জীবনমুখী উজ্জ্বল নক্ষত্র সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ
সোনিয়া তাসনিম
নতুন পয়গাম, ১৩ সেপ্টেম্বর: বেশ মনে পড়ে, উচ্চ মাধ্যমিকের সময় বাংলা প্রথম পত্র বইয়ের পাতায় ‘একটি তুলসি গাছের কাহিনী’ গল্পটা পড়তে বসলে মনের মাঝে কেমন অদ্ভুত এক মায়াবোধ জাগত। নেহাতই সাধাসিধে একটি গাছকে ঘিরে বাক্যের তালে তালে যে আবেগের সঞ্চার হত, তা বলে বোঝানো এসময়ে যারপরনাই অসম্ভব। অবিরাম পড়ে চলার এক অদ্ভুত আবেশে কল্পনায় গল্পের বাক্যগুলো ছুঁয়ে যেন নিজেই অজান্তে হয়ে উঠতাম গল্পটির মাঝে এঁকে নেওয়া কোন চরিত্রের একজন। সোজা সরল ভাষার গাঁটবন্ধনে ঠিক কখন কোন সময়ে যে এটি হৃদয় ভেদ করে যেত, তা বুঝে ওঠা নেহাতই দায়। আর সত্যি বলতে, এটাই লেখক সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর লেখনীর এক অনন্য ও অদম্য শক্তিশালী দক্ষতা। সাহিত্যের মধ্য দিয়ে ধর্মীয় গোঁড়ামিকে কটাক্ষ করা সহ বাংলা সাহিত্যের অস্তিত্বের ধারাকে নতুনত্ব প্রদানে তাই তাঁর নাম অবিস্মরণীয়।
১৯২২ সালের ১৫ আগস্ট জন্ম নেওয়া এই অবিসংবাদিত লেখকের বেড়ে ওঠা স্ফুরণ সেক্যুলার পারিবারিক পরিবেশে। সুফিবাদী, অসাম্প্রদায়িক ও উদার মানবিকতার শিক্ষাই মূলত তাঁর পরবর্তী জীবনে দুর্দান্ত সৃজনের শাখা-প্রশাখা মেলে নেয়। ভাবনার কুঁড়িতে জন্ম নেয় উদার চিন্তা-চেতনার রঙ্গন। শৈশব থেকেই পাঠ্যপুস্তকের বাইরের পড়াশোনার প্রবল আগ্রহ তাঁর ভবিতব্য লেখক হবার ঈঙ্গিত দেয়। ১৯৩৯ সালে কুড়িগ্রাম হাইস্কুল হতে মাধ্যমিকের চৌকাঠ মাড়িয়ে নিতে না নিতেই ঢাকা কলেজের ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়েছিল তাঁর প্রথম গল্প, ‘সীমাহীন এক নিমিষে’। কলম হাতে দুর্দান্ত শুরুটাই মূলত এঁকে নিয়েছিল ভবিষ্যতের লেখক হয়ে ওঠার সোনালি পথ। কেবল কলম হাতে নয়; বরং উদ্যোমী ছিলেন ছাপাখানার কাজেও। তাই তো চল্লিশের দশকের মাঝামাঝি মামা খান বাহাদুর সিরাজুল ইসলামের পৃষ্ঠপোষকতায় কমরেড পাবলিশার্সের ভিত্তি দেন। দৈনিক Statesman-এ সাব এডিটরের হাল ধরেন ৫৪-এর পঞ্জিকার পাতায়। উদ্দেশ্য, সাহিত্যমান সম্মত ইংরেজি লেখনীর সৃষ্টি। ইত্যবসরে কলমের জাদু ছড়িয়ে নেন বুলবুল, সওগাত, মোহাম্মদী, অরণি, পূর্বাশা-সহ আরও নানা সাময়িকী ও পত্রিকায়। তাঁর লেখনীর মন্ত্রে মুগ্ধ হয়ে পূর্বাশার সম্পাদক সঞ্জয় ভট্টাচার্য প্রকাশ করেন, লেখকের প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘নয়নচারা’।
১৯৪৭ পরবর্তীতে Statesman পত্রিকার কাজে যবনিকা টেনে রেডিও পাকিস্তানে ঢাকা কেন্দ্রের সহকারী বার্তা সম্পাদক হিসেবে নতুন যাত্রা শুরু করেন। আর কাজের খণ্ডিত অবসরে এই সময়েই তাঁর উন্নত কলমে জন্ম নেয়, ‘লালসালু’-র মতো অবিস্মরণীয় সাহিত্যকর্ম। ১৯৫১ হতে ১৯৭১ অবধি তাঁর বর্ণিল ক্যারিয়ারে মিশ্র অভিজ্ঞতার আলোকে সাফল্যের দারুণ নকশা আঁকেন এই মেধাবী লেখক। প্যারিসে পাকিস্তানি দূতাবাসের ফার্স্ট সেক্রেটারি হতে ইউনেস্কোর প্রোগ্রাম স্পেশালিষ্টের মতোও গুরুত্বপূর্ণ পদে তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন সুচারুভাবে।
১৯৫২ এর দিল্লি থেকে অস্ট্রেলিয়ার পথে পাড়ি জমানোর কালে জীবনে পরিণয়ের বসন্ত আসে ফরাসি কন্যা অ্যান মেরির হাত ধরে। যার প্রবাহের গতি একসময় বেঁধে নেয় এক চির অটুট বন্ধন। ১৯৫৫ সালে লেখক স্ত্রী মেরির কলমে ফরাসি ভাষায় তাঁর ‘লালসালু’ অনূদিত হয়, যা পরবর্তীতে ইংরেজিতে লেখা হয়, Tree Without Roots শিরোনামে। উত্তাল ও উষ্ণ রাজনৈতিক পরিবেশে কাটানো কৈশোরের প্রভাবে তিনি ছিলেন সমাজতন্ত্রের প্রতি যতটা শ্রদ্ধাশীল, ঠিক ততটাই বিরূপ ছিলেন মার্কিন সম্রাজ্যবাদের ঘোর বিরোধী। যার প্রতিফলন ঘটেছে ১৯৫৮ সালে প্রকাশিত The ugly American এর বিপরীতে তাঁর লেখা The ugly Asian বইয়ের মধ্য দিয়ে।
ওয়ালীউল্লাহ ছিলেন প্রগতিশীল চিন্তার ধারক। তৎকালীন ভারতের রাজনৈতিক পরিস্থিতি হিন্দু মুসলিম দ্বন্দ্বের কারণে রাজনীতির সাথে প্রায় সকলেই সম্পৃক্ত ছিলেন। সচেতন দূরদর্শী দৃষ্টিভঙ্গিতে ওয়ালীউল্লাহ তখনকার মুসলিম সমাজকে ধর্মীয় সম্প্রদায়ের পরিবর্তে পশ্চাদপদ শ্রেণী হিসেবে মূল্যায়ন করতেন। সাম্প্রদায়িকতা ও রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহারকে তিনি সবসময় ঘৃণা করে এসেছেন। অবহেলিত মুসলিমদের অসহায়ত্ব তাঁকে ব্যথিত করত। তাই মুসলিমদের রাজনৈতিক অধিকার আদায়ে তিনি সবসময় থেকেছেন সপ্রতিভ।
লেখনীর মধ্য দিয়ে তিনি সমাজের প্রচলিত কমতিগুলোকে প্রকাশ্যে উন্মোচিত করতেন। ওয়ালীউল্লাহর সাহিত্যে মানব জীবনের আধ্যাত্মিক অযৌক্তিকতার সাথে সামাজিক প্রতিচিত্র অঙ্কিত হয়েছে সফলভাবে, যা কিনা পশ্চিমা ঔপন্যাসিকদের চেতনায় অনুপস্থিত। ওয়ালীউল্লাহর লেখনীতে সমাজ এবং ব্যক্তির মাঝে যে কোন একটি উদ্দীপক নয়; বরং এই দুটি বিষয়ের মিশ্রণ ঘটেছে সুষমভাবে। ধর্মীয় গোঁড়ামির অন্ধকারে নিমজ্জিত সামাজিক জীবনের পাশাপাশি মানুষের জীবন দর্শন, জিজ্ঞাসা, মানবীয় আবেগের গাঁথুনি গেঁথেছেন মজবুতভাবে। বরেণ্য এই লেখক জাতীয় পর্যায়ে নানা সম্মানে ভূষিত হলেও তাঁর সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি আবহমান কাল ধরে সুচিন্তক পাঠকের মননজালে শব্দের জাদুতে অবাধ বিচরণ করে চলার ক্ষুরধার লেখনী দক্ষতা।








