নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর কবিতা আত্মদর্শনের আয়না
পাভেল আখতার
সাধারণত ধরে নেওয়া হয় যে, কবি নিজেকে একটি ‘স্বরচিত গুহায়’ বন্দী করে রাখেন এবং সেখান থেকে বাইরের জগৎটিকে তিনি দেখেন। কবিতা আসলে কবির নিজেকে দেখার একটি দর্পণ, যেখানে ফুটে ওঠা বিপন্নতা, আর্তি, ক্ষোভ ইত্যাদি শব্দের ললিত পোশাকে প্রকাশিত হয়। কবিতার উৎসমুখে লগ্ন হয়ে থাকা এই চেনা ছকটি ভীষণই আত্মকেন্দ্রিক; বৃহত্তর সমাজ কিংবা বহির্বিশ্বের সঙ্গে যার সম্পর্ক শূন্য বা অন্তর্হিত। কবির আত্মকথন বর্ণিত কবিতা পাঠককে যেমন রোমাঞ্চিত বা আন্দোলিত করে না, তেমনই এ-জাতীয় কবিতার সামাজিক মূল্য শূন্য। বিপরীতে কবি যখন নেমে আসেন মাটির পৃথিবীতে, নিজের কথা নয় মানুষের কথা বলতে, তখনই সেই কথাশিল্প — কবিতা যার নাম, মানুষকে চঞ্চল করে তোলে; যে চঞ্চলতায় মিশে থাকে আনন্দ, রোমাঞ্চ, উদ্দীপনা ও প্রেরণার উপাদান! নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী ছিলেন এই গোত্রের কবি। মানুষ ও সমাজের প্রতি গভীর মমত্ববোধ ও দায়বদ্ধতা থাকলেই কেবল নিজের ক্ষুদ্র গণ্ডিটিকে কেউ এভাবে অতিক্রম করে যেতে পারে !

রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন: ”আপন হতে বাহির হয়ে বাইরে দাঁড়া, বুকের মাঝে বিশ্বলোকের পাবি সাড়া।” নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী এই ‘সাড়া’ পেয়েছিলেন। আর পেয়েছিলেন বলেই তাঁর কলম থেকে উৎসারিত কবিতা হয়ে উঠেছিল মানুষ তথা সমাজের দর্পণ, যে দর্পণ শুধু বর্তমানের ছবি দেখায় না, উত্তরণের দিশায় অঙ্কিত সুন্দর ভবিষ্যতের ছবিও নির্মাণ করে, বা করার সাহস ও প্রত্যয় জোগায়। আর এই মহামহিম কাজটি করতে গিয়ে তিনি পাঠককে শব্দের জটিল ও দুর্ভেদ্য অরণ্যে পথ হারিয়ে ফেলতে দিতে চাননি; বরং নিতান্তই সহজ ও আটপৌরে শব্দ নির্বাচনের শৈল্পিক দক্ষতায় তিনি কুয়াশায় ঢাকা পথের রেখাটিকে আরও স্পষ্ট করেছেন, আরও কাছে এনে দিয়েছেন!
সব শিশুরই অন্তরে শিশুর পিতা যে ঘুমিয়ে আছে — কবির সেকথা না হয় সত্যই হ’ল, কিন্তু পিতা হয়ে ওঠা পরিণত সব মানুষের অন্তরমহলেও যে একটি ‘শিশু’র অস্তিত্ব জীবন্ত থাকতে পারে, পারা উচিত, সমস্ত হিসেবী চলাচল, পাঁক ও পাপ উত্তীর্ণ হয়ে, ‘উলঙ্গ রাজা’র সামনে প্রশ্ন করতে সক্ষম — সেই শিশুটির খোঁজই কি আসলে করেননি কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী? মানুষেরা আপন হৃদয়ে সেই ‘শিশুটিকে’ খুঁজে না পেলে পৃথিবী যে সুন্দর হবে না। আসলে তো তিনি আমাদের ভিতরে চাপা পড়ে থাকা পাঁকমুক্ত, স্বচ্ছ ‘শিশুত্ব’-কে খোঁজার ডাক দিয়েছিলেন। অর্থাৎ, সমূহ পংক্তিগুচ্ছেই ‘নিজেকে চেনা’র আহ্বান।
২০১৮ সালের ২৫ ডিসেম্বর ৯৪ বছর বয়সে (জন্ম: ১৯ অক্টোবর, ১৯২৪) একজন মানুষের মৃত্যু অপ্রত্যাশিত না হলেও সেই মানুষটি যদি সক্রিয়ভাবে সৃজনশীল হন, আমাদের মতো বাজার করা, স্নান-খাওয়া-দাওয়া, ঘুমানো ইত্যাদি গড়পড়তা জীবন-পরিক্রমা থেকে বহু যোজন দূরে তাঁর অবস্থান হয়, তাহলে তাঁর মৃত্যু গভীর দুঃখ বয়ে আনে, সৃষ্টি করে শূন্যতার বোধ ! এসব কথা প্রিয় কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী সম্পর্কে বলা হচ্ছে, যিনি ওই বয়সেও কলম তুলে রাখেননি, লিখেছেন নিয়মিত।
”যা গিয়ে ওই উঠোনে তোর দাঁড়া, লাউমাচাটার পাশে, ছোট্ট একটা ফুল দুলছে ফুল দুলছে ফুল, সন্ধ্যার বাতাসে” — এভাবে ‘নিজস্ব উঠোন’ চিনিয়ে ছিলেন তিনি, যা মহিমান্বিত হয়ে ওঠার জন্য ‘সন্ধ্যার বাতাসে’ দোলায়িত একটা ‘ছোট্ট ফুল’-ই যথেষ্ট ! কিংবা, সেই শিশুটিকে ধরে আনতে বলেছিলেন তিনি, যে এসে নির্ভয়ে বলবে: ”রাজা, তোর কাপড় কোথায়?” প্রশ্ন হল, কবিতায় তিনি একটি শিশুকে খুঁজেছিলেন কেন? কারণ, এমন প্রশ্ন বহু পাঁক ও পাপের সঙ্গে নিত্য বসত করা ‘পরিণত ও জীর্ণ মন’ করতে পারে না; যা পারে ভোরের আলোর মতো পবিত্র একটি শিশু! সব শিশুরই অন্তরে শিশুর পিতা যে ঘুমিয়ে আছে — কবির সেকথা না হয় সত্যই হ’ল, কিন্তু পিতা হয়ে ওঠা পরিণত সব মানুষের অন্তরমহলেও যে একটি ‘শিশু’র অস্তিত্ব জীবন্ত থাকতে পারে, পারা উচিত, সমস্ত হিসেবী চলাচল, পাঁক ও পাপ উত্তীর্ণ হয়ে, ‘উলঙ্গ রাজা’র সামনে প্রশ্ন করতে সক্ষম — সেই শিশুটির খোঁজই কি আসলে করেননি কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী? মানুষেরা আপন হৃদয়ে সেই ‘শিশুটিকে’ খুঁজে না পেলে পৃথিবী যে সুন্দর হবে না। আসলে তো তিনি আমাদের ভিতরে চাপা পড়ে থাকা পাঁকমুক্ত, স্বচ্ছ ‘শিশুত্ব’-কে খোঁজার ডাক দিয়েছিলেন। অর্থাৎ, সমূহ পংক্তিগুচ্ছেই ‘নিজেকে চেনা’র আহ্বান।

নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী তাঁর ‘খোকার ইচ্ছে’ কবিতায় আজকের বিপন্ন শৈশব ও কৈশোরের করুণ ছবিটি নিপুণভাবে এঁকেছেন, যেখানে ‘বড়দের’ সব ইচ্ছে পূরণ করতে গিয়ে শিশু বা কিশোরটি পরিশেষে এই বলে হাহাকার করছে: ”একেকজনের একেক ইচ্ছে সবাই দিচ্ছে তাড়া, তার ফলে ভাই আমার নিজের ইচ্ছে গেছে মারা!” অতি সকালে ঘুমচোখে উঠে ইস্কুলে যাওয়া, টিউশন, গান-আবৃত্তি-ছবি আঁকা-নাচ শেখা ইত্যাদি। খেলাধুলা নেই, বৃষ্টিতে ভেজার মজা নেই, দুষ্টুমি ও দুরন্তপনার ছাড়পত্র নেই ইত্যাদি, মোটকথা মুক্ত আনন্দধারায় ভেসে যাওয়া নেই। কেরিয়ার গড়ার ভূত মাথায় ঢুকিয়ে রূপে রসে গন্ধে বর্ণময় জগতের ব্যাপ্ত আনন্দযজ্ঞ থেকে দূরে সরিয়ে অভিশপ্ত ও নিরানন্দময় জীবনের জাঁতাকলে শিশুদের ক্রমাগত পিষ্ট করে চলা ‘স্বার্থপর বড়দের’ অপরাধ ভাবীকাল কি কখনও ক্ষমা করবে?








