদেশের সাহিত্যাকাশে উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো জাজ্জ্বল্যমান এবং অগণিত পাঠক-হৃদয়ে মূল্যবান অলঙ্কারাদির মতো বিরাজমান, কেবলমাত্র তার রচনার গুণ-মানে ও বিষয় বৈচিত্রের কারণে।
সৈয়দ রেজাউল করিমের জন্ম ১৯৫৭ সালের ২২ জুন, দক্ষিণ ২৪পরগনার ডায়মন্ডহারবার থানার (এখন রামনগর থানা) অন্তর্গত খোর্দ অঞ্চলের সিমলা গ্রামে। পিতা সৈয়দ রওশন আলী ছিলেন সিমলা অবৈতনিক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। মাতা সৈয়দা গোলাপজান বিবি।
১৯৮৭ সালে বসিরহাট মহকুমার দেগঙ্গা থানার অন্তর্গত ভাসলিয়া গ্রামের সেখ আমজাদ হোসেন (সিইও: ডিভিসি)-এর কন্যা ফরিদা খাতুনের সঙ্গে তাঁর বিবাহ হয়। তাঁদের দুই সন্তান, সৈয়দা রেহানা সুলতানা এবং সৈয়দ নিয়াজ মুর্শিদ (ডিফেন্স অডিটর)।
সৈয়দ রেজাউল করিমের পড়াশোনা গ্রামের সিমলা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন মাথুর জুটিরাম মেমোরিয়াল হায়ার সেকেন্ডারি স্কুল থেকে। স্নাতক হন ডায়মন্ড হারবার ফকির চাঁদ কলেজ থেকে। পরিবারে বাবা, দাদা, বৌদি প্রমুখ শিক্ষকতায় নিযুক্ত থাকার কারণে ছেলেবেলা থেকেই নীতিকথা, সত্যবাদিতা, ন্যায়পরায়ণতা, ধর্মনিরপেক্ষতা ও মানবতার পাঠ পেয়েছিলেন।
তাছাড়া দৈনিক সংবাদপত্র-সহ শুকতারা, চয়নিকা, তেপান্তর, কিশোর ভারতী ইত্যাদি নানা পত্র-পত্রিকা আসত বাড়িতে। সেগুলো নেড়েচেড়ে দেখা ও পড়ার সুযোগ হয় তাঁর। এবং বড়দের অনুপ্রেরণায় লেখালিখি শুরু করেন। স্কুল ও কলেজ ম্যাগাজিনে তাঁর লেখা গল্প, নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। তাতে তাঁর মনে সাহিত্যিক হবার বাসনা জাগে। সেসময় কাফেলা, বুলবুল, ঝংকার-সহ বিভিন্ন ছোট-বড় পত্রিকায় তাঁর লেখা নিয়মিত প্রকাশিত হত। ‘দীপ’ এবং ‘বৈশাখী মেঘ’ নামে দুটি পত্রিকা সম্পাদনা করতেন তিনি।
রহস্য রোমাঞ্চের প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিল তীব্র। স্কুল ও কলেজ জীবনেই তিনি চিনে ফেলেন ব্যোমকেশ, কর্নেল, পরাশর কিরীটি, প্রতুল লাহিড়ী, বরদাচরণ, সত্যপ্রিয়, দীপক, মোহন, পাণ্ডব গোয়েন্দার মতো অসংখ্য গোয়েন্দা চরিত্রকে। আর এমনই কপাল তাঁর, চাকরিটাও জুটে গেল গোয়েন্দা পুলিশের। ক্রমে কর্মজীবনে তিনি হয়ে উঠলেন একজন দুঁদে রহস্য উন্মোচনকারী অফিসার। তাঁর সেই বর্ণময় পুলিশের
কর্মজীবনে নানা চরিত্রের মানুষের সঙ্গে ওঠা-বসায় এক নতুন দিগন্ত খুলে গেল তাঁর সাহিত্যের জীবন-পাতায়। পাঠকেরাও ভাবিত হল তার রচনার আঙ্গিকে।
স্বভাবতই একটা প্রশ্ন মনে জাগে, তাঁর লিখিত রচনা পাঠ করার জন্য পাঠক মনে এত আগ্রহ, এত আসক্তি কেন? এত উৎসাহই বা কোথা থেকে আসে? আসলে তাঁর রচনার মধ্যে ছড়িয়ে আছে অযুত ঐশ্বর্য। আছে এক অদ্ভুত মাদকতা। এক দুর্বার আকর্ষণ, যা আষ্টেপিষ্টে বেঁধে ফেলে পাঠকের মননকে। যার শব্দগঠন, বাক্যবিন্যাস, ভাষার বন্ধন ও কারুকার্য সাধারণ থেকে অসাধারণত্বে পৌঁছে দেয় অনায়াসে।
তাঁর রচনার বিশেষ গুণ হল, তাঁর গল্পের শুরু ও শেষের মধ্যে থাকে অদ্ভুত পারম্পর্য, যা অনায়াসে টেনে নিয়ে যায় পাঠককে। বিশেষ করে ছোটদের লেখায় আমরা লক্ষ্য করি, তাঁর মননের চমৎকারিত্ব। চরিত্রচিত্র অনবদ্য। রহস্যের অলিন্দে কাটিয়ে আসা মানুষটার এ পর্যন্ত প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা সত্তরের উপর। তাঁর লেখা শতাধিক দেশের লোককথা, রংবেরঙের শতাধিক গল্প, গোয়েন্দা রহস্য ১৩,১৪,১৫,১৬,১৭, দশ রসিকের গল্প, থানা দুয়ারে ভালোবাসা, থানা প্রাঙ্গণে ভালোবাসা, থানাঙ্গনে ভালোবাসা ইত্যাদি বই পাঠক সমাজে খুব সমাদৃত।
তাঁর রচনায় আপ্লুত হয়ে আলিয়া সংস্কৃতি সংসদ, উদ্ভাস সাহিত্য সংস্কৃতি, অনন্য বনফুল, ফুটপাথ, অজগর, ইদানিং নাট্যগোষ্ঠী-সহ ৩০টিরও বেশি সংস্থা তাঁকে সম্মানিত ও সংবর্ধিত করেছেন বিভিন্ন পুরস্কার দিয়ে।
সৈয়দ রেজাউল করিম এ পর্যন্ত প্রবন্ধ, নিবন্ধ, গল্প, উপন্যাস, কবিতা প্রচুর লিখেছেন। সম্পাদনা করেছেন বহু গ্রন্থ। অনন্য এই কথাকার, সাহিত্যিক এখনো সমানতালে লিখে চলেছেন বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় ও দৈনিক কাগজে। দৈনিক ‘নতুন পয়গাম’ সংবাদপত্রও তাঁর কৃপা থেকে ব্রাত্য নয়।








