সুদ, মাদক ও জুয়ার অদৃশ্য জোট: সমাজ ধ্বংসের নীরব চক্রান্ত
এম নাজমুস সাহাদাত: সমাজ যখন ধীরে ধীরে অগ্রগতির পথে হাঁটার চেষ্টা করছে, ঠিক তখনই কিছু অদৃশ্য কিন্তু সুসংগঠিত অপরাধচক্র নীরবে সেই সমাজের ভিত কুরে কুরে খেয়ে ফেলছে। সুদী কারবার, মাদক ব্যবসা, জুয়া–সাট্টা, অনলাইন গেমিং জুয়া, ফাটকা ব্যবসা এই সমস্ত অসামাজিক ও অবৈধ কার্যকলাপ আজ আর বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; বরং এগুলি পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে থাকা এক ভয়ঙ্কর চক্র। এই চক্রের মূল লক্ষ্য একটাই; অবৈধ উপার্জনের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল এবং সমাজকে ধীরে ধীরে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেওয়া। আজ গ্রাম থেকে শহর — সর্বত্র অবৈধ সুদের কারবারিদের দৌরাত্ম্য চোখে পড়ার মতো। প্রথমে ‘সহজ ঋণ’, ‘বিনা কাগজে টাকা’, ‘তাৎক্ষণিক সাহায্য’-এর লোভ দেখিয়ে সাধারণ মানুষকে ফাঁদে ফেলা হয়। এরপর শুরু হয় চড়া সুদের জুলুম। একবার এই জালে পা দিলে বেরোনো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। সুদের উপর সুদ, চক্রবৃদ্ধি হারে সুদ, হুমকি, মানসিক চাপ, সামাজিক অপমান — সব মিলিয়ে একটি পরিবার ধীরে ধীরে সর্বস্বান্ত হয়ে পড়ে। কিন্তু এখানেই শেষ নয়; এই অবৈধ সুদের টাকাই আবার ব্যবহৃত হচ্ছে আরও ভয়ঙ্কর কাজে। মাদক কারবার, জুয়া–সাট্টা, অনলাইন জুয়ার নেটওয়ার্ক, বেআইনি ফাটকা ব্যবসা সব কিছুর পেছনেই রয়েছে কালো টাকার জোগান। মূলত যুব সমাজকে টার্গেট করে এসব সর্বনাশী ও সর্বগ্রাসী নেশার ফাঁদ পাতা হচ্ছে। কেউ মাদকাসক্ত হচ্ছে, কেউ জুয়ার নেশায় সর্বস্ব হারাচ্ছে। কর্মক্ষম যুবকরা পরিণত হচ্ছে অপরাধের হাতিয়ার হিসেবে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই অপরাধচক্র কেবল রাস্তার কোণে বা অন্ধকার গলিতে সীমাবদ্ধ নেই। অবৈধ আয়ের টাকায় তারা প্রশাসনের কিছু অসৎ কর্তা–ব্যক্তিকে প্রভাবিত করছে। ঘুষ, ভেট, তদবিরের মাধ্যমে তারা আইনকে নিজের পক্ষে ঘুরিয়ে নিচ্ছে। কোথাও অভিযানের আগেই খবর পৌঁছে যাচ্ছে, কোথাও মামলা দুর্বল হয়ে যাচ্ছে, কোথাও সাক্ষ্যপ্রমাণ গায়েব হয়ে যাচ্ছে। ফলে অপরাধীরা দিনের পর দিন বুক ফুলিয়ে একই কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। এখানেই থেমে থাকছে না এই চক্র। অবৈধ অর্থের জোরে রাজনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যেও তারা প্রবেশ করছে। দলের অভ্যন্তরীণ পদ কেনা, রাজনৈতিক প্রভাবশালী হওয়ার চেষ্টা, নির্বাচনের সময় প্রার্থী হওয়ার টিকিট কেনা সবই আজ গোপন নয়, প্রকাশ্য গুঞ্জন। যাকে বলে ওপেন সিক্রেট। জন প্রতিনিধি কেনাবেচার অভিযোগও ক্রমশ জোরালো হচ্ছে। ফলে গণতন্ত্রের ভিত দুর্বল হচ্ছে, সাধারণ মানুষের আস্থা ভেঙে পড়ছে। দীর্ঘ আইনি লড়াই চালিয়ে মামলা ঝুলিয়ে রাখা, দামি আইনজীবীর মাধ্যমে বিচার প্রক্রিয়াকে জটিল করে তোলা — এসবই সম্ভব হচ্ছে অবৈধ আয়ের জোরে। ফলে সাধারণ মানুষ ন্যায়বিচার পাওয়ার আশা হারাচ্ছে, আর অপরাধীরা আরও সাহসী হয়ে উঠছে।
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পরিবার এবং সমাজ। একটি পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তি যখন সুদের জালে পড়ে বা মাদক–জুয়ার নেশায় ডুবে যায়, তখন তার প্রভাব পড়ে স্ত্রী, সন্তান, বৃদ্ধ বাবা–মায়ের উপর। ঘরে অভাব, অশান্তি, মানসিক অবসাদ, এমনকি আত্মহননের মতো চরম পরিস্থিতিও তৈরি হচ্ছে। সমাজে বাড়ছে অপরাধপ্রবণতা, নৈতিক অবক্ষয় এবং পারস্পরিক অবিশ্বাস। প্রশ্ন উঠছে —এভাবে কি একটি সুস্থ সমাজ টিকে থাকতে পারে? উত্তর স্পষ্ট—না। তাই এখন আর নীরব থাকার সময় নেই। এই অবৈধ সুদ কারবারি, মাদক ব্যবসায়ী ও জুয়া, লটারি চক্রের বিরুদ্ধে জন সচেতনতা ও গণজাগরণ গড়ে তোলা সময়ের দাবি। প্রথমত, পরিবারকে সচেতন হতে হবে। সহজ ঋণের লোভে না পড়ে আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকতে হবে। দ্বিতীয়ত, সমাজকে একজোট হয়ে এই ধরনের অপরাধের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলতে হবে। কোথাও মাদক বা জুয়ার ঠেক গড়ে উঠলে, তা চুপচাপ মেনে নেওয়া নয়, বরং প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করা নাগরিক দায়িত্ব। প্রশাসনের ভূমিকাও এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কাগজে–কলমে অভিযান নয়, বাস্তব ও ধারাবাহিক পদক্ষেপ প্রয়োজন। জুয়া–সাট্টা ও মাদকের ঠেকগুলিতে নিয়মিত অভিযান চালাতে হবে। অবৈধ সুদ কারবারিদের সম্পত্তির উৎস খতিয়ে দেখে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। শুধু ছোট হাত নয়, এই চক্রের মাথাদের ধরতে হবে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলিকেও আত্মসমালোচনা করতে হবে। অপরাধ ও কালো টাকার সঙ্গে কোনভাবেই আপস করা চলবে না। গণতন্ত্রকে বাঁচাতে হলে, সুষম ও সুসংহত সমাজ গড়তে অপরাধমুক্ত রাজনীতিই একমাত্র পথ।
সবশেষে বলতে হয়, সমাজ যদি আজ ঐক্যবদ্ধ না হয়, তবে আগামী প্রজন্মকে আমরা একটি নেশাগ্রস্ত, অপরাধপ্রবণ, নৈতিকতা ও মূল্যবোধহীন সমাজ উপহার দেব। এই দায় কোনো একক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নয় এটি আমাদের সকলের। তাই অবৈধ সুদ, মাদক ও জুয়ার বিরুদ্ধে এখনই সামাজিক ও আইনি প্রতিরোধ গড়ে তোলা একান্ত প্রয়োজন। নইলে ইতিহাস আমাদের ক্ষমা করবে না।








