প্রাচ্যের মধ্যে নয় বলেই জটিল আবর্তে মধ্যপ্রাচ্য
গাজা-সহ ফিলিস্তিন তথা মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইল পাশ্চাত্য সভ্যতার সাহায্য ও সহযোগিতায় গত শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় থেকে যে ক্রমাগত ধ্বংসলীলা ও গণহত্যা চালিয়ে যাচ্ছে, তার ওপর দুই ধরনের চিন্তা-ভাবনা ও জ্ঞান-গবেষণা আছে। একটি হল পাশ্চাত্য সভ্যতার সেক্যুলার স্বার্থে মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলো যাতে ঐক্যবদ্ধভাবে প্যান ইসলামিজমে জমতে না পারে।
এটা শুধু ইসরাইলের বিষয় নয়, বিষয়টি তথাকথিত সেক্যুলার বিশ্বের। তাদের স্বার্থ এখানে দারুণভাবে জড়িত। মাছ যেমন জল ছাড়া বাঁচতে পারে না, পশ্চিমারা তেমনি মধ্যপ্রাচ্য ছাড়া বাঁচতে পারে না, পারবে না। তাই ওরা মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফেরানোর ঠিকা নিয়ে বসে আছে। মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোকে যেমন খুশি তেমন সাজাচ্ছে। যেমন খুশি তেমন যুদ্ধ করছে। কেউ বলার নেই।
কোনো দেশকে রাজতান্ত্রিক, কোনো দেশকে সমাজতান্ত্রিক এবং কোনো দেশকে সেনাতান্ত্রিক করা হয়েছে। এ সবের কারিগর বা নাটের গুরু পশ্চিমারাই। পাশ্চাত্য সভ্যতাকে গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এ সভ্যতা হল গির্জা ও রাজার দ্বন্দ্বে জড়িয়ে ধর্ম থেকে দূরে চলে যাওয়া নাসারা ও ইহুদিদের মনগড়া কথিত সম্মিলিত সভ্যতা। এসব আসলে সভ্যতা নয়, বরং অসভ্যতা। এই তথাকথিত সভ্যতা আবার দুই ভাগে বিভক্ত ছিল, ক্যাপিটালিজম (পুঁজিবাদ) ও কমিউনিজম (সমাজতন্ত্র)।
ক্যাপিটালিজমের কেন্দ্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং কমিউনিজমের কেন্দ্র ছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন। দুই মতবাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব, বিবাদ-বিসম্বাদ লেগেই ছিল। কিন্তু অবাক করা কাণ্ড, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যে অনৈক্য সৃষ্টির জন্য পুঁজিবাদের সর্দার বা মাতব্বররা মধ্যপ্রাচ্যে কমিউনিজমের সর্দার সোভিয়েত ইউনিয়নকে সুযোগ করে দিয়েছিল। এ সুযোগ সৃষ্টি করে দেওয়ার কারণে কমিউনিজম অন্তত দুটি দেশের ওপর নিজেদের লাঠি ঘোরাতে পেরেছিল। ইরাক ও লিবিয়া। দেশ দুটি ছিল বলতে গেলে সেনাতান্ত্রিক। পাশ্চাত্য সভ্যতা ভালভাবে উপলব্ধি করেছে, রাজতন্ত্র এবং সামরিকতন্ত্রকে বজায় রাখলে তাদের অনেক বেশি সুবিধা হবে।
একটি দেশের রাজা-বাদশাহ বা সামরিক শাসককে কোন রকমে বোঝাতে পারলেই কেল্লাফতে। গণতন্ত্র থাকলে জনগণ, সংবিধান, আদালত ইত্যাদি অনেকের কাছে দায়বদ্ধতা বা জবাবদিহি করতে হয়। রাজতন্ত্র বা সেনাতন্ত্রে এত হ্যাপা নেই। এই দুই ধরনের দেশের সাথে আলোচনা বা চুক্তি করা খুব সহজ। চুটকিতে সবকিছু হয়ে যায়। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ কখনো থেমে থাকেনি। নানা ছুতা-নাতায় এক মুসলিম দেশের সাথে আরেক মুসলিম দেশের যুদ্ধ প্রায় লেগেই ছিল। কখনো সেখানে স্থায়ী শান্তি আসেনি। ফলে জামাল উদ্দিন আফগানির প্যান ইসলামিজম ষাটের দশকের মধ্যে ঝিমিয়ে পড়ে। দুনিয়ার মুসলিম এক হও… আরো কিছুদিন পাক-ভারত-বাংলাদেশ উপমহাদেশে উচ্চকিত থাকলেও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয় এই স্লোগানের কোনো অস্তিত্ব ছিল না। দেশভেদে তারা তাদের মতো যুদ্ধ ও শান্তি বজায় রেখে কোনো না কোনোভাবে নিজেদের অস্তিত্ব বজায় রেখে চলছিল। যেটা ইসলামের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল না।
যদিও মুসলিম দেশগুলো তাদের বন্ধু সেক্যুলার রাষ্ট্রের কর্ণধারদের উপদেশ ও পরামর্শে বহু আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ইসলামিক বা মুসলিম সংগঠনের অস্তিত্ব সবসময় বজায় ছিল। কিন্তু কার্যত কোনো সংগঠনেই ব্যাপক অর্থে কাজ করার সুযোগ সৃষ্টি করতে পারেনি। সৌদি আরব, কুয়েত ও কাতার মসজিদ, মাদ্রাসা ও এতিমখানা নির্মাণের জন্য, বাড়িঘর তৈরির জন্য এবং শ্রমিক-সহ নিম্নশ্রেণির মানুষের কর্মসংস্থানের জন্য বেশ কিছু কাজ করেছে। ইসলামের শ্রমনীতি মেনে একাজ হয়নি। এটা পারস্পরিক ব্যবসা-বাণিজ্যের স্বার্থে হয়েছে। এই মুসলিম দেশগুলো শুধু মুসলিমদের কর্মসংস্থান করে, এমনটা নয়। মুসলিম উম্মাহর সদস্য হওয়া আর মুসলিম দেশের জনগণকে সাহায্য-সহযোগিতা করা এক বিষয় নয়। দুটিকে এক করে দেখা ঠিক হবে না।
পাশ্চাত্যের বিভিন্ন দেশের সাথে মুসলিম দেশগুলোর চুক্তি আছে। তারপর এক এক করে প্রায় শেষ হয়ে গেল আফগানিস্তান, ইরাক, লিবিয়া, সিরিয়া, লেবানন, ইয়েমেন ও ফিলিস্তিন-সহ কত দেশ! কিন্তু ইসরাইলের তেমন কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। অথচ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে গৃহযুদ্ধ লাগানোর সকল অপকর্ম চালিয়ে এসেছে পশ্চিমারা। নিজদের অস্ত্রের গোডাউন খালি করার জন্য এবং নতুন নতুন অস্ত্র তৈরি ও সরবরাহের জন্য যুদ্ধ ও গৃহযুদ্ধ লাগিয়ে রেখেছে তারা। তাদের প্রয়োজনে মুসলিম দেশগুলোর সরকার পরিবর্তন বা উৎখাত করতে তারা যত রকম নষ্টামি করেছে। প্রকাশ্যে যা করছে, তা হয়ত বিশ্ববাসী দেখছে। কিন্তু গোপনে যা করছে, তা সাধারণ মানুষ কিছুই টের পাচ্ছে না। যখন জানতে পারা যাচ্ছে, তখন সবকিছু শেষ। এভাবে তারা মিশর, সুদান, তিউনিশিয়া, আলজেরিয়া ও পাকিস্তানকে ধ্বংস করেছে। ইরানকে ধ্বংস করার জন্য তারা প্রকাশ্য ও গোপনে যা করার, তা সবই করেছে এবং এখনও করছে।
এই পরিস্থিতিকে হান্টিংটন বলেছেন, ‘ক্রাইসিস অব সিভিলাইজেশন’। কিন্তু আমরা তো কোনো তথাকথিত ক্রাইসিস দেখছি না। আমরা দেখছি ‘ডেমলিশিং অব আদার সিভিলাইজেশন’ হিসেবে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকেই বিশ্বজুড়ে অন্য সভ্যতার এই ধ্বংসলীলা কার্যকর রয়েছে। যদি তাই না হবে, তাহলে সেক্যুলার সভ্যতা সবই মরীচিকা। প্রতিপক্ষ তো তৈরি করতে হবে। সেজন্যই দেশে দেশে তৈরি করা হচ্ছে ড্যামি প্রতিপক্ষ। এটা হল অতি সংক্ষেপে গত প্রায় ১০০ বছরের খতিয়ান।
মুসলিম দেশগুলো একের পর এক ধ্বংস হচ্ছে পশ্চিমা ষড়যন্ত্রের পাশাপাশি নিজেদের মুনাফিকির কারণে। তারা আল্লাহর সাথে মুনাফিকি করছে। তারা দুনিয়া পরস্তি হয়ে গেছে। গদির জন্য তারা শত্রুর সাথেও হাত মেলাচ্ছে। তাদের জন্যই মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোতে লাখা লাখো বনি আদম শাহাদাত বরণ করছে। কিন্তু তাদের কোনো চৈতন্য নেই, আফসোস নেই, কোনো পেরেশানি নেই। তারা নিজেরা কী করে আরো দীর্ঘকাল ক্ষমতায় টিকে থাকবে, সেই চিন্তায় তারা অস্থির!
পশ্চিমারা চোরকে বলছে চুরি কর, আর গৃহস্থকে বলছে সজাগ থাক। এখন গাজাকে পুরোপুরি কব্জা করে নেওয়াই তাদের লক্ষ্য। এটা হলে তারা ক্রমে ফিলিস্তিন, তারপর প্রতিবেশি মুসলিম দেশগুলোকেও ধীরে ধীরে গ্রাস করে নেবে। মহান আল্লাহর কঠিনতম শাস্তি বা আযাব গজব থেকে বাঁচতে হলে মুসলিম দেশগুলোকে তথাকথিত সেক্যুলার পশ্চিমা সভ্যতার ছোঁয়া থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। তাওবাহ করে তাদের নিজস্ব জীবন ব্যবস্থা, সংস্কৃতি ও ইসলামী সভ্যতার দিকে ফিরে আসতে হবে। আরব জাতীয়তাবাদ এবং মুসলিম জাতীয়তাবাদকে ভুলে যেতে হবে। আল্লাহর জমিনে আল্লাহর সার্বভৌমত্বকে প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই-সংগ্রাম করতে হবে। তবেই যদি মহান আল্লাহ মুসলিমদের সহায় রহবে, মুসলিম দুনিয়াকে রক্ষা করেন।








