ভাবিয়া করিও কাজ
প্রবাদে আছে, ভাবিয়া করিয়া কাজ, করিয়া ভাবিও না। তার মানে হল, কোনকিছু করার আগে ভালভাবে জেনে-বুঝে চিন্তা-ভাবনা করে তারপর কাজ শুরু করা। আগে-পিছে না ভেবে, বিচার-বিবেচনা না করে হুটপাট সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে দেওয়া, কাজ শুরু করে ফেলা; আবার পরক্ষণেই সেই সিদ্ধান্ত বদলানো বা বাতিল করা কিংবা কাজটা থামিয়ে দেওয়া বা স্থগিত রাখা – বারবার এমনটা হলে, বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন চিহ্ন দেখা দেওয়া স্বাভাবিক। অর্থাৎ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, সংগঠন বা সংস্থার ভাবমূর্তি নিয়ে সওয়াল উঠবেই।
প্রসঙ্গ মুসলিম পার্সোনাল ‘ল’ বোর্ড। দেশের মুসলিমদের এই অন্যতম সর্বজনীন সংস্থার কর্মকর্তাদের হল’টা কী? বারংবার তাঁরা সিদ্ধান্ত পাল্টায় কেন? এ থেকে প্রমাণ হয়, মুসলিম পার্সোনাল ল বোর্ডের মাথায় যারা বসে আছেন, তারা সময়োপযোগী নন। তারা সময়ের দাবি বুঝতে অপারগ। তারা বর্তমান দেশের চলমান রাজনৈতিক মতাদর্শ ও ঘটনাবলী সম্পর্কে সম্পূর্ণ সজাগ বা সচেতন নন। আরেকটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, বোর্ডের কর্মকর্তাদের মধ্যে সুষ্ঠু সমন্বয়ের অভাব প্রতীয়মান।
ইতিপূর্বে তাঁরা ঐতিহাসিক ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে সমাবেশ করার কথা ঘোষণা করেছিলেন। এতে রাজ্যবাসী বিশেষ করে বাংলাভাষী মুসলিম সমাজ ভীষণ উৎসাহিত হয়েছিল এবং আন্তরিকভাবে ব্রিগেড সমাবেশের জন্য প্রস্তুতি নিতে শুরু করল। গ্রামে-গ্রামে, পাড়ায়-পাড়ায়, মহল্লায়-মহল্লায় ছোট ছোট মিটিং শুরু হল। কেন্দ্র সরকারের তরফে আনা অভিসন্ধিমূলক ওয়াকফ সংশোধন আইন সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করার কাজ জোরকদমে শুরু হয়েছিল। একইসঙ্গে ওই বিতর্কিত সংবিধান বিরোধী আইন প্রত্যাহারের দাবিতে অনুষ্ঠিতব্য ঐতিহাসিক ব্রিগেড সমাবেশে দলে দলে অংশগ্রহণ করার জন্য জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সকল শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষকে আহ্বান জানিয়ে বার্তা দেওয়া হচ্ছিল।
এমতাবস্থায় সব রকমের প্রস্তুতি পর্ব যখন তুঙ্গে, আচমকা খবর এলো, ব্রিগেডের সমাবেশ বাতিল করেছে মুসলিম পার্সোনাল ল বোর্ড, যা নিয়ে সে সময় খুব আলোচনা, সমালোচনা এবং নানা মহল থেকে নানাবিধ ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ হয়েছিল। এমনকি বোর্ডের একাংশের বিরুদ্ধে রাজনীতির সঙ্গে গোপন আঁতাত বা যোগসাজশের অভিযোগও কেউ কেউ তুলছিলেন। যদিও সেটা প্রমাণসাপেক্ষ বিষয়। অভিযোগ যে কেউ, যে কারো বিরুদ্ধে করতেই পারে। কিন্তু প্রমাণ না হওয়া পর্যন্ত কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা যায় না।
যাহোক, পুনরায় সেই ওয়াক্ফ সম্পত্তি বাঁচানোর ডাক দিয়ে ৩ অক্টোবর ৬ ঘন্টার জন্য ভারত বনধের ডাক দেওয়া হল। খুব ভালো কথা। সেটাও হঠাৎ করে দু-দিন আগে বাতিল বা স্থগিত করা হল। অজুহাত দেখানো হল, ঐ তারিখে বিভিন্ন রাজ্যে অন্য ধর্মাবলম্বীদের পুজো-পার্বণ আছে। কিন্তু এখানে কথা হল, পুজো পার্বণ ইত্যাদি তো ক্যালেন্ডারে উল্লেখ করাই থাকে। অনেক আগে থেকেই বিভিন্ন ধৰ্মের উৎসবের দিনক্ষণ জানা যায়। তাহলে পার্সোনাল ল বোর্ডের কর্তাব্যক্তিরা কি ক্যালেন্ডারও দেখেন না। সন-তারিখ কিছু না দেখেই হুটপাট প্রোগ্রাম ঘোষণা করে দেন। এ কেমন আনাড়ি সব লোকজন!
মিল্লাত তথা কওমের নেতাদেরকে মনে রাখতে হবে, ওয়াকফ নিয়ে এভাবে একের পর এক হঠকারিতা ও অদূরদর্শিতা মুসলিম পার্সোনাল ‘ল বোর্ডকে হাস্যকর বানাচ্ছে। একইসঙ্গে সমগ্র মুসলিম সমাজ ও সম্প্রদায়কে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য বা হাসির খোরাক বানানো হচ্ছে। ‘ল বোর্ড-এর নেতা বা কর্মকর্তাদের জেনে রাখা উচিত, তাদের একটা ঘোষণায় দেশজুড়ে মুসলমানরা কতখানি মানসিক প্রস্তুতি নেন। আর হঠাৎ করে সেই জায়গায় ছন্দপতন ঘটলে সরলমনা মুসলমানরা মানসিকভাবে খুবই ব্যথা ও আঘাত পায়। তাই হুটপাট সিদ্ধান্ত ঘোষণা না করে, আগে-পিছে সবকিছু বিষয় খতিয়ে দেখে, সবদিক বিবেচনায় রেখে উপযুক্ত ফোরামে আলোচনার পর পাকাপাকি ভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং তারপর তা জনসমক্ষে ঘোষণা করা উচিত। একই ভুল বারবার হবে কেন? এই ভুল থেকে শিক্ষা না নিলে পার্সোনাল ‘ল বোর্ড সম্পর্কে মুসলিম সমাজের আস্থা, বিশ্বাস দিনে দিনে একেবারে তলানিতে পৌঁছবে। এবং একইসঙ্গে সহ-নাগরিক অমুসলিমদের কাছে মুসলিমরা সম্প্রদায়গত ভাবে হেয় প্রতিপন্ন হচ্ছে, হবে। তাই মুসলিম পার্সোনাল ‘ল বোর্ডকে আরো সাবধান, সতর্ক হয়ে ভাবনা-চিন্তা করতে হবে এবং সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এক-পা এগিয়ে তিন-পা পিছলে সংস্থার প্রতি আস্থা ও জনসমর্থন কমবে এবং সর্বোপরি বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে বড়সড় প্রশ্ন চিহ্ন দেখা দেবে।








