ইসলামে প্রতিবেশীর হক এক নীরব সামাজিক বিপ্লব
মোহাম্মদ হাদীউজ্জামান
নতুন পয়গাম: মানুষ যখন বাড়ি নির্মাণ করে, দেয়াল গাঁথে নিজের চারপাশে, তখন সে জানে না, দেয়ালের ওপাশেও তার জন্য কিছু দায়িত্ব রেখে দিয়েছেন তার রব, বিশ্বজগতের পালনকর্তা। ইসলাম সেই দেয়ালের ওপাশে তাকাতে শিখিয়েছে। সেখানে আছে প্রতিবেশী, আর সেই প্রতিবেশীর হক শুধু মানবতার নয়, ঈমানেরও শর্ত।
দেয়ালের ওপাশে ঈমান:
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, সে মুমিন নয়, যে নিজে পেট ভরে খায়, অথচ তার প্রতিবেশী ক্ষুধার্ত থাকে। (সহীহ বুখারী, মুসলিম)। এ এক আশ্চর্য ঘোষণা। ইসলাম ঈমানকে এমন এক সামাজিক দায়িত্বের সঙ্গে বেঁধেছে, যা কেবল অন্তরের নয়, দরজার ওপাশেরও পরীক্ষা। আজকের মানুষ ঈমান খোঁজে নামাযে, দাড়িতে, টুপিতে, সিজদাহর গভীরে! অথচ ঈমানের আরেকটি ছায়া দাঁড়িয়ে থাকে পাশের দরজার নীরবতায়।
প্রতিবেশীর হক মানে দেয়ালের পরিধি নয়, হৃদয়ের বিস্তার:
আমরা ভাবি, প্রতিবেশী মানে পাশের বাড়ির মানুষ। কিন্তু ইসলাম বলে, প্রতিবেশী মানে সেই মানুষ, যে তোমার আওয়াজ শুনতে পায়, তোমার কষ্টের ছায়া দেখে, তোমার ধোঁয়া তার জানালায় পৌঁছায়।
প্রাচীন আরবে একটি উক্তি ছিল: চল্লিশ ঘর দূর পর্যন্ত প্রতিবেশী। রাসূলুল্লাহ (সা.) সেই ধারণাকে হৃদয়ের পরিধিতে প্রসারিত করেছেন। তিনি একবার বলেছিলেন: জিবরাইল আমার কাছে বারবার এসে প্রতিবেশীর অধিকার সম্পর্কে এত বললেন যে আমি ভাবলাম, হয়ত তিনি তাকে (প্রতিবেশীকে) উত্তরাধিকারী করে দেবেন। (সহীহ বুখারী)। অর্থাৎ, ইসলামে প্রতিবেশী কেবল সামাজিক বন্ধন নয়, আত্মীয়তার মতোই পবিত্র এক সম্পর্ক।
প্রতিবেশী: আল্লাহর দেওয়া মানব পরীক্ষার আয়না:
প্রতিবেশীর সঙ্গে কেমন আচরণ করি, তা প্রকাশ করে আমাদের আধ্যাত্মিক মানচিত্র। কারণ, ইসলাম শেখায়: “তোমার দোয়া তখনই ঊর্ধ্বে ওঠে, যখন পাশের দরজা থেকে অভিশাপ ওঠে না।” অর্থাৎ, তোমার স্বলাত (নামায), সিয়াম (রোযা), সাদকা (দান-খয়রাত) ইত্যাদি তখনই পূর্ণাঙ্গ হয়, যখন তোমার প্রতিবেশী তোমার কারণে নিরাপদ অনুভব করে।
প্রতিবেশী যদি ভিন্ন ধর্মেরও হয়, ইসলাম তবুও তাকে নিরাপত্তার অধিকার দিয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সা.) নিজে এক ইহুদি প্রতিবেশীর আমন্ত্রণ গ্রহণ করেছেন, এমনকি তার অসুস্থতায় খোঁজ নিয়েছেন। ইসলামের সমাজতত্ত্ব এখানেও অভূতপূর্ব। এটি সীমান্তের ধর্ম নয়, এটি সেতুর ধর্ম।
প্রতিবেশীর হক, এক নীরব সামাজিক বিপ্লব:
ভাবা দরকার, যদি প্রত্যেক মুসলমান তার আশপাশের দশজন প্রতিবেশীর হক আদায় করে, তবে পৃথিবী থেকে এক ঝটকায় কতটা দুঃখ বিলীন হয়ে যাবে ! ইসলাম সমাজ বদলায় আইন দিয়ে নয়, হৃদয় দিয়ে। আর প্রতিবেশীর হক বা অধিকার আদায় করার মানে সেই বিপ্লব, যা শুরু হয় নিজের দরজা থেকেই।
আমার প্রতিবেশী হয়ত নাস্তিক, হয়ত বিরোধী মতের, হয়ত দরিদ্র, হয়ত-বা ধনী। কিন্তু ইসলাম আমাকে বলে: আমি তাকে যেমনই দেখি না কেন, আমার ওপরে তার হক নির্দিষ্ট আছে। আছে কিছু দায়িত্ব-কর্তব্য। এই জায়গায় ইসলাম সকল মতভেদের ওপর স্থাপন করেছে এক অদৃশ্য দড়ি, যার নাম দয়া ও ন্যায়।
প্রতিবেশী কষ্ট পাওয়া মানে ঈমান কেঁপে ওঠা:
আজকের শহুরে জীবনে আমরা ফ্ল্যাটের নাম চিনি, কিন্তু পাশে থাকা মানুষটির নাম জানি না। আমরা গেটে সিকিউরিটি কোড বসিয়েছি, কিন্তু হৃদয়ে বসিয়েছি অজ্ঞতা। ইসলাম চায় না এমন সমাজ, যেখানে মানুষ নিজের ঘর জানে, কিন্তু ভুলে যায় নিজের চারপাশ। রাসূলুল্লাহ (সা.) একদিন বলেছিলেন, যে তার প্রতিবেশীকে কষ্ট দেয়, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না। (সহীহ মুসলিম)। এই হাদীস কেবল ভয় দেখানোর নয়, এটি সামাজিক চেতনার ঘোষণাপত্র। প্রতিবেশীর অশান্তি মানে সমাজের ব্যর্থতা, আর সমাজের ব্যর্থতা মানে ঈমানের পতন।
প্রতিবেশীর হক আদায় মানে ঈমানের স্থায়ী গন্ধ:
ইসলাম শুধু করুণা শেখায় না, সেটি প্রতিষ্ঠা করতেও বলে। যদি কোন মুসলিম প্রতিবেশীর অসুখে বা বিপদ-আপদে তার পাশে দাঁড়ান, তার সন্তানকে ভালবাসেন, তার অভাব পূরণে দিয়ে থাকেন কোনও নীরব সহায়তা, তবে তিনি কেবল মানবতার দাবি পূরণই করছেন না; বরং ছড়িয়ে দিচ্ছেন ঈমানী ফুলের সুবাস।
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আল্লাহর কাছে সে-ই বান্দাই প্রিয়, যে তাঁর বান্দাদের মধ্যে অন্যদের জন্য সবচেয়ে উপকারী। (আল-মুজামুল আওসাত)। আমি যতই স্বলাত আদায় করি না কেন, যদি পাশের বাড়িতে কেউ ক্ষুধায় কাঁদে, তবে আমার সিজদাহ এখনও অসম্পূর্ণ।
প্রতিবেশীর হক; মানবতার পরিপূর্ণ চেহারা:
ইসলাম প্রতিবেশীর হককে এক ধরনের আধ্যাত্মিক-সামাজিক নেটওয়ার্ক হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছে, যেখানে প্রতিটি দরজা হল পরস্পরের জান্নাতের পথের সিঁড়ি। যে ব্যক্তি প্রতিবেশীর সঙ্গে ন্যায় বা আদল ইনসাফ করেন, তিনি শুধু ভালো মানুষ নন; বরং আল্লাহর সামনে জীবন্ত ঈমানের প্রমাণপত্র। এমন সমাজই ইসলাম গড়তে চায়, যেখানে সকাল হলে দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গে মানুষ যেন বলে, আমার সুন্দর প্রতিবেশী আছে, তাই পৃথিবী এখনও সুন্দর আমার কাছে।








