নটে গাছটি মুড়োল
ছেলেবেলায় প্রতিটি গল্পের শেষে এই কথাগুলি ছন্দের সুরে শুনতে খুব ভাল লাগত, মজাও লাগত খুব। আমাদের হারিয়ে যাওয়া ঠাম্মা-দিদাদের ছায়া খুঁজে পাই গল্পদিদির মধ্যে, চলো আজ আমরা ইচ্ছা ডানায় ভর করে তাঁর কাছে ফিরে যাই, দেখি তিনি ঝুলিতে কোন গল্প নিয়ে এসেছেন আমাদের জন্য।
রূপকথা মানেই তো রূপক আকারে বাস্তব অবস্থার ব্যাখ্যা করা। কোন জটিল বিষয়কে শিশুদের সহজ করে বোঝানোর জন্যই তাদেরকে নানা রূপকথার গল্প শোনানো হয়। প্রতিটি রূপকথাতেই (ঠাকুরমার ঝুলি) একটি মেসেজ থাকে, যা শিশুদেরকে বর্তমান সমাজ অবস্থা বা সমাজব্যবস্থাকে তাদের মতো করে বিশ্লেষণ করার শিক্ষা দেয়। আর তাই শিশুরা যখন সেই মেসেজগুলোর (সদা সত্য কথা বলিবে, না বলিয়া কাহারো জিনিসে হাত দিবে না ইত্যাদি) সাথে বর্তমানের মিল খুঁজে না পেয়ে হাজারটা প্রশ্ন করে সঠিকটা জানতে চায়। আমাদের উচিৎ, তাদের প্রশ্নে বিরক্ত না হয়ে সত্যটা অকপটে স্বীকার বা প্রকাশ করা। আর বাচ্চাদের রূপকথা শোনানোর মূল দুটি উদ্দেশের একটি হচ্ছে, গল্পের ছলে বর্তমান জীবন যাত্রার নীতি কথা বা মূল্যবোধ সম্পর্কে ধারণা দেওয়া এবং অন্যটি হচ্ছে তাদের কল্পনার জগতকে বিকশিত করা।
রূপকথার পাখি বা পরির মতো ডানা মেলে ওড়ার স্বপ্নজালে আটকে পড়েই তো আজকের চন্দ্র অভিযান, নয়কি? আপনি কি শিশুদেরকে, কে আমাদের রাষ্ট্র প্রধান, কে আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, কী তাদের ভূমিকা — এসব কপচাবেন? নাকি তার “মায়ের কাছে যাব” বলে কান্না থামানোর জন্য, “এক যে ছিল আজব দেশ, সেখানে প্রতি ৫ বছর অন্তর রাজা বদল হয়,………… সেনাপতিরা বারংবার যুদ্ধে (দায়িত্বে) পরাজিত হলেও নির্লজ্জের মতো স্বপদে টিকে থাকেন, …………অসংখ্য দৈত্য দানবের তান্ডবে অতিষ্ঠ হয়ে তোমার মা-বাবা আজ চাঁদ মামার দেশে পাড়ি জমিয়েছে” — এমনটি বলে ছেলে ভোলানোর চেষ্টা করবেন?
“হরতাল বা ধর্মঘট কেন ডাকা হয়” — শিশুর এ প্রশ্নে আপনি নিশ্চয় রাজনৈতিক জটিল সমীকরণ বিশ্লেষণে বৃথা চেষ্টা না করে, কল্প-কথার ছলে শিশুটির নাছোড়বান্দা হাজারটা প্রশ্ন থেকে রেহাই পাবার পথ খুঁজবেন! আরেকটি কথা, আজকের দিনের ইট-পাথরের চার দেয়ালে আটকে পড়া শিশুদের চিন্তা-চেতনাকে ‘চাঁদের বুড়ি চড়কা কাটে’ — এই রূপকথার মাধ্যমেই ঘরের জানালা দিয়ে শিশুর কল্পনার জগতটাকে নিয়ে যেতে পারেন সুদূর মহাশূন্যে।
সুতরাং, শিশুদেরকে রূপকথা শোনানো ভাল বিষয় হতেও পারে, আবার নাও হতে পারে। কোমলমতি শিশুদেরকে শিক্ষাদানের এমন সঠিক মাধ্যমকে এড়িয়ে যাবার কোন সুযোগ আছে বলে অন্তত আমি মনে করি না। শিশুর বয়স বৃদ্ধির কথা কিংবা বাস্তব (বর্তমান) অবাস্তব রূপকথার সংঘাত-সংঘর্ষ নিয়ে যে দুর্ভাবনার কথা বলা হচ্ছে, তার পরিপ্রেক্ষিতে বলতে পারি, শিশুটি যখন এমনই একটা বয়সকে অতিক্রম করবে, তখন সে নিজেই উপলব্ধি করবে ওটা ছিল রূপকথা, কিন্তু একই সাথে সে বুঝতে সক্ষম বাস্তব-অবাস্তব এর যোগসূত্র বা তফাৎটা কোথায়। অতএব আমার কথাটি ফুরোল, নটে গাছটি মুড়োল।
অক্টোবর ৪, ২০২৩, ১৬:৪৮








