দেশে দেশে গণঅভ্যুত্থান ও তার পরিণতি
মজিবুর রহমান
বিশ্বের মানচিত্রে ভারতের অবস্থান দক্ষিণ এশিয়ায়। এই অঞ্চলের অন্যান্য দেশগুলো হল ভুটান, মালদ্বীপ, আফগানিস্তান, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ ও নেপাল। রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সহিংসতা এই দেশগুলোর উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য। ২০২২ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে শেষোক্ত তিনটি দেশে গণঅভ্যুত্থানে সরকার পতন ঘটেছে এবং সরকারের কেষ্ট-বিষ্টুরা দেশত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন।
সিংহল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে স্বাধীন হয় ১৯৪৮ সালে এবং ১৯৭২ সাল থেকে শ্রীলঙ্কা নামে পরিচিত হয়। ২ কোটি ২০ লক্ষ জনসংখ্যার দেশ শ্রীলঙ্কার দুটি প্রধান ভাষিক জনগোষ্ঠী হল সিংহলি ও তামিল। এই দুই ভাষার মানুষ দেশটির জনসংখ্যার ৭০ ও ২৫ শতাংশ। রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় সিংহলীদের একাধিপত্য ও তামিলদের বঞ্চনা শ্রীলঙ্কার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে অশান্তির অন্যতম প্রধান উৎস। তামিলদের অধিকার দাবি-দাওয়া পৃথক রাষ্ট্র গঠনের আন্দোলনে পরিণত হয়। ১৯৮৩ থেকে ২০০৯ পর্যন্ত রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধে লক্ষাধিক মানুষের প্রাণ যায়। ২০১৯ সালে সংসদ নির্বাচনে বিপুল গরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করে এসএলপিপি। কিন্তু শাসকদল ও সরকারে পরিবারতন্ত্র ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট। প্রেসিডেন্ট গোটাবায়া রাজাপাকসে ও প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দা রাজাপাকসে রক্তের সম্পর্কে ভাই। এছাড়াও তাঁদের পরিবারের আরও অন্তত পাঁচ জন মন্ত্রী ছিলেন। রাজাপাকসেদের পারিবারিক শাসনে শ্রীলঙ্কার সার্বিক অবস্থা দ্রুত খারাপ হতে থাকে। অর্থনীতি ভেঙে পড়ে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি, ওষুধ ও খাদ্য সামগ্রীর তীব্র অভাব দেখা দেয়। সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতা হ্রাস পায়। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। সব মিলিয়ে শ্রীলঙ্কার জনজীবন বিপন্ন হয়ে পড়ে। এমতাবস্থায় দেশের ছাত্র-যুবরা রাজাপাকসে পরিবারকে উৎখাত করতে ঐক্যবদ্ধ হয়। সরকার জরুরি অবস্থা ঘোষণা, কারফিউ জারি ও সোশ্যাল মিডিয়া বন্ধ করে দিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার সকল চেষ্টা ব্যর্থ হয়। ২০২২-এর মার্চে শুরু হওয়া গণআন্দোলন জুলাইয়ে চরম পরিণতি লাভ করে। বিক্ষুব্ধ জনতা রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর কর্যালয় দখল করে নেয়। প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করতে ও রাষ্ট্রপতি দেশ ছাড়তে বাধ্য হন। কিন্তু তাঁদের ঘনিষ্ঠ বা পক্ষীয় লোকেরাই আরও দু-বছর সরকার পরিচালনা করেন। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে নির্বাচনের মাধ্যমে রাজাপাকসে পরিবার তথা এসএলপিপি-র প্রভাবমুক্ত জেভিপি সরকার গঠিত হয়। বামপন্থী রাষ্ট্রপতি অনুঢ়া কুমারা দিশানায়েকে ও প্রধানমন্ত্রী হরিণী অমরাসুরিয়ার নেতৃত্বে শ্রীলঙ্কার পরিস্থিতি এখন কিছুটা ভাল।
১৯৪৭ সালে ভারত ভাগ তথা বঙ্গ বিভাজনের সময় বাংলার মাটি রক্ত-রঞ্জিত হয়। পাকিস্তান গঠনের অব্যবহিত পরেই বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে পূর্ব পাকিস্তান তথা পূর্ববঙ্গে ব্যাপক আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৫২-এর ২১শে ফেব্রুয়ারি ইতিহাস রচিত হয়। বাংলা ভাষার জন্য প্রাণ বিসর্জনের পথ ধরেই বাঙালিদের জন্য পৃথক রাষ্ট্র গঠনের আন্দোলনে ১৯৭১ সালের মার্চ থেকে পূর্ব পাকিস্তান তোলপাড় হতে থাকে। ৩০ লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম হয়। শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৫ সালের আগস্টে সেনাকর্তাদের হাতে সপরিবারে খুন হন। সামরিক শাসক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সামরিক অভ্যুত্থানেরই বলি হন ১৯৮১ সালের ৩০ মে। ১৯৮৩-এর ডিসেম্বর থেকে ১৯৯০-এর ডিসেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি ছিলেন অপর সামরিক শাসক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ। তারপর থেকে প্রধানমন্ত্রী হন জিয়াউর রহমানের স্ত্রী বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া অথবা মুজিবুর রহমানের কন্যা আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনা।
বিএনপি ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত নির্বাচন বয়কট করে। আওয়ামী লীগ ফাঁকা মাঠে গোল দেয়। ২০২৫ সালের ৫ জুন বাংলাদেশের হাইকোর্ট সরকারি চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সদস্যদের জন্য ৩০ শতাংশ সংরক্ষণের পক্ষে রায় দেয়। ছাত্র সমাজের একাংশ এই রায়ের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করে। হাসিনা সরকার হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে আপিল করে। সুপ্রিম কোর্ট ১০ জুলাই হাইকোর্টের রায়ে স্থগিতাদেশ দেয় এবং ৭ই আগস্ট পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করে। ছাত্র আন্দোলনে বিরক্ত হয়ে ১৪ই জুলাই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, “মুক্তিযোদ্ধাদের নাতি-নাতনিরা সংরক্ষণ পাবে না তো কি রাজাকারদের বংশধররা পাবে?” তাঁর এই মন্তব্য অগ্নিতে ঘৃতাহুতি দেয়। ১৬ জুলাই রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও কোটা সংস্কার আন্দোলনের সমন্বয়ক আবু সাঈদ পুলিশের গুলিতে নিহত হন। সেই মৃত্যু কোটা সংস্কার আন্দোলনকে গণ অভ্যুত্থানের পথে পরিচালিত করে। ২১ জুলাই সুপ্রিম কোর্ট মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের জন্য ৩০ শতাংশের বদলে ৫ শতাংশ সংরক্ষণ নির্ধারণ করে। ২৩ জুলাই সরকার বিজ্ঞপ্তি জারি করে।
সংরক্ষণ হ্রাস করা হলেও আন্দোলন স্তিমিত হয়নি। কারফিউ জারি করে, সেনা নামিয়ে আন্দোলন দমনের চেষ্টা ব্যর্থ হয়। বিধ্বংসী আন্দোলনে কমবেশি দুশো ছাত্র, সাধারণ মানুষ-সহ কয়েকজন পুলিশ নিহত হন। প্রচুর সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, স্থাপনা ও যানবাহনের ক্ষতিসাধন হয়। কয়েদিরা জেল থেকে পালিয়ে যায়। ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে বাংলাদেশ ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। শান্তিতে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে প্রধান উপদেষ্টা করে ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। সেই সরকার সংবিধান-সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কার সাধনের কাজ করছে। ১৭.৫ কোটি জনসংখ্যার বাংলাদেশে ৯০ শতাংশ মুসলমান আর ৯৮ শতাংশ বাংলাভাষী।
নেপাল রাষ্ট্র গঠিত হয় ১৭৬০-এর দশকে। শাসনব্যবস্থা ছিল রাজতান্ত্রিক। ১৯৯০ সাল থেকে রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে জোরদার সহিংস আন্দোলন শুরু হয়। ২০০১ সালের ১ জুন কাঠমাণ্ডুর নারায়ণহিতি রাজপ্রাসাদে ক্রাউন প্রিন্স দীপেন্দ্র গুলি চালিয়ে রাজ পরিবারের নয় সদস্যকে হত্যার পাশাপাশি নিজেও মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে আত্মহত্যা করেন। এর পর নেপালে রাজতন্ত্রের পতন ঘটে। ২০০৮ সালে নেপালের সংসদ রাজতন্ত্র বিলুপ্ত করে এবং দেশে যুক্তরাষ্ট্রীয় গণপ্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। দেশের সংবিধান ও শাসনব্যবস্থার উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের পথে নেপালকে ধারাবাহিক রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। ২০০৮ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে নয়জন ব্যক্তির নেতৃত্বে ১৪ বার সরকার গঠিত হয়েছে। ২০২৪ সালের জুলাই থেকে কে.পি শর্মা ওলি তৃতীয় বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হন। সরকারের সঙ্গে নিবন্ধন করতে ব্যর্থ হওয়ায় ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ফেসবুক, ইউটিউব, এক্স-সহ ২৬টি সোশ্যাল মিডিয়া নিষিদ্ধ করে। নেপালের তরুণ প্রজন্ম বা জেন-জি এই নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে আন্দোলনে নামে। ৮ সেপ্টেম্বর এক সমাবেশে পুলিশের গুলিতে বেশ কয়েকজন বিক্ষোভকারীর মৃত্যু হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। ৯ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী কে.পি শর্মা ওলি পদত্যাগ ও দেশত্যাগ করেন। প্রধানমন্ত্রী-সহ অন্যান্য মন্ত্রীদের বাসভবন, সংসদ ভবন বিক্ষোভকারীদের দখলে চলে যায়। ১০ সেপ্টেম্বর দেশের প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি সুশীলা কারকি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। তিন কোটি জনসংখ্যার দেশ নেপালে ৮১ শতাংশ হিন্দু। বাকিদের বেশিরভাগই বৌদ্ধ। অর্থনীতি মূলত পর্যটন শিল্পের উপর নির্ভরশীল। নেপালের অধিকাংশ যুব শক্তি ভারত-সহ অন্যান্য দেশে শ্রমিকের কাজ করে দিন গুজরান করেন।
জনসংখ্যা, ভাষিক ও ধর্মীয় সম্প্রদায়ের সংখ্যার নিরিখে ভারতের অবস্থা পূর্বোক্ত দেশগুলোর থেকে অনেকটাই আলাদা। ভারতের জনজীবনে যে বৈচিত্র্য রয়েছে, তা উপরোক্ত দেশগুলোতে নেই। ভারতীয় সমাজ অনেকগুলো স্তর নিয়ে গঠিত। অর্থনৈতিক কাঠামোও বহুস্তরীয়। রাজনৈতিক দলের সংখ্যা অজস্র। কোনো বিশেষ আর্থ-সামাজিক অথবা রাজনৈতিক ঘটনা দেশের সব মানুষকে সমানভাবে আন্দোলিত করে না। এদেশে ‘যত মত তত পথ’ দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে জীবন ও জগতকে দেখা হয়। সরকার কিংবা প্রশাসনিক পদক্ষেপের পক্ষে-বিপক্ষে মানুষের অভাব নেই। সমর্থন বা বিরোধিতা কখনও একপেশে হয় না। সরকারি পলিসি ও সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে মিটিং, মিছিল, পথ অবরোধ, অনশন, ধর্মঘট ইত্যাদি কর্মসূচি পালনের বিস্তৃত পরিসর রয়েছে। এজন্য ক্ষোভ পুঞ্জিভূত হওয়ার সুযোগ কম। সরকার পরিবর্তনের ব্যাপারে সাধারণ মানুষ নির্বাচন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে প্রস্তুত। আইনসভা, বিচারবিভাগ ও নির্বাহী বিভাগ সংবিধান নির্ধারিত গণ্ডিকে মান্যতা দিয়ে চলে। কিছু সমালোচনা থাকলেও ভারতের গণতান্ত্রিক কাঠামো যথেষ্ট শক্তিশালী। বিগত আট দশকে ভারতের কোনো সরকার বা শাসকের বিরুদ্ধে সামরিক কিংবা গণঅভ্যুত্থান ঘটেনি। আজও জাতীয় অথবা আঞ্চলিক স্তরে ‘দেখিয়া শুনিয়া ক্ষেপিয়া’ গিয়া সরকারকে উৎখাত করার জন্য অভ্যুত্থান ঘটানোর মানসিকতা তৈরি হয়েছে বলে মনে হয় না।
ভারতে ছাত্র সমাজ সাধারণত ক্যাম্পাস রাজনীতির মধ্যেই নিজেদেরকে সীমাবদ্ধ রাখে। কোনো গণআন্দোলনে তাদেরকে গণহারে অংশগ্রহণ অথবা নেতৃত্ব দিতে দেখা যায়নি। তারা রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে লাগামছাড়া দুর্নীতি, স্বজনপোষণ কিংবা রেকর্ড বেকারত্ব নিয়ে কোনো স্মরণীয় লড়াইয়ের জন্ম দিতে পারেনি। মূল্যবোধের অবক্ষয়ের যুগে ভারতের জনগণ শিক্ষিত-অশিক্ষিত, সৎ-দুর্নীতিগ্ৰস্ত, আদর্শবাদী-সুবিধাবাদী, সাম্প্রদায়িক-সেক্যুলার দলের প্রতি অনুগত-দলবদলু প্রভৃতি পরস্পর বিপরীতমুখী চরিত্রের রাজনীতিকদের মধ্যে সেভাবে বাছবিচার করে না, প্রায় সকলকেই সমদৃষ্টিতে দেখে। কাজেই শাসকের কোনো গুরুতর ভুল সিদ্ধান্ত বা দুষ্কর্ম সহ্য করতে না পেরে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তুলে অথবা অভ্যুত্থান ঘটিয়ে অপশাসনের অবসান ঘটানোর সম্ভাবনা খুবই কম। অশিষ্ট ভাষায় বললে, এখানে ”পাবলিকের মার কেওড়াতলা পার” হবে না।
তাই শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ অথবা নেপালের ঘটনায় উচ্ছ্বসিত হওয়ার খুব কারণ আছে বলে মনে হয় না। ছাত্র-তরুণ ও যুবদের মধ্যে আবেগ বেশি থাকলেও অভিজ্ঞতা কম। তারা উত্তেজিত হয়ে ভাঙতে পারলেও সংযম বজায় রেখে গড়তে জানে না। রাষ্ট্র পরিচালনার মতো পরিপক্কতা তাদের নেই। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের শাসন ব্যবস্থায় সরকারি সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আন্দোলন হতেই পারে, কিন্তু সরকার পরিবর্তন ভোটের মাধ্যমেই হওয়া উচিত। সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য একটি আকস্মিক আন্দোলনে বহু মানুষের মৃত্যু ও প্রচুর সম্পত্তি ধ্বংস করাটা যৌক্তিক নয়।
(লেখক: প্রধানশিক্ষক, কাবিলপুর হাইস্কুল, মুর্শিদাবাদ)








